বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

নতুন পে স্কেলে গ্রেড-৯ ও ১০-এর বাড়িভাড়া ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন, ১০ম গ্রেডে ৪৫% বাড়িভাড়ার দাবি উঠছে

নবম জাতীয় পে-স্কেলের নতুন বেতন-ভাতা কাঠামো প্রকাশের পর বিভিন্ন গ্রেডের মূল বেতন, বাড়িভাড়া ও মোট প্রাপ্য নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ৯ম ও ১০ম গ্রেডের মধ্যে মোট বেতন-ভাতার ব্যবধান, এবং ১০ম গ্রেডের বাড়িভাড়া হার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ।

প্রকাশিত পে-স্কেলের হিসাব এবং আলোচিত একটি তুলনামূলক চার্টে দেখা যাচ্ছে, ৯ম গ্রেডের মূল বেতন ও বাড়িভাড়া যোগ করে মোট প্রাপ্য ১০ম গ্রেডের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সঙ্গে ১০ম গ্রেডের পরবর্তী কয়েকটি গ্রেডে মূল বেতন ও বাড়িভাড়ার সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমান গেজেটের বাড়িভাড়ার হার এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মহলের প্রস্তাবিত/দাবিকৃত হার এক বিষয় নয়। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর হিসাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ম–১৫তম গ্রেডে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৫০ শতাংশ এবং ৫ম–৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য নির্ধারিত শহর ও এলাকায় এই হার যথাক্রমে ৪০ ও ৩৫ শতাংশ; অন্যান্য এলাকায় ৩৫ ও ৩০ শতাংশ।

৯ম ও ১০ম গ্রেডের ব্যবধান কেন আলোচনায়?

ছবিতে উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী ৯ম গ্রেডের মূল বেতন ৪৪,০০০ টাকা এবং বাড়িভাড়া ১৩,২০০ টাকা ধরে মোট ৫৭,২০০ টাকা দেখানো হয়েছে।

অন্যদিকে ১০ম গ্রেডে মূল বেতন ৩২,০০০ টাকা এবং বাড়িভাড়া ১১,২০০ টাকা ধরে মোট ৪৩,২০০ টাকা দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ ওই হিসাব অনুসারে শুধু মূল বেতন ও বাড়িভাড়া যোগ করলেই দুই গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ১৪,০০০ টাকা

এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে, ৯ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল বেতন যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে, তেমনি গ্রেডভিত্তিক বাড়িভাড়ার হারও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া কত শতাংশে নির্ধারিত হচ্ছে—সেটিও মোট প্রাপ্য বেতনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

১০ম গ্রেডের বাড়িভাড়া নিয়ে কেন নতুন দাবি?

এখন ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের একটি অংশের আলোচনায় আসছে বাড়িভাড়া ৪৫ শতাংশ করার দাবি

দাবিটির পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, ১০ম গ্রেডের পরবর্তী কয়েকটি গ্রেডে যদি বাড়িভাড়ার হার বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট গ্রেডগুলোর মোট বেতন-ভাতার ব্যবধান অনেকটা কমে আসতে পারে।

অন্যদিকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের যুক্তি হতে পারে—যেহেতু ১০ম গ্রেড একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা পর্যায় এবং এর সঙ্গে ৯ম গ্রেডের বেতন কাঠামোর পার্থক্য তুলনামূলকভাবে বড়, তাই বাড়িভাড়ার হার পুনর্বিবেচনা করা হলে ১০ম গ্রেডকেও আলোচনার মধ্যে রাখা প্রয়োজন।

১১ থেকে ১৩ গ্রেডের ৪৫% বাড়িভাড়া হলে কী হবে?

এখানেই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক দিকটি রয়েছে।

ছবিতে ১১, ১২ ও ১৩ গ্রেডের মূল বেতন ও বাড়িভাড়ার যে হিসাব দেখানো হয়েছে, সেখানে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলকভাবে কম ধরে মোট বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।

যদি কোনো প্রস্তাবের মাধ্যমে ১১ থেকে ১৩ গ্রেডে বাড়িভাড়া ৪৫ শতাংশ করা হয়, তাহলে ওই গ্রেডগুলোর মোট প্রাপ্য বাড়বে। ফলে ১০ম গ্রেডের সঙ্গে তাদের বেতন-ভাতার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

এ কারণেই আলোচনায় প্রশ্ন উঠছে—১১–১৩ গ্রেডের বাড়িভাড়া যদি ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করার দাবি উঠতে পারে, তাহলে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বাড়িভাড়া নিয়েও কি আলাদা দাবি থাকা উচিত নয়?

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: ১১–১৩ গ্রেডকে ৪৫ শতাংশ দেওয়ার দাবি বর্তমান গেজেটের নির্ধারিত হার নয়; এটি দাবি বা প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

বর্তমান গেজেটে ১০ম গ্রেড কোথায়?

প্রকাশিত নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। একই এলাকায় ৫ম থেকে ৯ম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয়েছে।

অর্থাৎ ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে বর্তমান গেজেটের বাস্তব চিত্রটি ছবিতে আলোচিত দাবির চেয়ে ভিন্ন। এখানে ১০ম গ্রেড ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া কাঠামোর মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও নির্দিষ্ট এলাকার ক্ষেত্রে ১০ম–১৫তম গ্রেডে হার ৪০ শতাংশ, আর অন্যান্য এলাকায় ৩৫ শতাংশ

তাই ১০ম গ্রেডের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়ার দাবি বাস্তবে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ঢাকার বাইরে কর্মরত ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে, কারণ সেখানে বর্তমান নির্ধারিত হার ৪০ বা ৩৫ শতাংশ।

একই গ্রেড হলেও কর্মস্থলভেদে পার্থক্য

নতুন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু গ্রেড নয়, কর্মস্থলের অবস্থানও বাড়িভাড়ার হার নির্ধারণ করছে

গ্রেডঢাকা উত্তর/দক্ষিণ সিটিঅন্যান্য নির্ধারিত শহরঅন্যান্য এলাকা
১৬–২০৬০%৫০%৪৫%
১০–১৫৫০%৪০%৩৫%
৫–৯৪৫%৩৫%৩০%
১–৪৪০%৩০%২৫%

এই কাঠামো অনুযায়ী ১০ম গ্রেড ঢাকায় ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া পেলেও একই গ্রেডের একজন কর্মকর্তা অন্য এলাকায় ৪০ বা ৩৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পেতে পারেন।

ফলে ১০ম গ্রেডের বাড়িভাড়া নিয়ে আলোচনা করতে গেলে গ্রেডের পাশাপাশি কর্মস্থলভিত্তিক হারও বিবেচনায় নিতে হবে।

৯ম গ্রেডে গিয়ে বাড়িভাড়া কমে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায়

নতুন কাঠামোয় আরেকটি বিষয় ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। ঢাকায় ১০ম–১৫তম গ্রেডের জন্য বাড়িভাড়া ৫০ শতাংশ হলেও ৯ম–৫ম গ্রেডে তা ৪৫ শতাংশ।

অর্থাৎ কোনো কর্মকর্তা ১০ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে গেলে মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়ার শতাংশ ৫০ থেকে ৪৫ শতাংশে নেমে যায়।

এতে অবশ্যই মোট বাড়িভাড়া কমবে—এমন নয়; কারণ মূল বেতন কতটা বাড়ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে মূল বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ যথেষ্ট না হলে বাড়িভাড়ার টাকার অঙ্কে প্রত্যাশিত বৃদ্ধি নাও দেখা যেতে পারে। এ বিষয়টি পে-ফিক্সেশনের সময় আলাদাভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।

তাহলে ১০ম গ্রেডের ৪৫% দাবির যৌক্তিকতা কোথায়?

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার।

প্রথমত, ঢাকায় কর্মরত ১০ম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্তমান গেজেটেই বাড়িভাড়া ৫০ শতাংশ। তাই সেখানে ৪৫ শতাংশ করার দাবি করলে বরং বর্তমান হারের তুলনায় কম হবে।

দ্বিতীয়ত, অন্যান্য এলাকায় কর্মরত ১০ম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্তমান হার ৪০ শতাংশ বা ৩৫ শতাংশ। এসব এলাকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়ার দাবি তুললে সেটি বর্তমান গেজেটের তুলনায় একটি বাড়তি সুবিধার দাবি হবে।

অতএব, ‘১০ম গ্রেডের সবার বাড়িভাড়া ৪৫ শতাংশ করা উচিত’—এমন বক্তব্যকে কর্মস্থলভেদে বিশ্লেষণ করতে হবে।

কেন এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ?

নতুন পে-স্কেল শুধু মূল বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, অন্যান্য ভাতা এবং বিভিন্ন সুবিধা মিলিয়ে একজন সরকারি চাকরিজীবীর প্রকৃত মাসিক প্রাপ্য নির্ধারিত হয়।

এ কারণে কোনো গ্রেডের তুলনা করতে গেলে শুধু বেসিক বেতন দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। বরং দেখতে হবে—

মূল বেতন + বাড়িভাড়া + চিকিৎসা ভাতা + অন্যান্য প্রাপ্য = মোট মাসিক প্রাপ্য।

নতুন পে-স্কেলে বাড়িভাড়ার হার গ্রেডভেদে পরিবর্তিত হওয়ায় এই সমন্বিত হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

শেষ কথা

ছবিতে উপস্থাপিত হিসাব মূলত গ্রেডভিত্তিক বেতন ও বাড়িভাড়ার তুলনা এবং একটি দাবির যুক্তি তুলে ধরছে। সেখানে ৯ম ও ১০ম গ্রেডের ব্যবধানকে কেন্দ্র করে ১০ম গ্রেডের বাড়িভাড়া নিয়ে নতুন করে দাবি তোলার কথা বলা হয়েছে।

তবে সরকারি গেজেটের বাস্তব কাঠামো অনুযায়ী বিষয়টি আরও নির্দিষ্ট। ঢাকায় ১০ম গ্রেডের বাড়িভাড়া বর্তমানে ৫০ শতাংশ, আর অন্যান্য নির্ধারিত শহর ও অন্যান্য এলাকায় যথাক্রমে ৪০ ও ৩৫ শতাংশ। তাই ১০ম গ্রেডের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়ার দাবি মূলত ঢাকার বাইরে কর্মরতদের ক্ষেত্রে বর্তমান হারের তুলনায় বাড়তি সুবিধার দাবি হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্যদিকে ১১–১৩ গ্রেডের বাড়িভাড়া ৪৫ শতাংশ করার কোনো দাবি উঠলে সেটিও দাবি/প্রস্তাব হিসেবে আলাদাভাবে উল্লেখ করা উচিত, যাতে সেটিকে প্রকাশিত গেজেটের সিদ্ধান্ত হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন না করা হয়।

এই বেতন-ভাতা কাঠামো নিয়ে পরবর্তী সময়ে সংশোধন, ব্যাখ্যা বা নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হলে তখন গ্রেডভিত্তিক মোট প্রাপ্যের হিসাব আবারও পরিবর্তিত হতে পারে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *