পে-স্কেল I গেজেট । প্রজ্ঞাপন । পরিপত্র

সরকারি উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটে ব্যয়সংকোচনের শর্ত শিথিল, নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণে নতুন নির্দেশনা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে আগে জারি করা ব্যয় স্থগিত/হ্রাসকরণসংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে সংশোধন এনেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। নতুন নির্দেশনায় সরকারি ভবন নির্মাণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের বাজেট অনুবিভাগ-১-এর শাখা-১ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা এক পরিপত্রে এ সংশোধনী আনা হয়। পরিপত্রটি ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কতিপয় ব্যয় স্থগিত/হ্রাসকরণসংক্রান্ত মূল পরিপত্রের নির্দিষ্ট দুটি শর্ত প্রতিস্থাপন করেছে। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ব্যয় স্থগিত/হ্রাসকরণসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছে।

যে দুটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে

নতুন পরিপত্রে মূলত পরিচালন বাজেটের আওতায় ভবন নির্মাণ এবং উন্নয়ন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ—এই দুটি খাতে আগের বিধিনিষেধের বাস্তবায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে।

১. ভবন নির্মাণে শর্ত কিছুটা শিথিল

আগের নির্দেশনায় নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। নতুন সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ছাড়া নতুন আবাসিক, অনাবাসিক ও অন্যান্য ভবন নির্মাণ বন্ধ থাকবে।

তবে এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

কোনো চলমান নির্মাণকাজ ন্যূনতম ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকলে, অর্থ বিভাগের অনুমোদনক্রমে ওই নির্মাণকাজের ব্যয় নির্বাহ করা যাবে।

অর্থাৎ, যেসব ভবনের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছে, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে না রেখে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কাজ শেষ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের স্থাপনা নির্মাণ জরুরি প্রয়োজনীয় হলে এবং তার পক্ষে উপযুক্ত যৌক্তিকতা দেওয়া হলে অর্থ বিভাগ থেকে কেস-টু-কেস অনুমোদনের মাধ্যমে ব্যয় নির্বাহ করা যাবে।

ফলে নতুন ভবন নির্মাণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়নি; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুমোদনের পথ রাখা হয়েছে।

২. ভূমি অধিগ্রহণে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে

উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে ‘ভূমি অধিগ্রহণ’ খাতে অর্থ ছাড়ের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রত্যাশী সরকারি সংস্থা ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়ার সময় জেলা প্রশাসকের চাহিদার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে প্রত্যয়ন দিতে হবে যে, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রয়েছে।

এরপর জেলা প্রশাসন থেকে প্রাথমিক প্রাক্কলন পাওয়ার পর দ্রুত অর্থ ছাড় করার কথা বলা হয়েছে।

এতে ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় অর্থের সংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কমানোর পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক প্রাক্কলনের ভিত্তিতে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সংশোধন?

সরকার চলতি অর্থবছরে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর অংশ হিসেবে নতুন ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এসব বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একই সময়ে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের গতি নিয়েও চাপ রয়েছে। আইএমইডির তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা দুই মাসের হিসাবে সর্বনিম্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২১ সেপ্টেম্বরের সংশোধিত নির্দেশনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে একদিকে ব্যয়সংকোচনের মূল নীতি বহাল রাখা হয়েছে, অন্যদিকে বাস্তবে প্রয়োজনীয় ও অগ্রসর প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।

৭০ শতাংশ কাজ শেষ হলে কী হবে?

নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ৭০ শতাংশ অগ্রগতি

কোনো চলমান ভবন নির্মাণকাজ যদি অন্তত ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে অবশিষ্ট কাজের ব্যয় নির্বাহ করতে পারবে।

এর ফলে মাঝপথে আটকে থাকা নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে ৭০ শতাংশের কম অগ্রগতি থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ছাড় হবে—এমন কথা পরিপত্রে বলা হয়নি। একইভাবে ৭০ শতাংশ অগ্রগতি থাকলেও অর্থ বিভাগের অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

জরুরি স্থাপনায় কেস-টু-কেস অনুমোদন

শুধু ৭০ শতাংশ সম্পন্ন প্রকল্পই নয়, জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।

কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নতুন স্থাপনা নির্মাণ জরুরি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার যথাযথ যৌক্তিকতা উপস্থাপন করতে হবে। এরপর অর্থ বিভাগ বিষয়টি কেস-টু-কেস ভিত্তিতে বিবেচনা করে অনুমোদন দিলে ব্যয় নির্বাহ করা যাবে।

অর্থাৎ, এটি সাধারণভাবে নতুন নির্মাণকাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয়; বরং বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অনুমোদন পাওয়ার একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

ভূমি অধিগ্রহণেও দ্রুততার সুযোগ

উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ প্রায়ই প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। নতুন নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে আগে থেকেই অর্থ বরাদ্দ থাকার বিষয়ে প্রত্যয়ন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এরপর জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে প্রাথমিক প্রাক্কলন পাওয়ার পর দ্রুত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রাথমিক প্রাক্কলন ও অর্থ ছাড়ের পর্যায়ে যে সময় লাগতে পারে, তা কমানোর প্রশাসনিক লক্ষ্য প্রতীয়মান হয়।

আগের অন্যান্য ব্যয়সংকোচন বহাল

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—২১ সেপ্টেম্বরের এই পরিপত্রে জুলাইয়ের মূল ব্যয়সংকোচন নির্দেশনার সব শর্ত বাতিল করা হয়নি।

পরিপত্রের শেষাংশে স্পষ্ট করা হয়েছে, ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কতিপয় ব্যয় স্থগিত/হ্রাসকরণসংক্রান্ত মূল পরিপত্রের অন্যান্য ব্যয়সংকোচনমূলক পদক্ষেপগুলো বহাল থাকবে।

অর্থাৎ, নতুন নির্দেশনাটি মূলত নির্দিষ্ট দুটি শর্ত প্রতিস্থাপন করেছে। তাই এটিকে সামগ্রিক ব্যয়সংকোচন নীতি প্রত্যাহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কারা নির্দেশনাটি পেয়েছেন?

পরিপত্রটি অগ্রাধিকারক্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব/সিনিয়র সচিব, সামরিক সচিব, হিসাব মহানিয়ন্ত্রক, রেজিস্ট্রার জেনারেল, জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নির্দেশনাটি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বাজেট বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য প্রশাসনিক নির্দেশনা হিসেবে জারি করা হয়েছে।

কী পরিবর্তন হলো—সহজ ভাষায়

বিষয়আগের কড়াকড়িনতুন সংশোধিত ব্যবস্থা
নতুন ভবন নির্মাণসাধারণভাবে স্থগিতনির্দিষ্ট ব্যতিক্রমে অনুমোদনের সুযোগ
চলমান ভবন নির্মাণব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ৭০% বা তার বেশি কাজ শেষ হলে অর্থ বিভাগের অনুমোদনে ব্যয়
জরুরি স্থাপনাসাধারণ বিধিনিষেধযৌক্তিকতা সাপেক্ষে কেস-টু-কেস অনুমোদন
ভূমি অধিগ্রহণব্যয় ছাড়ে নিয়ন্ত্রণবরাদ্দের প্রত্যয়ন ও প্রাথমিক প্রাক্কলনের পর দ্রুত অর্থ ছাড়
অন্যান্য ব্যয়সংকোচনবহালবহাল

সার্বিক চিত্র

২১ সেপ্টেম্বরের পরিপত্রে সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মূল কাঠামো বজায় রেখেই বাস্তবায়নযোগ্য ও জরুরি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা আনা হয়েছে। বিশেষ করে ৭০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হওয়া চলমান নির্মাণকাজ এবং ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সংশোধিত নির্দেশনা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থা এখন থেকে ইচ্ছামতো নতুন ভবন নির্মাণ বা ভূমি অধিগ্রহণে অর্থ ব্যয় করতে পারবে—পরিপত্রটি এমন অনুমতি দেয়নি। বরং নির্ধারিত শর্ত, অর্থ বিভাগের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যয় করতে হবে।

অর্থাৎ, ২১ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্তটি মূলত ব্যয়সংকোচন তুলে নেওয়া নয়; বরং বাস্তব পরিস্থিতিতে আটকে থাকা ও জরুরি সরকারি কাজ এগিয়ে নিতে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত ছাড় দেওয়ার একটি সংশোধিত ব্যবস্থা।

সরকারি উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটে ব্যয়সংকোচনের শর্ত শিথিল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *