আবেদন ছাড়াই জিপিএফ কর্তন হচ্ছে? সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বিভ্রান্তি, কী বলছেন অভিজ্ঞরা
নতুন সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর আবেদন ছাড়াই বেতনের ৫ শতাংশ অর্থ সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) হিসেবে কেটে নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ বলছেন এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাটা শুরু হয়, আবার কেউ দাবি করছেন আবেদন ছাড়া জিপিএফ কর্তনের সুযোগই নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি কয়েকজন সরকারি কর্মচারীর অভিজ্ঞতা ও মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কারণে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
কী বলছেন ভুক্তভোগীরা?
একজন সরকারি কর্মচারী জানান, নতুন চাকরিতে বেতন চালু হওয়ার পর থেকেই তার মূল বেতনের ৫ শতাংশ জিপিএফ হিসেবে কেটে নেওয়া হচ্ছে। অথচ তিনি নিজে কোনো আবেদন করেননি। কীভাবে এই কর্তন বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ চান।
এর জবাবে একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জানান, তিনি আগে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, যেখানে কনট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড (সিপিএফ) চালু ছিল। পরে রাজস্ব খাতভুক্ত সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা হয়েছিল। বেতন থেকে জিপিএফ কাটা হলেও সাবসিডিয়ারি লেজার বা জিপিএফ হিসাব বিবরণীতে কোনো জমার তথ্য দেখা যাচ্ছিল না। পরে হিসাবরক্ষণ অফিসে আবেদন করার মাধ্যমে ওই কর্তন বন্ধ করা হয় এবং অপ্রয়োজনীয় জিপিএফ হিসাবও বাতিল করা হয়। তার পরিকল্পনা ছিল চাকরির বয়স দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে জিপিএফ চালু করবেন।
অন্যদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন
অন্যদিকে অনেক সরকারি কর্মচারী জানিয়েছেন, পাঁচ মাস, তিন বছর বা তারও বেশি সময় চাকরি করলেও তাদের ক্ষেত্রে কোনো জিপিএফ কর্তন হয়নি। পরে নিজেরাই আবেদন করে জিপিএফ চালু করেছেন।
একজন মন্তব্য করেন, “সরকারি চাকরিতে আবেদন ছাড়া জিপিএফ কর্তনের নিয়ম নেই।”
আরেকজন বলেন, “জিপিএফ অ্যাকাউন্ট খোলা না হলে টাকা কাটার প্রশ্নই আসে না।”
আবার কেউ কেউ মনে করেন, ডিডিও (Drawing and Disbursing Officer) বা সংশ্লিষ্ট আইবাস (iBAS++) অপারেটরের মাধ্যমে জিপিএফ চালু করা হয়। তাই সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করলে বিষয়টি যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
কেউ বলছেন বাধ্যতামূলক, কেউ বলছেন নয়
আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজনের দাবি, একবার জিপিএফ অ্যাকাউন্ট খোলা হলে নির্ধারিত হারে অর্থ কর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হয়। তবে অ্যাকাউন্ট খোলার আগ পর্যন্ত কোনো কর্তনের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে কেউ কেউ এটিকে “বাধ্যতামূলক” বলে মন্তব্য করলেও অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা সেই দাবির সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, প্রথমে জিপিএফ হিসাব চালুর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হয়, এরপরই নিয়ম অনুযায়ী কর্তন শুরু হয়।
জিপিএফ কর্তন নিয়ে করণীয় কী?
অভিজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
- বেতন থেকে জিপিএফ কাটা শুরু হলেও যদি জিপিএফ হিসাব নম্বরে জমা না দেখা যায়, তাহলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বা এজি (Accountant General) অফিসে যোগাযোগ করা উচিত।
- প্রতিষ্ঠানের আইবাস (iBAS++) অপারেটর বা ডিডিওর সঙ্গে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
- প্রয়োজন হলে লিখিত আবেদন দিয়ে ভুলবশত চালু হওয়া কর্তন বন্ধ বা সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে।
- জিপিএফ হিসাব খোলা থাকলে নিয়মিত হিসাব বিবরণী (Statement) মিলিয়ে দেখা উচিত।
ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবে জিপিএফ
অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, জিপিএফ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি নিরাপদ সঞ্চয় ব্যবস্থা। বেতন থেকে কর্তিত অর্থ ব্যক্তির নিজস্ব হিসাবেই জমা হয় এবং বিধি অনুযায়ী সুদসহ তা পরবর্তীতে উত্তোলনের সুযোগ থাকে। ফলে যারা দীর্ঘমেয়াদে সরকারি চাকরিতে থাকার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য জিপিএফ একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে কোনো আবেদন ছাড়াই জিপিএফ কর্তনের ঘটনা ঘটলে সেটি সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


