আইবাস++ । পে ফিক্সেশন । ই-ফাইলিং

পে ফিক্সেশনে বড় সংশোধনের নির্দেশনা: প্রধান শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল ও অতিরিক্ত অর্থ ফেরত নিয়ে হিসাবরক্ষণ অফিসের চিঠি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনে অনিয়ম ও অসংগতি সংশোধনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর তারিখে জারি করা একটি দাপ্তরিক চিঠিতে সিলেট বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস (ডিসিএ) কার্যালয়ের অডিট পর্যবেক্ষণের আলোকে কয়েকটি বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

চিঠিতে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড বাতিল, জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের টাইমস্কেল পুনর্বিবেচনা, ২০০৬ ও ২০১৪ সালের উন্নীত গ্রেডে ভুল বেতন সংশোধন এবং সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড প্রদানের সময় গণনায় অসংগতি দূর করার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুলভাবে নির্ধারিত বেতনের কারণে অতিরিক্ত উত্তোলিত সরকারি অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।

তবে চিঠিটি নির্দিষ্ট অডিট পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের বিষয়কেন্দ্রিক। তাই এটিকে সব শিক্ষক বা সব সরকারি কর্মচারীর পে ফিক্সেশন বাতিলের সাধারণ নির্দেশনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের চাকরির ইতিহাস, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেডের আদেশ এবং প্রযোজ্য বিধি যাচাই করেই প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।

অডিট পর্যবেক্ষণে পে ফিক্সেশন সংশোধনের উদ্যোগ

দাপ্তরিক চিঠি অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সিলেটের বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস (ডিসিএ) কার্যালয় থেকে পরিচালিত পরিদর্শন ও অডিট কার্যক্রমে শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ-সংক্রান্ত কয়েকটি অসংগতি উঠে আসে। এসব আপত্তি নিষ্পত্তি না করে নির্ভুল পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা কঠিন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের তথ্য যাচাই, ভুল গ্রেড বা টাইমস্কেল সংশোধন এবং অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে মোট চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

পে ফিক্সেশন সংশোধনে যেসব চারটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে

১. প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড বাতিল

চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি বা বেতন উন্নীতকরণের তারিখ ৯ মার্চ ২০২৪ থেকে ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার ভিত্তিতে পূর্বে প্রদান করা দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণ বাতিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গৃহীত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

২. জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের টাইমস্কেল বাতিল ও পুনর্নির্ধারণ

জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের পূর্বে গৃহীত টাইমস্কেল বাতিল করে নতুন করে বেতন নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলিত হয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণী বিবরণী ও টাইমস্কেল মঞ্জুরির আদেশ যাচাই করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ২০০৬ ও ২০১৪ সালের উন্নীত গ্রেডে ভুল বেতন সংশোধন

প্রধান শিক্ষকদের ২০০৬ ও ২০১৪ সালে উন্নীত গ্রেডে ভুলভাবে নির্ধারিত বেতন পুনর্নিরীক্ষণ করে সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, ভুল বেতন নির্ধারণের কারণে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা হয়ে থাকলে তা আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড প্রদানের সময় গণনা সংশোধন

সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে ১০ বা ১৬ বছর গণনার পরিবর্তে ভুলবশত যোগদানের তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেড প্রদান করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ভুলভাবে দেওয়া উচ্চতর গ্রেড বাতিল এবং অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে।

নতুন পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের সঙ্গে অডিট আপত্তির সম্পর্ক কী?

চিঠির বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় পে স্কেল ২০২৬ জারি হওয়ার পর নির্ভুল পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করা জরুরি। কিন্তু আগের বেতন নির্ধারণে ভুল গ্রেড, অনিয়মিত টাইমস্কেল কিংবা ভুলভাবে দেওয়া উচ্চতর গ্রেড থেকে গেলে নতুন বেতন নির্ধারণেও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো শিক্ষকের বেতন যদি পূর্ববর্তী সময়ে ভুলভাবে উচ্চতর গ্রেডে নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই বেতনকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী বেতন নির্ধারণ করলে ভুলটি পরবর্তী হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে, চাকরির মেয়াদ গণনা, পদোন্নতির তারিখ এবং পূর্বে অনুমোদিত সুবিধার তথ্য সঠিক না হলে বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে অসংগতি তৈরি হতে পারে।

এ কারণে পে ফিক্সেশনের আগে পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণী বিবরণী, সার্ভিস বুক, নিয়োগ ও যোগদানের তারিখ, পদোন্নতির আদেশ এবং উচ্চতর গ্রেড বা টাইমস্কেল মঞ্জুরির নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

তবে চিঠিতে উল্লিখিত অডিট আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব শিক্ষকের পে ফিক্সেশন বন্ধ থাকবে—এমন কোনো সার্বজনীন নির্দেশনা এতে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট আপত্তির আওতাভুক্ত শিক্ষক এবং তাঁদের বেতন নির্ধারণের নথিই এখানে মূল বিবেচ্য।

অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ কি ফেরত দিতে হবে?

চিঠিতে একাধিক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গৃহীত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অডিট আপত্তির তালিকায় থাকা প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ আদায় করা হবে।

অর্থ ফেরতের আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ:

  • কোন আদেশের ভিত্তিতে বেতন বা উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছিল।

  • সংশ্লিষ্ট আদেশটি প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী বৈধ ছিল কি না।

  • প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলিত হয়েছে কি না এবং হলে তার পরিমাণ কত।

  • সংশোধিত বেতন নির্ধারণের পর কোনো অর্থ ফেরতযোগ্য থাকে কি না।

  • অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি বিধি ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কী।

অর্থাৎ, অডিট আপত্তি শনাক্ত হওয়া এবং চূড়ান্তভাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় নির্ধারিত হওয়া এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও বিধিসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে।

শিক্ষকদের এখন কী করণীয়?

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আতঙ্কিত না হয়ে নিজেদের বেতন নির্ধারণ-সংক্রান্ত নথি যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা আগে উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন, জাতীয়করণকৃত হিসেবে টাইমস্কেল গ্রহণ করেছেন কিংবা ২০০৬ ও ২০১৪ সালের উন্নীত গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী আদেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রথমে সার্ভিস বুক ও পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশন বিবরণীর সঙ্গে বর্তমান বেতন নির্ধারণের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এরপর কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস অথবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে জানতে হবে।

পে ফিক্সেশনে সংশোধনের প্রয়োজন হলে অনুমানভিত্তিকভাবে তথ্য পরিবর্তন না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তা সম্পন্ন করা উচিত। একই সঙ্গে সংশোধিত বেতন নির্ধারণী বিবরণী, অনুমোদন এবং অর্থ ফেরত-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

কোন দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে?

চিঠির নিচের অংশে অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় কার্যার্থে পাঠানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রাপকদের মধ্যে রয়েছেন—

1. বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস (ডিসিএ), সিলেট।

2. উপপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা, সিলেট বিভাগ, সিলেট।

3. জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিইও), মৌলভীবাজার।

4. অফিস কপি।

এ থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উপজেলা পর্যায়ের দপ্তরের পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সার্বিক বিশ্লেষণ: পে ফিক্সেশনে নথি যাচাই এখন গুরুত্বপূর্ণ

কুলাউড়া উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের চিঠিটি মূলত অডিটে শনাক্ত হওয়া বেতন নির্ধারণ-সংক্রান্ত অসংগতি সংশোধন এবং সরকারি অর্থের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করার উদ্যোগ। এতে প্রধান শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড, জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের টাইমস্কেল, পুরোনো উন্নীত গ্রেডে বেতন এবং সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড প্রদানের সময় গণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ সঠিক ছিল কি না, তা যাচাই করা এবং ভুল থাকলে বিধি অনুযায়ী সংশোধন করা। পাশাপাশি নতুন পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় পূর্ববর্তী চাকরির ইতিহাস ও অনুমোদিত সুবিধার তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *