দুই বদলি আদেশেও যোগদান নেই—দুই বছর ধরে কর্মস্থলহীন সরকারি কর্মচারীর পরিণতি কী?
একজন সরকারি কর্মচারী প্রায় দুই বছর আগে এক কর্মস্থল থেকে অন্যত্র বদলি হয়েছেন। কিন্তু বদলিকৃত কর্মস্থলে তিনি যোগদান করেননি। পরে সুপারিশের মাধ্যমে আবারও আরেকটি বদলি আদেশ করানো হয়েছে। দ্বিতীয় বদলির কর্মস্থলেও তিনি যোগদান করেননি। এর মধ্যে আগের কর্তৃপক্ষ তাকে রিলিজ করে দিয়েছে। এমনকি তিনি এলপিসি (Last Pay Certificate—শেষ বেতন সনদ) নেননি এবং বেতনও দাবি করছেন না। প্রশ্ন উঠেছে—এ অবস্থায় ওই কর্মচারীর চাকরির অবস্থান কী এবং শেষ পর্যন্ত তার কী শাস্তি হতে পারে?
ঘটনাটি কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়; দীর্ঘদিন দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকার কারণে এটি বিভাগীয় শৃঙ্খলা কার্যক্রমের গুরুতর বিষয়ে পরিণত হতে পারে।
বদলি আদেশ মানা কি বাধ্যতামূলক?
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১১ ধারায় সরকার বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে সরকারি কর্মচারীকে বদলি, পদায়ন বা কর্মস্থল নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বৈধ বদলি বা পদায়ন আদেশ জারি হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর দায়িত্ব হচ্ছে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নতুন কর্মস্থলে যোগদান করা।
তবে বাস্তবে বদলি আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত আপত্তি, প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনা, স্থগিতাদেশ, ছুটি বা অন্য কোনো বৈধ কারণ থাকলে বিষয়টি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
দুই বছর কর্মস্থলে না থাকা কেন গুরুতর?
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-তে ‘পলায়ন (Desertion)’-এর সংজ্ঞার মধ্যে বিনা অনুমতিতে ৬০ দিন বা তদূর্ধ্ব সময় কর্ম থেকে অনুপস্থিত থাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি যদি নথিপত্রের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় এবং ওই সময়ের অনুপস্থিতির পক্ষে কোনো অনুমোদিত ছুটি, আদালতের আদেশ, কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি বা অন্য বৈধ কারণ না থাকে, তাহলে প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থাকার ঘটনা সাধারণ অনুপস্থিতির সীমা ছাড়িয়ে ‘পলায়ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রথম বদলির কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে দ্বিতীয় বদলি নেওয়া হলেও দ্বিতীয় কর্মস্থলে যোগ না করার ফলে অনুপস্থিতির ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে যায় না।
‘এলপিসি নিইনি, বেতনও চাই না’—এতে কি দায় থেকে মুক্তি?
না, সাধারণভাবে শুধু বেতন না নেওয়া বা এলপিসি না নেওয়াকে অনুপস্থিতির বৈধ কারণ হিসেবে ধরা যায় না।
একজন কর্মচারী বেতন দাবি না করলেও তার ওপর অর্পিত সরকারি দায়িত্ব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি পান না। একইভাবে আগের কর্তৃপক্ষ রিলিজ করে দিলেই নতুন কর্মস্থলে যোগদানের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না।
বরং এখানে প্রশাসনিকভাবে আরও কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়—রিলিজ অর্ডারের পর কর্মচারীর পরবর্তী অবস্থান কী ছিল, তিনি কোথায় রিপোর্ট করেছেন, যোগদানের চেষ্টা করেছিলেন কি না, কোনো ছুটি নিয়েছিলেন কি না এবং নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার লিখিত অনুমতি ছিল কি না।
এই নথিগুলোই শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কী ধরনের শাস্তি হতে পারে?
দীর্ঘ অননুমোদিত অনুপস্থিতি প্রমাণিত হলে বিভাগীয় কার্যধারার মাধ্যমে শাস্তি হতে পারে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর অধীনে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে বিভিন্ন মাত্রার দণ্ডের বিধান রয়েছে। আদালতের একটি রায়ে ৬০ দিনের বেশি অননুমোদিত অনুপস্থিতিকে ‘পলায়ন’ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বাস্তবে এর পরিণতি লঘুদণ্ড থেকে গুরুদণ্ড পর্যন্ত যেতে পারে—মামলার অভিযোগ, প্রমাণ, কর্মচারীর ব্যাখ্যা, অনুপস্থিতির কারণ এবং কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।
এমনকি সরকারি গেজেটে দীর্ঘ অননুমোদিত অনুপস্থিতি ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের নজিরও রয়েছে।
অন্যদিকে সব মামলার ফল যে চাকরিচ্যুতি হবে, তা বলা যাবে না। একটি সরকারি গেজেটের ঘটনায় দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’ প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে নির্দিষ্ট মেয়াদের বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের মতো লঘুদণ্ড দেওয়ার নজিরও রয়েছে।
অর্থাৎ ‘দুই বছর অনুপস্থিত = নিশ্চিত বরখাস্ত’—এমন সরল হিসাব আইন দেয় না। বিভাগীয় কার্যধারায় প্রমাণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
বিভাগীয় মামলা হলে কী হবে?
কর্তৃপক্ষ চাইলে কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যধারা শুরু করতে পারে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩১ ধারায় সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যধারা রুজু ও পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।
সেক্ষেত্রে সাধারণত অভিযোগ নির্ধারণ, কারণ দর্শানোর সুযোগ, প্রয়োজন হলে তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বক্তব্য বিবেচনার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি এগোয়।
কর্মচারী যদি নোটিশের জবাব না দেন বা তদন্তে অংশগ্রহণ না করেন, তাতেও প্রক্রিয়া সবসময় থেমে যায় না। সরকারি গেজেটের বিভিন্ন নথিতে দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মচারী জবাব না দিলেও বা তদন্তে উপস্থিত না হলেও বিভাগীয় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
‘খোঁজ নিয়ে দেখুন, বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে’—এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হয়?
প্রশ্নে ব্যবহৃত এই কথাটি মূলত দীর্ঘদিন ধরে অফিসে অনুপস্থিত থাকা নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশার প্রকাশ। বাস্তবে অবশ্য কর্তৃপক্ষকে প্রথমেই ধরে নিতে হবে না যে কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন বা মারা গেছেন।
প্রশাসনের দায়িত্ব হবে তার বর্তমান অবস্থান, ঠিকানা, ছুটির রেকর্ড, বদলি ও রিলিজ আদেশ, যোগদানের রেকর্ড, এলপিসি, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত তথ্য এবং কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে কি না—এসব যাচাই করা।
যদি কর্মচারী সত্যিই অসুস্থ, নিখোঁজ, আটক, বিদেশে অবস্থানরত কিংবা অন্য কোনো অনিবার্য পরিস্থিতিতে থাকেন, তাহলে সেই তথ্যের আইনগত গুরুত্ব রয়েছে। আবার যদি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে প্রায় দুই বছর দায়িত্বে না থাকেন, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি।
তাহলে মূল প্রশ্ন—চাকরি কি এমনিতেই শেষ হয়ে গেছে?
না, শুধু কাজে যোগ না দেওয়া, বেতন না নেওয়া বা এলপিসি না নেওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরি শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।
চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ডের জন্য প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুসারে যথাযথ বিভাগীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। একই সঙ্গে অননুমোদিত অনুপস্থিতির সময়ের বেতন-ভাতা এবং চাকরির অন্যান্য সুবিধা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সেটিও কর্তৃপক্ষকে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
আসল রহস্য অন্য জায়গায়
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত কর্মচারী কেন যোগ দেননি, তার চেয়েও বড়—প্রায় দুই বছর ধরে তিনি যোগদান না করেও প্রশাসনিকভাবে কীভাবে ‘ঝুলে’ আছেন?
যদি প্রথম কর্তৃপক্ষ রিলিজ করে থাকে, দ্বিতীয় বদলি হয়ে থাকে, কিন্তু তিনি কোথাও যোগ না দিয়ে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক শাখার কাছে তার অবস্থান নিয়ে নথিভুক্ত ব্যবস্থা থাকার কথা।
এখানে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—
প্রথমত, প্রথম বদলির পর তাকে যোগদানে বাধ্য করতে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না।
দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বদলি আদেশের পর তিনি কোথায় রিপোর্ট করেছেন।
তৃতীয়ত, তার অনুপস্থিতির বিষয়ে কোনো ছুটি অনুমোদিত হয়েছিল কি না।
চতুর্থত, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হয়েছে কি না।
পঞ্চমত, বেতন না নিলেও তার সার্ভিস রেকর্ডে তাকে কী অবস্থায় দেখানো হচ্ছে।
ষষ্ঠত, এত দীর্ঘ সময় ধরে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে থাকলে তার কারণ কী।
এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটিকে শুধু ‘ক্ষমতাবানদের কিছু লাগে না’ বলে চূড়ান্ত মন্তব্য করাও ঠিক হবে না।
শেষ কথা
আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা। একজন সাধারণ কর্মচারী যদি বদলি আদেশ অমান্য করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি কোনো প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই বিধি প্রযোজ্য হওয়ার কথা।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-তে কর্মস্থলে উপস্থিতি ও সরকারি আদেশ পালনের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনুপস্থিতি ও কর্তব্যে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রয়েছে।
তাই আলোচিত কর্মচারীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ হলো—তার সার্ভিস বুক, বদলি আদেশ, রিলিজ অর্ডার, এলপিসি, ছুটির রেকর্ড, যোগদান সংক্রান্ত নথি এবং বেতন সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই করে প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা।
যদি সত্যিই প্রায় দুই বছর ধরে কোনো বৈধ অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো কর্মস্থলেই যোগদান না করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি নিছক ‘বদলি না মানা’ নয়; ২০১৮ সালের শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার আলোকে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হতে পারে। আর চূড়ান্ত শাস্তি হবে প্রমাণ ও বিভাগীয় প্রক্রিয়ার ফলাফলের ভিত্তিতে।
সুতরাং প্রশ্নটি এখন শুধু ‘তিনি কোথায় আছেন?’ নয়—প্রশ্ন হলো, প্রায় দুই বছর ধরে তিনি কোথাও দায়িত্ব পালন না করেও প্রশাসনিকভাবে কী অবস্থায় আছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এতদিনে কী ব্যবস্থা নিয়েছে?



