৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, পেনশন ও বেতন নির্ধারণে অর্থ বিভাগের নতুন নির্দেশনা

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, পেনশন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ বিভাগ। ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ ও আর্থিক সুবিধা প্রদানের বিষয়ে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি মূলত এমন কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাঁরা আগে থেকেই নির্দিষ্ট বেতন স্কেলে কর্মরত ছিলেন, যাঁরা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন অথবা যাঁদের চাকরির মেয়াদ ও অবসর-সংশ্লিষ্ট সুবিধা নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন বেতন কাঠামো

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ করতে হবে। তবে যাঁদের চাকরির ধরন, নিয়োগের শর্ত কিংবা বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি সাধারণ নিয়মের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাঁদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে।

বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের নিয়োগের প্রকৃতি, পূর্ববর্তী বেতন কাঠামো এবং প্রযোজ্য বিধান বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছে বলেই প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ করা যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুসারে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রত্যেক কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে প্রযোজ্য নিয়মে বেতন নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন নির্ধারণে কী বলা হয়েছে?

প্রজ্ঞাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। যাঁরা আগে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর আওতাভুক্ত বিভিন্ন গ্রেডে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর বেতন নির্ধারণে প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত শর্ত ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পূর্ববর্তী বেতন, নিয়োগের শর্ত এবং প্রযোজ্য বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বেতন নির্ধারণের সময় শুধু পদবি বা গ্রেড বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপত্র ও চাকরির শর্তও যাচাই করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই হারে বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তাঁর ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনের কোন বিধান প্রযোজ্য, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

পেনশন ও অবসর-সংশ্লিষ্ট সুবিধার ক্ষেত্রে প্রভাব

নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে পেনশন ও অবসর-সংশ্লিষ্ট সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নির্ধারিত বেতন থেকে পেনশন বা পেনশন-সংশ্লিষ্ট সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান অনুসরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নির্ধারিত বেতন পাওয়া এবং নিয়মিত চাকরির ভিত্তিতে পেনশনযোগ্য বেতন নির্ধারণ এক বিষয় নয়। কোনো কর্মচারী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আওতায় বেতন পেলেই তাঁর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশন বা অবসর-সুবিধা সৃষ্টি হবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং অবসর-সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি ও প্রযোজ্য সরকারি আদেশ বিবেচনা করতে হবে। তাই যাঁরা অবসরের কাছাকাছি রয়েছেন অথবা ইতোমধ্যে অবসর-সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছেন, তাঁদের জন্য ব্যক্তিগত চাকরির নথি যাচাই করা বিশেষভাবে জরুরি।

চুক্তির মেয়াদ ও নিয়োগের শর্ত যাচাই জরুরি

প্রজ্ঞাপনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগের শর্ত বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে এবং পরে যাঁরা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান এক কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

এ কারণে বেতন নির্ধারণের আবেদন বা হিসাব প্রস্তুত করার সময় নিয়োগপত্র, পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণী বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আদেশ সংরক্ষণ করা উচিত। এসব নথির ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্মচারীর প্রাপ্য বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণ করতে পারবে।

বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুবিধা কি প্রযোজ্য হবে?

জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিষয়েও কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে এসব সুবিধা প্রযোজ্য হবে কি না, তা নির্ধারণে তাঁদের নিয়োগের শর্ত ও প্রজ্ঞাপনের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করতে হবে।

নিয়মিত চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সুবিধা একই রকম হবে—এমনটি ধরে নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী প্রতিটি সুবিধার যোগ্যতা যাচাই করতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য, প্রজ্ঞাপনের দৃশ্যমান অনুলিপিতে প্রতিটি সুবিধার জন্য আলাদা অঙ্ক বা সর্বজনীন প্রাপ্যতার হিসাব স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাই নির্দিষ্ট কোনো কর্মচারী কত টাকা পাবেন, তা নির্ধারণের জন্য তাঁর চাকরির ধরন ও প্রযোজ্য বিধান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের করণীয়

অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্মকর্তাদের কাছে অনুলিপি পাঠানোর তালিকা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর করণীয় হতে পারে—

১. কর্মচারীর নিয়োগের ধরন ও চাকরির শর্ত যাচাই করা।

২. পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণী বিবরণী এবং প্রযোজ্য সরকারি আদেশ পরীক্ষা করা।

৩. জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য, তা নিশ্চিত করা।

৪. পেনশন ও অন্যান্য অবসর-সংশ্লিষ্ট সুবিধার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যোগ্যতা যাচাই করা।

৫. প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের মাধ্যমে বেতন নির্ধারণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা।

এসব পদক্ষেপ অনুসরণ করা হলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুল, অসামঞ্জস্য এবং পরবর্তী সময়ে আর্থিক জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর যাঁরা বেতন নির্ধারণ বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন, তাঁদের প্রথমে নিজেদের নিয়োগের ধরন ও প্রযোজ্য বিধান নিশ্চিত করা উচিত।

বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র, চুক্তির মেয়াদ, বেতন নির্ধারণের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ একসঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নিজ দপ্তরের প্রশাসন শাখা বা সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে, নিয়মিত রাজস্ব খাতভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তাঁদের নিজস্ব চাকরিবিধি ও জাতীয় বেতন স্কেলের প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য দেওয়া কোনো নির্দেশনা নিয়মিত চাকরির সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না।

শেষ কথা

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে অর্থ বিভাগের ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ এবং চাকরির শর্ত অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে নিয়োগের প্রকৃতি, পূর্ববর্তী বেতন এবং প্রযোজ্য বিধান বিবেচনা করা জরুরি।

তবে প্রজ্ঞাপনের প্রতিটি ধারা ও শর্তের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া সব কর্মচারীর বেতন, পেনশন বা অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে একক সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নিজ নিজ দপ্তরের মাধ্যমে প্রযোজ্য বিধান নিশ্চিত করে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা উচিত।

সূত্র: অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার; ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *