Pay Fixation 2026: ফিক্সেশন করার পর বেতন যেভাবে নির্ধারিত হয়, ছবির হিসাবসহ বিস্তারিত
নবম জাতীয় বেতনস্কেল–২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু পুরোনো মূল বেতনের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে টাকা যোগ করলেই চূড়ান্ত বেতন পাওয়া যাবে না। বর্তমান মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপ, পার্থক্য, নতুন স্কেলের ধাপ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের হার—এসব বিষয় বিবেচনা করে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ করা হবে।
আপলোড করা বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি নমুনা হিসাব দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি iBAS++ ব্যবস্থায় অনলাইন বেতন নির্ধারণের জন্য আলাদা Pay Fixation অপশন রয়েছে এবং একাধিক ধরনের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অপশন নির্বাচন করতে বলা হয়েছে।
ছবির বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে শুরুতে বেতন কত ছিল?
নমুনা বিবরণী অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে গৃহীত মূল বেতন ৭১,২০০ টাকা দেখানো হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত বেতন বা PP নেই, ফলে মোট বেতনও ৭১,২০০ টাকা।
এরপর আগের বেতনস্কেল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ধরা হয়েছে ৫০,০০০ টাকা। অর্থাৎ—
বর্তমান মূল বেতন: ৭১,২০০ টাকা
গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন: ৫০,০০০ টাকা
পার্থক্য: ২১,২০০ টাকা
এই ২১,২০০ টাকার পার্থক্য পরবর্তী ধাপে নতুন বেতনস্কেলে সমন্বয়ের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন স্কেলে হিসাব
নমুনা বিবরণীতে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন ১,০০,০০০ টাকা দেখানো হয়েছে।
এর সঙ্গে আগের হিসাব থেকে পাওয়া ২১,২০০ টাকা পার্থক্য যোগ করলে পাওয়া যায়—
১,০০,০০০ + ২১,২০০ = ১,২১,২০০ টাকা।
অর্থাৎ নতুন স্কেলে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী মোট বেতন দাঁড়ায় ১,২১,২০০ টাকা।
তবে এখানেই চূড়ান্ত বেতন থেমে থাকছে না।
এরপর কেন ১,২৯,০০০ টাকা ধরা হলো?
নতুন বেতনস্কেলের নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী ১,২১,২০০ টাকা সরাসরি একটি নির্ধারিত ধাপ না হলে সংশ্লিষ্ট স্কেলের সম/উচ্চতর প্রাপ্য ধাপ বিবেচনা করতে হবে।
আপলোড করা নমুনা বিবরণীতে এই পর্যায়ে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১,২৯,০০০ টাকা।
অর্থাৎ হিসাবের ধারাটি দাঁড়াচ্ছে—
১,০০,০০০ টাকা + ২১,২০০ টাকা = ১,২১,২০০ টাকা
এরপর নতুন স্কেলের নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী—
চূড়ান্ত ধাপ = ১,২৯,০০০ টাকা।
এটাই ফিক্সেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই শুধু পুরোনো মূল বেতনের ওপর শতাংশ প্রয়োগ করে নতুন বেতন বের করলে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ফল পাওয়া যাবে না।
১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট যোগ হলে
ছবির বিবরণীতে পরবর্তী ধাপে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ বেতন দেখানো হয়েছে।
নির্ধারিত বেতন ছিল:
১,২৯,০০০ টাকা
এরপর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হিসেবে:
৭০০ টাকা
যোগ হয়ে ইনক্রিমেন্টসহ বেতন দাঁড়িয়েছে:
১,২৯,৭০০ টাকা।
অর্থাৎ নতুন স্কেলে ফিক্সেশনের পর ইনক্রিমেন্টের প্রাপ্যতাও হিসাবের মধ্যে এসেছে।
১০০ শতাংশ বৃদ্ধি একসঙ্গে নয়—ধাপে ধাপে
আপলোড করা নমুনা বিবরণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নতুন বেতন বৃদ্ধির ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন।
এখানে ইনক্রিমেন্টসহ নির্ধারিত বেতন ১,২৯,৭০০ টাকা এবং আগের মূল বেতন ৭১,২০০ টাকা হওয়ায় মোট বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায়—
১,২৯,৭০০ − ৭১,২০০ = ৫৮,৫০০ টাকা।
তবে ছবির পরবর্তী হিসাবের কাঠামোতে বেতন বৃদ্ধির অংশকে ধাপে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। সেখানে প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ, পরবর্তী ধাপে ৩০ শতাংশ এবং শেষ ধাপে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কার্যকরের কাঠামো দেখানো হয়েছে।
এই ধরনের ধাপে বাস্তবায়নের কারণে কাগজে নতুন স্কেলের পূর্ণ বেতন নির্ধারিত থাকলেও তা একবারে পুরোপুরি কার্যকর না হয়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে কার্যকর হতে পারে।
প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ
নমুনা বিবরণীতে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ হিসেবে ৫১,৮০০ টাকা এবং তার ৪০ শতাংশ হিসেবে ২০,৭২০ টাকা দেখানো হয়েছে।
হিসাব:
৫১,৮০০ × ৪০% = ২০,৭২০ টাকা।
এরপর আগের বেতন ৭১,২০০ টাকা-এর সঙ্গে ২০,৭২০ টাকা যোগ করলে—
৭১,২০০ + ২০,৭২০ = ৯১,৯২০ টাকা।
অর্থাৎ প্রথম ধাপের ৪০ শতাংশ কার্যকরের পর প্রাপ্য বেতন হিসেবে নমুনা বিবরণীতে ৯১,৯২০ টাকা দেখানো হয়েছে।
এরপর বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
প্রথম ধাপের বেতন নির্ধারণের পর প্রযোজ্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিও হিসাবের মধ্যে যুক্ত হয়েছে।
ছবির পরবর্তী ঘরে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিসহ প্রাপ্য বেতন দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ফিক্সেশন এবং বাস্তবায়নের শতাংশের পাশাপাশি ইনক্রিমেন্টের তারিখ ও প্রাপ্যতা আলাদাভাবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ কারণে একজন কর্মচারীর চূড়ান্ত বেতন অন্য একজনের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে—যদিও দুজন একই গ্রেডে থাকেন।
২০২৭ সালের প্রথম ধাপে আরও ৩০ শতাংশ
নমুনা হিসাবের পরবর্তী পর্যায়ে ১ জানুয়ারি ২০২৭ তারিখে বেতন বৃদ্ধির আরও ৩০ শতাংশ কার্যকরের হিসাব দেখানো হয়েছে।
ছবিতে এই অংশে বৃদ্ধির পরিমাণ ১৫,৫৮০ টাকা দেখানো হয়েছে।
এরপর পূর্বের নির্ধারিত বেতনের সঙ্গে এই টাকা যোগ করে নতুন প্রাপ্য বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।
শেষ ধাপে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ
পরবর্তী ধাপে আবার ১ জুলাই ২০২৭ তারিখে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির হিসাব দেখানো হয়েছে।
এ পর্যায় শেষ হলে নতুন বেতন কাঠামোর ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি সম্পূর্ণ কার্যকর হওয়ার হিসাব পাওয়া যায়।
নমুনা বিবরণীতে এই ধাপগুলো অতিক্রম করে পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ণ নির্ধারিত বেতন এবং ইনক্রিমেন্টসহ বেতনের হিসাব দেখানো হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে
পুরোনো মূল বেতন
↓
আগের স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন নির্ধারণ
↓
পার্থক্য বের করা
↓
নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে পার্থক্য যোগ
↓
নতুন স্কেলের সম/উচ্চতর নির্ধারিত ধাপে নেওয়া
↓
প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট যোগ
↓
বেতন বৃদ্ধির নির্ধারিত শতাংশ অনুযায়ী প্রথম ধাপ
↓
পরবর্তী ৩০%
↓
শেষ ৩০%
↓
পূর্ণ নতুন বেতন কার্যকর
iBAS++-এ পে ফিক্সেশনের গুরুত্ব
জাতীয় বেতনস্কেল জারির পর অনলাইনে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে iBAS++ ব্যবহারের নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বের payfixation.gov.bd ঠিকানা ব্যবহার করলেও iBAS++ Pay Fixation অপশনে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকার কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া iBAS++-এর বিদ্যমান নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একাধিক ধরনের বেতন নির্ধারণের প্রয়োজন হলে যেটি আগে প্রাপ্য সেটি আগে সম্পন্ন করতে হবে। সেখানে চলমান বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টসহ বিভিন্ন অপশন আলাদাভাবে রাখা হয়েছে।
ডিডিও ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের ভূমিকা
পে ফিক্সেশন শুধু কর্মচারী পর্যায়ে তথ্য পূরণ করলেই শেষ হয় না। প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, গেজেটেড কর্মচারীর বেতন নির্ধারণী বিবরণী ডিডিও হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীর ক্ষেত্রে সার্ভিস বইয়ের তথ্যের সঙ্গে বেতন নির্ধারণী তথ্য যাচাই করে ফরওয়ার্ড করার প্রক্রিয়াও রয়েছে। iBAS++ থেকে বেতন নির্ধারণী বিবরণীর প্রিন্ট কপি সার্ভিস বইসহ হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর নির্দেশনার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।
ভুল হলে কী হতে পারে?
পে ফিক্সেশনের সময় চাকরিতে যোগদানের তারিখ, পুরোনো মূল বেতন, গ্রেড, ইনক্রিমেন্টের তারিখ, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড কিংবা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য ভুল হলে পরবর্তী বেতন নির্ধারণে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
iBAS++-এর নির্দেশনাতেও অপ্রয়োজনে ভুল অপশনে তথ্য এন্ট্রি না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
তাই ফিক্সেশন করার আগে সার্ভিস বই, পূর্বের বেতন নির্ধারণী বিবরণী, ইনক্রিমেন্টের তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ মিলিয়ে তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে
আপলোড করা ছবিটি একটি বেতন নির্ধারণী বিবরণীর নমুনা/উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখানো ৭১,২০০ টাকা, ১,২১,২০০ টাকা, ১,২৯,০০০ টাকা, ৪০%-৩০%-৩০% ইত্যাদি হিসাব ছবির নির্দিষ্ট কর্মচারীর উদাহরণ। একই নিয়মে প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর বেতন একই অঙ্কে হবে—এমন নয়।
ব্যক্তিভেদে পুরোনো মূল বেতন, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট, চাকরির ইতিহাস, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড ও প্রাপ্যতার তারিখ পরিবর্তিত হলে Pay Fixation-এর ফলও পরিবর্তিত হবে।
সারকথা: ২০২৬ সালের পে ফিক্সেশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পুরোনো মূল বেতন থেকে নতুন স্কেলের প্রাপ্য ধাপ নির্ধারণ, তারপর ইনক্রিমেন্ট এবং নির্ধারিত ধাপে বাস্তবায়নের শতাংশ প্রয়োগ। ফলে শুধু নতুন গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দেখেই কারও চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ করা যাবে না; সম্পূর্ণ ফিক্সেশন হিসাবটি দেখতে হবে। সরকারি অনলাইন বেতন নির্ধারণ ব্যবস্থায়ও বিভিন্ন ধরনের ফিক্সেশনের জন্য পৃথক অপশন রাখা হয়েছে।




