সরকারি চাকরিজীবীদের ভাতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা: নির্ধারিত ভাতা ছাড়া অন্য সব ভাতা করযোগ্য
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা থেকে আয়কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন করে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এর পৃষ্ঠা ২১-এ দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ভাতা ও সুবিধাগুলোই করমুক্ত। এর বাইরে পাওয়া অন্য কোনো ভাতা করমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে না; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তা করযোগ্য আয়ের অংশ হবে।
এনবিআরের ওয়েবসাইটে আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশ করা হয়েছে।
মূল বিষয়টি কী?
সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার কর নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাস করযোগ্য, কিন্তু সরকারি বেতন আদেশে নির্দিষ্টভাবে উল্লিখিত কিছু ভাতা ও সুবিধা করমুক্ত।
অর্থাৎ, কোনো ভাতার নাম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-স্লিপে থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হবে—এমন নয়। ভাতাটি করমুক্ত কি না, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি বেতন আদেশে তার উল্লেখ এবং এনবিআরের প্রজ্ঞাপন গুরুত্বপূর্ণ। এনবিআরের পূর্ববর্তী নির্দেশিকাতেও ২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে একই নীতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
যে ভাতা ও সুবিধাগুলো করমুক্ত
প্রদত্ত নির্দেশনায় সরকারি বেতন আদেশে উল্লিখিত নিম্নোক্ত ভাতা ও সুবিধাগুলো করমুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—
- চিকিৎসা ভাতা
- নববর্ষ ভাতা
- বাড়ি ভাড়া ভাতা
- শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা
- শিক্ষা সহায়ক ভাতা
- কার্যভার ভাতা
- পাহাড়ি ভাতা
- শ্রম ভাতা
- ভ্রমণ ভাতা
- যাতায়াত ভাতা
- টিফিন ভাতা
- পোশাক ভাতা
- আপ্যায়ন ভাতা
- ধোলাই ভাতা
- বিশেষ ভাতা
- প্রেষণ ভাতা
- প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা
- জুডিশিয়াল ভাতা
- চৌকি ভাতা
- ডোমেস্টিক এইড এলাউন্স
- ঝুঁকি ভাতা
- এক্সটি. এলাউন্স
- মোটরসাইকেল ভাতা
- আর্মার এলাউন্স
- নিঃশর্ত যাতায়াত ভাতা
- টেলিফোন এলাউন্স
- ক্লিনার এলাউন্স
- ড্রাইভার এলাউন্স
- মাউন্টেড পুলিশ এলাউন্স
- পিবিএক্স এলাউন্স
- সমস্ত শাখা ভাতা
- বিউগলার এলাউন্স
- নার্সিং এলাউন্স
- দৈনিক বা প্রহরী ভাতা
- ট্রাফিক এলাউন্স
- রেশন মানি
- সীমান্ত ভাতা
- ব্যাটম্যান ভাতা
- ইন্সট্রাকশনাল এলাউন্স
- নিয়ুক্তি ভাতা
- আউটফিট ভাতা
- গার্ড পুলিশ ভাতা
তবে তালিকার বাইরে থাকা কোনো ভাতাকে শুধু সরকারি চাকরিজীবীরা পান—এই কারণে করমুক্ত ধরে নেওয়া যাবে না।
মূল বেতন ও উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে কী হবে?
এখানেই অনেক সরকারি চাকরিজীবীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।
২০২৩ সালের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীর সরকার কর্তৃক প্রদত্ত মূল বেতন, উৎসব ভাতা এবং বোনাস—যে নামেই অভিহিত হোক—করযোগ্য আয় হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট করা অন্যান্য ভাতা ও সুবিধা করমুক্ত।
অর্থাৎ, সহজ ভাষায়—
মূল বেতন → করযোগ্য
উৎসব ভাতা → করযোগ্য
বোনাস → করযোগ্য
সরকারি বেতন আদেশে নির্দিষ্ট করমুক্ত ভাতা → করমুক্ত
তালিকাভুক্ত নয় এমন অন্যান্য ভাতা → প্রযোজ্য ক্ষেত্রে করযোগ্য
কেন এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকের বেতন কাঠামোতে মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাতা যুক্ত থাকে। ফলে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত করার সময় কোন ভাতা করযোগ্য এবং কোনটি করমুক্ত—এটি সঠিকভাবে আলাদা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ভুল ধারণা হলো—সরকারি চাকরিতে পাওয়া সব ধরনের ভাতা করমুক্ত। এনবিআরের নির্দেশনা সেই ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং করমুক্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তালিকা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি বেতন আদেশ অনুসরণ করতে হবে। পূর্ববর্তী এনবিআর নির্দেশিকাতেও স্পষ্ট করা হয়েছে যে নির্ধারিত তালিকার বাইরে সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারী অন্য কোনো সুবিধা পেলে তা করযোগ্য হবে।
উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী এক অর্থবছরে—
- মূল বেতন পেলেন,
- উৎসব ভাতা পেলেন,
- বাড়ি ভাড়া ভাতা পেলেন,
- চিকিৎসা ভাতা পেলেন,
- সরকারি বেতন আদেশে উল্লেখ নেই—এমন একটি বিশেষ ধরনের ভাতা পেলেন।
এ ক্ষেত্রে মূল বেতন ও উৎসব ভাতা করযোগ্য আয়ের মধ্যে যাবে। বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা নির্ধারিত করমুক্ত তালিকার আওতায় থাকলে সেগুলো করমুক্ত থাকবে। কিন্তু শেষের ভাতাটি যদি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেতন আদেশে তালিকাভুক্ত করমুক্ত সুবিধার মধ্যে না থাকে, তাহলে সেটিকে করযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি সামনে আসবে।
তাই শুধু বেতন স্লিপে ‘Allowance’ লেখা আছে কি না—তা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
করদাতাদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
আয়কর রিটার্ন পূরণের সময় সরকারি চাকরিজীবীদের উচিত—
১. বেতন সনদ/বেতন বিবরণী সংগ্রহ করা।
২. মোট প্রাপ্ত ভাতাগুলো আলাদা করে তালিকা করা।
৩. কোন ভাতা করমুক্ত—তা সংশ্লিষ্ট সরকারি বেতন আদেশ ও এনবিআরের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
৪. করযোগ্য ভাতা বাদ না দেওয়া।
৫. করমুক্ত ভাতাকে ভুল করে করযোগ্য আয় হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত কর দেওয়ার বিষয়টিও এড়িয়ে চলা।
৬. রিটার্নে করযোগ্য ও করমুক্ত অংশের হিসাব যথাযথভাবে উপস্থাপন করা।
অবসরকালীন সুবিধার ক্ষেত্রেও আলাদা নিয়ম রয়েছে
সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অবসরকালীন প্রদত্ত কিছু সুবিধার জন্যও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এনবিআর নির্দেশিকায় অবসরকালীন লাম্প গ্র্যান্টসহ সরকারি বেতন আদেশে উল্লিখিত নির্ধারিত সুবিধাগুলোর কর treatment ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা পিআরএল ভোগীদের ক্ষেত্রেও সব ধরনের প্রাপ্ত অর্থকে একইভাবে করযোগ্য বা করমুক্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
সরকারি চাকরি করলেই সব ভাতা করমুক্ত—এমন নিয়ম নেই।
বরং বর্তমান নির্দেশনার মূল কাঠামো হলো—যে ভাতা ও সুবিধা নির্দিষ্টভাবে করমুক্ত তালিকায় রয়েছে, সেগুলো করমুক্ত; আর তালিকার বাইরে থাকা ভাতার ক্ষেত্রে করযোগ্যতার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—‘করযোগ্য’ মানেই পুরো অর্থের ওপর একই হারে কর বসবে—এমন নয়। করযোগ্য আয় নির্ধারণের পর প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, করহার, রেয়াত ও অন্যান্য বিধান অনুসারে চূড়ান্ত করের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
শেষ কথা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২৭-এর এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বেতন-ভাতার হিসাবের সামান্য ভুলও রিটার্নে করযোগ্য আয় কম বা বেশি দেখানোর কারণ হতে পারে। তাই ‘সব ভাতা করমুক্ত’—এই প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সরকারি বেতন আদেশ ও এনবিআরের তালিকা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
এনবিআরের প্রকাশিত ২০২৬-২৭ আয়কর নির্দেশিকা থেকেই সংশ্লিষ্ট কর নির্দেশনা যাচাই করা যায়। এনবিআরের আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭



