বহি: বাংলাদেশ । শ্রান্তি বিনোদন ছুটি

শ্রান্তি বিনোদন ছুটি কি বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগ করা যায়? সরকারি আদেশে মিলল গুরুত্বপূর্ণ নজির

সরকারি চাকরিজীবীদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটি নিয়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ আছে কি না—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ভ্যাকেশনাল বিভাগের কর্মচারী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বেশি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের একটি সরকারি আদেশে মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগ করার স্পষ্ট অনুমতির নজির পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি পাওয়া সরকারি নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের একজন টেকনিশিয়ানের মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নথিটি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সরকারি আদেশে কী বলা হয়েছে

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সংশ্লিষ্ট আদেশে একজন টেকনিশিয়ান-৩-এর আবেদন এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর তার মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগ করার অনুমতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নথিতে কর্মচারীর বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় তীর্থস্থান ভ্রমণ এবং ভ্রমণের দেশ হিসেবে ভারত উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়ার তথ্যও আদেশের ছকে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, বিষয়টি কেবল সাধারণ কোনো পরামর্শ বা কর্মচারীদের প্রচলিত অভিজ্ঞতার কথা নয়; বরং একটি লিখিত সরকারি আদেশে মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগের অনুমোদন দেওয়ার উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে।

শ্রান্তি বিনোদন ছুটি সরাসরি ‘পরিবর্তন’ করা হয়েছিল কি?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পার্থক্য রয়েছে।

আদেশের ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে মূলত মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগ করার অনুমতি’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি এমন নয় যে ছুটির অধিকার সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন কোনো ছুটি সৃষ্টি করা হয়েছে।

বরং আগে মঞ্জুর হওয়া শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সময় বিদেশে অবস্থানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ কারণে বিষয়টিকে সহজ ভাষায় বলা যায়—

মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সময় বিদেশে অবস্থানের জন্য বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে—এমন সরকারি নজির রয়েছে।

তবে কোন দপ্তরে কীভাবে এই অনুমোদন দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধি, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

অনুমোদনের সঙ্গে কী কী শর্ত ছিল?

উক্ত সরকারি আদেশে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতির পাশাপাশি একাধিক শর্তও দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, এই ভ্রমণের কারণে বাংলাদেশ সরকার বা কমিশনের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ থাকবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় সরকার বহন করবে না।

দ্বিতীয়ত, বিদেশে অবস্থানের সময় অনুমোদিত সীমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। আদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মচারীকে ভ্রমণ শেষ করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

এ ছাড়া ছুটিতে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং অনুমোদিত সময়ের মধ্যে দায়িত্বে ফিরে আসার মতো শর্তও আদেশে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গে সমন্বয় করার অনুমতি পেলেও সেটি শর্তহীন অনুমতি নয়।

তাহলে কি সবাই একইভাবে বিদেশ যেতে পারবেন?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি সরকারি আদেশের নজির থাকলেই সব দপ্তরের সব কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সুবিধা পাবেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পদ, দপ্তর, ছুটির বিধান, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি নির্দেশনা বিবেচনা করে অনুমোদন দিতে হয়।

প্রাপ্ত নথিটি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের একজন টেকনিশিয়ানের ক্ষেত্রে জারি হয়েছিল। তাই এটি সরকারি প্রশাসনে এমন অনুমোদনের বাস্তব নজির দেখায়; কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কোনো ভ্যাকেশনাল বিভাগের কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া হুবহু প্রযোজ্য—এ কথা এই নথি একা প্রমাণ করে না।

ভ্যাকেশনাল বিভাগের ক্ষেত্রে কী হবে?

এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ভ্যাকেশনাল বিভাগের ছুটি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

প্রাপ্ত সরকারি নথিতে যে উদাহরণটি রয়েছে, সেটি ভ্যাকেশনাল বিভাগের কোনো শিক্ষককে নিয়ে নয়। ফলে এই নথি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫ দিনের শ্রান্তি বিনোদন ছুটির ক্ষেত্রে একই নিয়ম বাধ্যতামূলকভাবে প্রযোজ্য—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

তবে নথিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে দেয়: মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সময় বিদেশে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া প্রশাসনিকভাবে একেবারে নজিরবিহীন নয়।

ভ্যাকেশনাল বিভাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ছুটির বিধান, ছুটির ক্যালেন্ডার এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সাধারণত নির্ধারিত ছুটির ক্যালেন্ডার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শ্রান্তি বিনোদন ছুটির প্রাপ্যতা ও মেয়াদ নিয়েও আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে।

তাই কোনো শিক্ষক যদি শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সময় বিদেশ ভ্রমণ করতে চান, তাহলে শুধু বিদ্যালয় থেকে ছুটি মঞ্জুর করানো যথেষ্ট নয়। বহিঃবাংলাদেশ ভ্রমণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও প্রয়োজন হবে।

অর্থাৎ সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি হতে পারে—

শ্রান্তি বিনোদন ছুটির আবেদন → ছুটি মঞ্জুর → মঞ্জুরির আদেশ সংযুক্ত করে বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আবেদন → সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন → সরকারি আদেশ/জিও → অনুমোদিত সময়ের মধ্যে বিদেশ ভ্রমণ।

তবে কোন পর্যায়ে আবেদন করতে হবে এবং কে অনুমোদন দেবেন, তা সংশ্লিষ্ট বিভাগের বর্তমান ক্ষমতা অর্পণ ও প্রশাসনিক নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল।

শুধু শ্রান্তি বিনোদন ছুটি মঞ্জুর হলেই কি বিদেশ যাওয়া যাবে?

না।

এটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। শ্রান্তি বিনোদন ছুটি মঞ্জুর হওয়া এবং বহিঃবাংলাদেশ ভ্রমণের অনুমতি পাওয়া—দুটি প্রশাসনিক বিষয়।

প্রাপ্ত সরকারি আদেশেও দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগের জন্য কর্তৃপক্ষের পৃথক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

সুতরাং কোনো কর্মচারীর শ্রান্তি বিনোদন ছুটি মঞ্জুর থাকলেও বহিঃবাংলাদেশ ভ্রমণের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে চলে যাওয়া নিরাপদ প্রশাসনিক পদ্ধতি নয়।

সরকারি অর্থ পাওয়া যাবে কি?

বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন এবং ভ্রমণ ব্যয় বহন—দুটি আলাদা বিষয়।

উল্লিখিত আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণের কারণে বাংলাদেশ সরকার/কমিশনের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ থাকবে না।

অর্থাৎ অনুমোদন পাওয়া মানেই সরকার বিদেশ ভ্রমণের খরচ বহন করবে—এমন নয়।

কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

এই সরকারি নথির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি দেখায় যে মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সময়কে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগ করার অনুমতি দেওয়ার বাস্তব সরকারি নজির রয়েছে।

তবে প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই অনুমোদন পাওয়া যাবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়।

বিশেষ করে ভ্যাকেশনাল বিভাগের কর্মচারী বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে তাদের উচিত—

  • শ্রান্তি বিনোদন ছুটির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা;
  • ছুটি মঞ্জুরের লিখিত আদেশ সংগ্রহ করা;
  • বহিঃবাংলাদেশ ছুটির জন্য নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করা;
  • সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া;
  • প্রয়োজনীয় জিও/অনুমতিপত্র হাতে পাওয়ার পর ভ্রমণ করা;
  • অনুমোদিত সময়ের বাইরে বিদেশে অবস্থান না করা।

নথিটি কী প্রমাণ করে, আর কী প্রমাণ করে না

নথিটি যা প্রমাণ করে:
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ক্ষেত্রে একজন টেকনিশিয়ানের মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

নথিটি যা প্রমাণ করে না:
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সব ভ্যাকেশনাল বিভাগের কর্মচারীর জন্য একই নিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য।

তাই এই নথিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নজির হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু ভ্যাকেশনাল বিভাগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বর্তমান বিধি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।

উপসংহার

শ্রান্তি বিনোদন ছুটি নিয়ে বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে পাওয়া এই সরকারি আদেশটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে সরাসরি দেখা যাচ্ছে, একজন সরকারি কর্মচারীর মঞ্জুরীকৃত শ্রান্তি বিনোদন ছুটিকে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে ভোগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং ভ্রমণের দেশ, উদ্দেশ্য, সময়সীমা ও বিভিন্ন শর্তও সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে ‘শ্রান্তি বিনোদন ছুটি আছে, তাই ইচ্ছামতো বিদেশ যাওয়া যাবে’—এমন ধারণা সঠিক নয়। বিদেশ ভ্রমণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ প্রয়োজন।

আর প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ভ্যাকেশনাল বিভাগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিজস্ব ছুটি বিধান ও অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। প্রাপ্ত নথি সাধারণভাবে এমন অনুমোদনের নজির দেখালেও, ভ্যাকেশনাল বিভাগের জন্য পৃথকভাবে প্রযোজ্য বিধান এই নথিতে নির্ধারিত হয়নি।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *