পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

অবসরে গেলে পেনশন-গ্রাচুইটি কত পাবেন, নিজেই হিসাব করুন

সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর একজন কর্মচারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রাপ্যতার মধ্যে রয়েছে পেনশন, গ্রাচুইটি ও অন্যান্য অবসর সুবিধা। চাকরিজীবনের শেষ দিকে অনেকেই জানতে চান—শেষ মূলবেতন অনুযায়ী অবসরের পর এককালীন গ্রাচুইটি কত টাকা পাওয়া যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে একটি সহজ হিসাব প্রচলিত হয়েছে—শেষ বেসিক বা মূলবেতনকে ১০৩.৫০ দিয়ে গুণ করলেই পেনশন গ্রাচুইটির পরিমাণ পাওয়া যায়

তবে বিষয়টি বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। ১০৩.৫০ দিয়ে গুণ করার সূত্রকে সরকারি সবার জন্য প্রযোজ্য চূড়ান্ত গ্রাচুইটি হিসাব হিসেবে সরাসরি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সরকারি পেনশন ব্যবস্থায় প্রকৃত হিসাব নির্ভর করে অবসরের তারিখ, পেনশনযোগ্য চাকরির মেয়াদ, শেষ মূলবেতন, প্রাপ্য নিট পেনশনসহ সংশ্লিষ্ট বিধি ও অনুমোদিত হিসাবের ওপর। সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অনলাইন ক্যালকুলেটরেও এসব একাধিক তথ্য নিয়ে হিসাব করা হয়।

৬০ হাজার টাকা বেসিক হলে ৬২ লাখ ১০ হাজার টাকা—হিসাবটি কীভাবে আসে?

প্রচারিত সূত্র অনুযায়ী, যদি কোনো কর্মচারীর শেষ মূলবেতন ৬০,০০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে—

৬০,০০০ × ১০৩.৫০ = ৬২,১০,০০০ টাকা

অর্থাৎ এই সূত্র প্রয়োগ করলে সম্ভাব্য এককালীন গ্রাচুইটির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ লাখ ১০ হাজার টাকা

এখানে ১০৩.৫০ একটি গুণনীয়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে শেষ বেসিক যত বাড়বে, একই সূত্রে হিসাব করা এককালীন অর্থের পরিমাণও আনুপাতিকভাবে বাড়বে।

কয়েকটি উদাহরণ

শেষ মূলবেতন১০৩.

৫০ দিয়ে গুণপ্রচলিত সূত্রে হিসাব৩০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৩১,০৫,০০০ টাকা৪০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৪১,৪০,০০০ টাকা৫০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৫১,৭৫,০০০ টাকা৬০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৬২,১০,০০০ টাকা৭০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৭২,৪৫,০০০ টাকা৮০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৮২,৮০,০০০ টাকা৯০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০৯৩,১৫,০০০ টাকা১,০০,০০০ টাকা× ১০৩.৫০১,০৩,৫০,০০০ টাকা

অর্থাৎ, উদাহরণ হিসেবে শেষ বেসিক ১ লাখ টাকা হলে প্রচলিত এই সূত্রে এককালীন অঙ্ক দাঁড়ায় ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা

কিন্তু শুধু শেষ বেসিক জানলেই কি চূড়ান্ত গ্রাচুইটি জানা যায়?

না। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশ সরকারের পেনশন ব্যবস্থাপনার সরকারি ক্যালকুলেটরে পেনশন হিসাবের জন্য জন্মতারিখ, অবসরের তারিখ এবং অবসরের তারিখে নিট পেনশনের পরিমাণের মতো তথ্য চাওয়া হয়। অন্য সরকারি পেনশন ক্যালকুলেটর সংস্করণে জন্মতারিখ, অবসরের তারিখ, যোগদানের তারিখ, নিট পেনশনযোগ্য চাকরির মেয়াদ, শেষ মূলবেতন এবং ছুটির মাসের তথ্য নেওয়া হয় এবং ফলাফলে Net Pension, Total Gratuity ও Lump Grant আলাদাভাবে দেখানো হয়।

এ থেকে স্পষ্ট যে গ্রাচুইটি, পেনশন ও লাম্প গ্রান্ট—একই বিষয় নয় এবং একটি মাত্র গুণের মাধ্যমে সব অবসর সুবিধার পূর্ণ হিসাব করা যায় না।

পেনশন ও গ্রাচুইটির মধ্যে পার্থক্য

অবসরের পর মাসে মাসে যে অর্থ পাওয়া যায় সেটি পেনশন। অন্যদিকে গ্রাচুইটি হলো অবসরকালীন একটি এককালীন আর্থিক সুবিধা। এর পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লাম্প গ্রান্টসহ অন্যান্য সুবিধার হিসাবও হতে পারে।

সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে নতুন পেনশনারের জন্য গ্রাচুইটি প্রদানের আলাদা EFT ফরমও রয়েছে।

অর্থাৎ অবসরের সময় একজন কর্মচারীর মোট প্রাপ্য অর্থ নির্ধারণ করতে শুধু “শেষ বেসিক × ১০৩.৫০” হিসাব করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাবে—এমনটি বলা নিরাপদ নয়।

সরকারি পেনশন ক্যালকুলেটরে কী কী তথ্য গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারি ক্যালকুলেটরের তথ্য কাঠামো বিশ্লেষণ করলে অবসর সুবিধা হিসাবের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা যায়—

১. শেষ মূলবেতন: অবসরের সময়কার প্রাসঙ্গিক মূলবেতন হিসাবের অন্যতম ভিত্তি।

২. পেনশনযোগ্য চাকরির মেয়াদ: কত বছর চাকরি পেনশনযোগ্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।

৩. অবসরের তারিখ: অবসর গ্রহণের তারিখের সঙ্গে প্রযোজ্য বিধি ও হিসাবের সম্পর্ক রয়েছে।

৪. নিট পেনশন: সরকারি ক্যালকুলেটরে অবসরের তারিখে নিট পেনশনের পরিমাণও ইনপুট হিসেবে নেওয়া হয়।

৫. প্রাপ্য ছুটি: সংশ্লিষ্ট ক্যালকুলেটরে ছুটির মাসের তথ্যও ব্যবহৃত হয় এবং ফলাফলে লাম্প গ্রান্ট আলাদাভাবে দেখানো হয়।

তাই ১০৩.৫০-এর হিসাবকে কীভাবে দেখবেন?

১০৩.৫০-এর সূত্রটি দ্রুত আনুমানিক হিসাব বোঝার একটি প্রচলিত পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন ৬০ হাজার টাকা শেষ বেসিক ধরে ৬২ লাখ ১০ হাজার টাকার অঙ্কটি বের করা যায়।

কিন্তু অবসরের আগে নিজের প্রকৃত প্রাপ্য জানতে হলে সংশ্লিষ্ট অফিসের হিসাব শাখা, পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি পেনশন ক্যালকুলেটরের হিসাবকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের ক্যালকুলেশন ব্যবস্থায় একাধিক তথ্যের ভিত্তিতে Total Gratuity নির্ণয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামোয় কেন এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ?

বেতন কাঠামোয় মূলবেতন পরিবর্তিত হলে অবসর সুবিধার হিসাব নিয়েও সরকারি কর্মচারীদের আগ্রহ বাড়ে। বিশেষ করে যারা অবসরের কাছাকাছি রয়েছেন, তারা শেষ মূলবেতন কত হবে এবং সেই মূলবেতনের ভিত্তিতে অবসর সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে—তা জানতে চান।

এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেকোনো “এক লাইনের” সূত্র ব্যবহার করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও পেনশন বিধি যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০ এবং বিভিন্ন পেনশন আদেশ ও বিধির রেফারেন্সও প্রকাশ করা হয়েছে।

শেষ কথা

শেষ বেসিক ৬০,০০০ টাকা হলে ১০৩.৫০ দিয়ে গুণ করে ৬২ লাখ ১০ হাজার টাকা পাওয়া যায়—গাণিতিকভাবে হিসাবটি সঠিক। কিন্তু এটিকে প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর চূড়ান্ত পেনশন-গ্রাচুইটি হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

সরকারি ব্যবস্থায় অবসর সুবিধার পূর্ণ হিসাব করতে চাকরির মেয়াদ, অবসরের তারিখ, শেষ মূলবেতন, নিট পেনশন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। সরকারি পেনশন ক্যালকুলেটরেও Net Pension, Total Gratuity এবং Lump Grant আলাদাভাবে নির্ণয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

সুতরাং, “শেষ বেসিক × ১০৩.৫০” দিয়ে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত গ্রাচুইটির অঙ্ক জানতে সরকারি হিসাবই অনুসরণ করা উচিত।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *