আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

e-Return নিয়ে NBR-এর ৪৪ প্রশ্নের উত্তর: রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ ও TDS সমন্বয়ে যা জানা জরুরি

অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলকে আরও সহজ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) e-Return ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ, প্রয়োজনীয় তথ্য, কর পরিশোধ, উৎসে করের ক্রেডিট, সম্পদ-দায় বিবরণী এবং বিভিন্ন সাধারণ সমস্যার সমাধান নিয়ে ৪৪টি প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ করেছে। এতে e-Return নিবন্ধন থেকে শুরু করে রিটার্ন Submit, Tax Certificate সংগ্রহ, ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের TDS সমন্বয় এবং ভুল রিটার্ন সংশোধনের প্রক্রিয়া পর্যন্ত বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে।

NBR-এর FAQ অনুযায়ী, e-Return ব্যবহারের আগে করদাতাকে TIN, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নিজের নামে নিবন্ধিত বায়োমেট্রিক মোবাইল নম্বর প্রস্তুত রাখতে হবে। ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের সময় OTP যাচাই করে পাসওয়ার্ড সেট করলেই e-Return অ্যাকাউন্ট তৈরি করা যায়।

e-Return করতে পুরোনো মোবাইল নম্বর লাগবে না

অনেক করদাতার অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—TIN খোলার সময় যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল সেটি বর্তমানে না থাকলে কী হবে? NBR বলছে, এ কারণে e-Return নিবন্ধন আটকে থাকবে না। NID-এর বিপরীতে বর্তমানে নিবন্ধিত অন্য মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে e-Return-এ রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। পরবর্তীতে মোবাইল নম্বর পরিবর্তনের সুবিধাও রয়েছে।

নিজের মোবাইল নম্বর NID-এর নামে নিবন্ধিত কি না, তা জানতে *16001# ডায়াল করে NID-এর শেষ চারটি সংখ্যা দিতে হবে।

মোবাইলের চেয়ে কম্পিউটার ব্যবহারের পরামর্শ

NBR-এর FAQ-তে বলা হয়েছে, e-Return ব্যবস্থার বেশ কিছু ফিচার মোবাইল ডিভাইসে পাওয়া যায় না। তাই অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পাসওয়ার্ড তৈরির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। পাসওয়ার্ড কমপক্ষে ৮ অক্ষরের হতে হবে এবং এতে lowercase, uppercase, সংখ্যা ও special character থাকতে হবে। পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে Forget Password অপশনের মাধ্যমে OTP নিয়ে নতুন পাসওয়ার্ড সেট করা যাবে।

অনলাইনে রিটার্ন দাখিলে কাগজপত্র আপলোড নয়

e-Return ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সময় কোনো ডকুমেন্ট আপলোড করার প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সামনে রেখে সেগুলোর ভিত্তিতে সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্ট ঘরে দিতে হবে।

রিটার্ন Submit করার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেমে Assessment সম্পন্ন হবে এবং Acknowledgement Slip ও Tax Certificate তৈরি হবে। পরবর্তীতে Tax Record থেকে এসব নথি এবং রিটার্নের কপি প্রিন্ট বা ডাউনলোড করা যাবে।

অর্থাৎ অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করার পর আবার সার্কেলে গিয়ে একই রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে FAQ-তে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিটার্ন পূরণের ৭ ধাপ

NBR-এর নির্দেশনায় e-Return পূরণের প্রক্রিয়াকে সাতটি প্রধান ধাপে ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম ধাপ—Assessment: এখানে Assessment Year, Income Year, আয়ের প্রধান উৎস এবং প্রয়োজনীয় Additional Information দিতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদসংক্রান্ত IT-10B তথ্যও দিতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ—Income: চাকরি, বাড়িভাড়া, কৃষি, ব্যবসা, মূলধনী লাভ, আর্থিক সম্পদ ও অন্যান্য উৎসের আয় দেখাতে হবে।

তৃতীয় ধাপ—Rebate: জীবনবীমা, DPS, সঞ্চয়পত্র, GPFসহ প্রযোজ্য বিনিয়োগের তথ্য দিতে হবে।

চতুর্থ ধাপ—Expenditure: বার্ষিক ব্যয়ের তথ্য দিতে হবে।

পঞ্চম ধাপ—Asset & Liabilities: সম্পদ ও দায়ের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।

ষষ্ঠ ধাপ—Tax & Payment: মোট আয়, করের হিসাব, প্রদেয় কর এবং ইতোমধ্যে পরিশোধ করা বিভিন্ন করের তথ্য দিতে হবে।

সপ্তম ধাপ—Return View: Submit করার আগে পুরো রিটার্ন পর্যালোচনা করে ভুল থাকলে সংশোধন করতে হবে। চাইলে তথ্য আংশিক পূরণ করে Save করে পরবর্তীতে আবার কাজ চালানো যাবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: iBAS-এর উৎসে কর

সরকারি কর্মচারীদের জন্য FAQ-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। বেতন থেকে iBAS-এর মাধ্যমে কেটে নেওয়া উৎসে কর e-Return Ledger-এর Salary (iBAS) অপশন ব্যবহার করে খুঁজে পাওয়া যাবে। Search করার পর প্রদর্শিত করের পরিমাণ যাচাই করে Save করে তথ্য আপডেট করা যাবে।

অন্যদিকে Salary (others)-এর ক্ষেত্রে চালান, সার্টিফিকেট বা প্রত্যয়নপত্রের নম্বর, তারিখ, ব্যাংক ও শাখার তথ্য এবং প্রযোজ্য করের পরিমাণ দিতে হবে।

ব্যাংক TDS ও সঞ্চয়পত্রের কর কীভাবে সমন্বয় হবে

ব্যাংকের সুদ, সঞ্চয়পত্র এবং ডিভিডেন্ড থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করও e-Return-এ দাবি করা যায়। এর জন্য Tax & Payment অংশে গিয়ে e-Return Ledger-এর সংশ্লিষ্ট অপশন ব্যবহার করতে হবে।

NBR বিশেষভাবে জানিয়েছে, Income অংশে সংশ্লিষ্ট আয় আগে সঠিকভাবে পূরণ করা না থাকলে Sync from Income ব্যবহার করেও তথ্য পাওয়া যাবে না।

যৌথ সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে পুরো সঞ্চয়পত্রের TDS নিজের নামে দাবি করা যাবে না; নিজের অংশের জন্য প্রযোজ্য TDS-ই TDS claim হিসেবে দেখাতে হবে।

গাড়ির অগ্রিম করের ক্রেডিটও পাওয়া যাবে

গাড়ির জন্য পরিশোধ করা অগ্রিম করের ক্রেডিট দাবি করতে e-Return Ledger-এর Claim AIT → AIT on Car অপশন ব্যবহার করতে হবে। এরপর ব্যাংক স্লিপে থাকা Unique Key বা Transaction No. দিয়ে Search করে তথ্য Save করতে হবে।

তবে গাড়ির কর সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সময়সীমা-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট শর্তও FAQ-তে উল্লেখ রয়েছে। ১ জুলাই ২০২৩ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ সময়ের মধ্যে পরিশোধিত করের ব্যাংক স্লিপের Transaction ID ব্যবহার করে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে; ৩০ জুন ২০২৪-এর পর পরিশোধিত কর নিয়ে FAQ-তে চলতি বছরের রিটার্নে সমন্বয় না হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

অনলাইনেই কর পরিশোধের সুযোগ

রিটার্নে কোনো কর অপরিশোধিত থাকলে Tax & Payment অংশে Payable হিসেবে তা দেখা যাবে। Pay Now অপশনের মাধ্যমে e-Challan বা Sonali Bank Gateway ব্যবহার করে কর পরিশোধ করা যায়।

NBR-এর FAQ অনুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেও কর পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।

সম্পদ-দায়ের তথ্যেও সতর্কতা জরুরি

e-Return-এ শুধু আয় ও করের হিসাব দিলেই কাজ শেষ নয়। Asset & Liabilities অংশে ব্যবসার মূলধন, জমি-বাড়ি, আর্থিক সম্পদ, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, DPS, গাড়ি, স্বর্ণ, গৃহস্থালি সামগ্রী, নগদ অর্থ এবং ঋণের তথ্য দিতে হয়।

আগের বছর সম্পদের তথ্য দেওয়া থাকলে Autofill ব্যবহার করে আগের তথ্য আনা যায়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী Edit, Delete, Add বা Update করা যাবে।

স্বর্ণ ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে আগের বছর প্রদর্শিত মূল্য বহাল থাকবে। নতুন করে কেনা হলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য দেখাতে হবে।

একইভাবে, আগের বছর যেসব সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর বা নগদায়ন হয়ে গেছে, সেগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ চলতি বছরের রিটার্নে দেখাতে হবে।

একাধিক চাকরি ও পেশাজীবীদের আয়

একই বছরে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে Employment Income অংশে Add Employment ব্যবহার করে প্রতিটি চাকরির আয় আলাদাভাবে যোগ করা যাবে।

চিকিৎসক ও আইনজীবীদের আয় e-Return-এ Business Income হিসেবে দেখানোর নির্দেশনা রয়েছে। নিয়মিত আয়ের ক্ষেত্রে Regular Business Income এবং উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট Profession/Consultancy/Other Services অপশন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে FAQ অনুযায়ী, MPO-ভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

e-Return-এ সবচেয়ে বেশি যে ভুলগুলো হতে পারে

NBR-এর প্রশ্নোত্তর বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

প্রথমত, Income এবং Tax & Payment অংশে একই আয়ের জন্য ভিন্ন তথ্য দিলে Bank TDS mismatch হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সঞ্চয়পত্রের Registration Number বা তারিখ ভুল হলে Data not found দেখা দিতে পারে।

তৃতীয়ত, যৌথ সঞ্চয়পত্রে নিজের অংশের বদলে পুরো TDS দাবি করলে সমস্যা হতে পারে।

চতুর্থত, কর পরিশোধের পরও সিস্টেমে Payable দেখালে পুনরায় Login করে Tax & Payment যাচাই করতে হবে।

পঞ্চমত, NID-এর নাম বা জন্মতারিখ সংশোধনের পর e-Return Profile আপডেট না করলে পুরোনো তথ্য দেখা যেতে পারে।

ভুল রিটার্ন দাখিল হলে কী করবেন

অনলাইনে রিটার্ন Submit করার পর কোনো ভুল ধরা পড়লে FAQ অনুযায়ী দাখিলের ১৮০ দিনের মধ্যে সার্কেলে সংশোধিত পেপার রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

তাই Submit করার আগে Return View অংশে পুরো রিটার্ন ভালোভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কারা e-Return দাখিলে বাধ্যতামূলক—FAQ-তে যা বলা হয়েছে

FAQ-তে ২০২৪-২০২৫ কর বছরের জন্য নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির করদাতার e-Return দাখিল বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কর অঞ্চলের অধীন সরকারি কর্মচারী, তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মোবাইল টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং FAQ-তে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কথা রয়েছে।

ঘরে বসেই মিলবে রিটার্ন ও করের নথি

e-Return ব্যবহারের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, করদাতাকে প্রতিবার কর অফিসে গিয়ে কাগজ সংগ্রহ করতে হয় না। সিস্টেম থেকে TIN Certificate, Return, Tax Certificate, Acknowledgement Slip এবং পরিশোধিত করের চালান ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা যায়। আগের বছরগুলোর দাখিল করা রিটার্নের রেকর্ডও পাওয়া যায়।

NBR আরও জানিয়েছে, অনলাইনে দাখিল করা তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা আইনগতভাবে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে এবং রিটার্নের ডিজিটাল সার্টিফিকেট কপিও পাওয়া যায়।

সহায়তার জন্য NBR কল সেন্টার

e-Return ব্যবহারে কোনো সমস্যা হলে NBR কল সেন্টারে যোগাযোগ করা যাবে। FAQ-তে ০৯৬৪৩ ৭১৭১৭১ নম্বর দেওয়া হয়েছে এবং ছুটির দিন ছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি Etax Service Center Portal এবং বিভিন্ন কর অঞ্চল থেকেও সহায়তা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

শেষ কথা

NBR-এর ৪৪টি প্রশ্নোত্তর থেকে স্পষ্ট যে e-Return ব্যবস্থায় রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া কয়েকটি ধারাবাহিক ধাপে সম্পন্ন করা যায়। তবে আয়, উৎসে কর, ব্যাংক TDS, সঞ্চয়পত্র, AIT, সম্পদ ও দায়ের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের iBAS-এর উৎসে কর, ব্যাংক TDS এবং সঞ্চয়পত্রের TDS সঠিকভাবে সমন্বয় না করলে রিটার্নে তথ্যের অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে।

তাই রিটার্ন Submit করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে রেখে প্রতিটি তথ্য যাচাই, Tax & Payment অংশে করের হিসাব মিলিয়ে দেখা এবং Return View থেকে সম্পূর্ণ রিটার্ন পুনরায় পরীক্ষা করাই NBR-এর প্রকাশিত FAQ অনুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *