সচিবালয় প্রবেশে নতুন নিয়ম: OTP ছাড়া প্রবেশ নয়, অনলাইনে আবেদনেই মিলবে One Time Pass
বাংলাদেশ সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ আরও নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা OTP যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় নিরাপত্তা শাখা থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যথাযথ OTP যাচাই না করে কোনো দর্শনার্থীকে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
নতুন ব্যবস্থায় সচিবালয়ে প্রবেশ করতে আগ্রহী দর্শনার্থীদের আগে অনলাইনে নিবন্ধন ও প্রবেশ পাসের আবেদন করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য secpass.moha.gov.bd-তে রেজিস্ট্রেশন করে গেট পাসের আবেদন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
OTP পেতে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে
প্রাপ্ত নির্দেশনা ও প্রকাশিত প্রক্রিয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করলে সচিবালয় প্রবেশের জন্য One Time Pass পাওয়ার ধাপগুলো মোটামুটি এভাবে সাজানো যায়—
১. অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন
প্রথমে secpass.moha.gov.bd পোর্টালে প্রবেশ করে নতুন ব্যবহারকারী হিসেবে Sign Up/Registration সম্পন্ন করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সচিবালয়ে প্রবেশের অনলাইন আবেদনকে অভ্যন্তরীণ ই-সেবা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২. NID যাচাই
রেজিস্ট্রেশনের পর্যায়ে আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর, জন্মতারিখ ও নাম প্রদান করে পরিচয় যাচাইয়ের ধাপ সম্পন্ন করতে হবে—প্রদত্ত প্রক্রিয়ার চিত্রে এ ধাপটি স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করলেই প্রবেশ পাস পাওয়া যাবে না; আবেদনকারীর পরিচয় তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে সিস্টেমে নিবন্ধন সম্পন্ন হবে।
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন সম্পন্ন
NID যাচাই সফল হওয়ার পর আবেদনকারীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য, বিশেষ করে ঠিকানা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য, পূরণ করে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনলাইন সেবা ব্যবস্থাতেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণ করে আবেদন দাখিলের কথা বলা হয়েছে।
৪. বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট
প্রদত্ত নির্দেশনামূলক ছবিতে পরবর্তী ধাপ হিসেবে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট (একবার) উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সচিবালয়ের ০১ নম্বর গেটে স্থাপিত কিয়স্ক মেশিনে বায়োমেট্রিক প্রদান করতে হবে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। কারণ অনলাইন নিবন্ধনের পর আবেদনকারীর পরিচয়কে প্রবেশ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৫. এরপর OTP-এর জন্য আবেদন
বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর সিস্টেমে লগইন করে One Time Pass (OTP)-এর জন্য আবেদন করা যাবে—প্রদত্ত প্রক্রিয়া চিত্রে এই ধাপটিই চূড়ান্ত আবেদন ধাপ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ, অনলাইন রেজিস্ট্রেশন → NID যাচাই → প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান → বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট—এই ধাপগুলো সম্পন্ন করার পর OTP-ভিত্তিক প্রবেশের প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।
গেটে OTP যাচাই কেন গুরুত্বপূর্ণ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার মূল কারণ হিসেবে সচিবালয়ে যথাযথ প্রবেশ পাস বা অনুমতিপত্র ছাড়া দর্শনার্থীদের প্রবেশের প্রবণতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, অননুমোদিত প্রবেশ সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে দর্শনার্থী গেটে পৌঁছানোর পর শুধু কাগজপত্র বা মৌখিক তথ্যের ওপর নির্ভর না করে OTP যাচাইয়ের মাধ্যমে অনুমোদন নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় দর্শনার্থীর করণীয়
নতুন নিয়ম অনুসরণ করতে চাইলে একজন দর্শনার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো—
- আগে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে;
- NID-সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে;
- প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও ঠিকানার তথ্য পূরণ করতে হবে;
- নির্ধারিত ব্যবস্থায় বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করতে হবে;
- এরপর সিস্টেমে লগইন করে OTP-এর জন্য আবেদন করতে হবে;
- সচিবালয়ে যাওয়ার আগে OTP/অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে;
- গেটে প্রবেশের সময় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করতে হবে।
শুধু অনলাইন আবেদন করলেই কি প্রবেশ নিশ্চিত?
না। অনলাইন রেজিস্ট্রেশন বা আবেদন করা এবং গেটে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া একই বিষয় নয়।
বর্তমান নির্দেশনায় মূল বিষয় হলো—প্রবেশের আগে যথাযথ OTP যাচাই করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নিরাপত্তাকর্মীদের দর্শনার্থীকে প্রবেশের আগে OTP যাচাই করে অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাই আবেদনকারী অনলাইনে তথ্য জমা দেওয়ার পরও গেটে গিয়ে নির্ধারিত নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে প্রবেশের সুযোগ নাও মিলতে পারে।
সচিবালয় প্রবেশ ব্যবস্থায় আরও যেসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে
বাংলাদেশ সচিবালয় প্রবেশ নীতিমালা, ২০২৫-এ দর্শনার্থী ও প্রবেশকারীদের জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালায় স্থায়ী ও অস্থায়ী পাসধারী, পূর্বানুমোদিত দর্শনার্থী এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের প্রবেশের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবেশকারীদের তল্লাশি, কার্ড রিডার, QR কোডসহ প্রযুক্তিনির্ভর প্রবেশব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের নীতিমালা অনুযায়ী, একজন দর্শনার্থীর প্রবেশের সময়সীমা নির্ধারিত থাকবে এবং সাধারণ দর্শনার্থীর দিনে একবার প্রবেশের বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে OTP যাচাই যুক্ত হওয়ায় দর্শনার্থীর পরিচয় ও প্রবেশের অনুমোদন যাচাই আরও নির্দিষ্টভাবে করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পাসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা
সচিবালয়ের দর্শনার্থী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য দৈনিক পাস ইস্যুর সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এর একটি অফিস আদেশের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার একান্ত সচিবদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সংখ্যক পাস ইস্যুর ব্যবস্থা ছিল।
ফলে OTP ব্যবস্থা কেবল দর্শনার্থীর জন্য একটি প্রযুক্তিগত ধাপ নয়; এটি সচিবালয়ের সামগ্রিক প্রবেশ অনুমোদন, পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
OTP-ভিত্তিক প্রবেশব্যবস্থা চালুর পর আবেদনকারীদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, NID-এর নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিজের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে আবেদন করা উচিত নয়।
তৃতীয়ত, OTP বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো গোপন কোড অন্য ব্যক্তির সঙ্গে অপ্রয়োজনে শেয়ার করা উচিত নয়।
চতুর্থত, অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন হয়েছে মানেই প্রবেশ অনুমোদন নিশ্চিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
পঞ্চমত, সচিবালয়ে যাওয়ার আগে আবেদন/পাস/OTP-সংক্রান্ত তথ্য সঠিক আছে কি না তা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি সেবায় ডিজিটাল প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের দিকে আরেক ধাপ
সচিবালয় দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে দর্শনার্থী প্রবেশের ক্ষেত্রে OTP, NID যাচাই এবং বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো অনুমোদিত ব্যক্তি ও অননুমোদিত প্রবেশকারীর মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনায় বিশেষভাবে প্রবেশের আগে OTP যাচাই করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ফলে এখন সচিবালয়ে কোনো কাজে যেতে হলে আগের মতো শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে; নির্ধারিত ডিজিটাল পাস ও OTP প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে।
সংক্ষেপে পুরো প্রক্রিয়া
অনলাইন রেজিস্ট্রেশন
↓
NID যাচাই
↓
নাম, জন্মতারিখ ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান
↓
রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন
↓
সচিবালয়ের ১ নম্বর গেটে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট
↓
সিস্টেমে লগইন
↓
One Time Pass (OTP)-এর জন্য আবেদন
↓
গেটে OTP যাচাই
↓
নির্ধারিত নিয়ম মেনে সচিবালয়ে প্রবেশ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সচিবালয়ে প্রবেশের অনলাইন আবেদনকে আনুষ্ঠানিক ই-সেবা হিসেবে রাখা হয়েছে এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের secpass.moha.gov.bd-তে রেজিস্ট্রেশন করে গেট পাসের আবেদন করতে বলা হয়েছে।
সুতরাং, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনলাইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং প্রবেশের আগে নির্ধারিত OTP যাচাই নিশ্চিত করা। এটি সচিবালয়ের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও যাচাইযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর করার বর্তমান উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


