নবম পে-স্কেলে পে ফিক্সেশন: iBAS++-এ যেভাবে নির্ধারিত হবে নতুন বেতন
নবম জাতীয় বেতনস্কেল বাস্তবায়নের পর এবার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে উঠেছে নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন। নতুন কাঠামোয় কার মূল বেতন কত হবে, কোন ধাপে বেতন নির্ধারিত হবে এবং পূর্বের চাকরির বেতন-ইতিহাস কীভাবে সমন্বয় হবে—এসব বিষয় এখন iBAS++-এর অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারি হওয়া ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এ নতুন বেতন নির্ধারণের অনলাইন প্রক্রিয়ার ভিত্তি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মচারী নিজে iBAS++-এ প্রয়োজনীয় তথ্য দেবেন; এরপর সংশ্লিষ্ট ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (DDO) এবং হিসাবরক্ষণ অফিস তথ্য যাচাই ও অনুমোদন করবে।
পে ফিক্সেশন কেন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর শুধু নতুন গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন জানা যথেষ্ট নয়। একজন কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মূল বেতন, ১ জুলাই প্রাপ্য নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, বর্তমান গ্রেড, পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের তথ্য বিবেচনায় আসতে পারে।
ফলে একই গ্রেডে থাকা দুই কর্মচারীর পূর্ববর্তী বেতন-ইতিহাস ভিন্ন হলে নতুন পে-স্কেলেও তাঁদের নির্ধারিত মূল বেতন একই নাও হতে পারে। নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরোনো বেতন-ধাপ ও নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপের মধ্যে সমন্বয় করাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায় দেখা যাচ্ছে, পুরোনো স্কেলের সর্বনিম্ন বা প্রারম্ভিক ধাপে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে হিসাব তুলনামূলকভাবে সহজ। অন্যদিকে স্কেলের মাঝামাঝি বা ওপরের ধাপে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বেতন ও নতুন স্কেলের ধাপের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
পুরো প্রক্রিয়া হবে অনলাইনে
নতুন পে-স্কেলে পে ফিক্সেশনের জন্য iBAS++-এর নির্ধারিত ‘Pay Fixation’ অপশন ব্যবহার করতে হবে। গেজেটেড কর্মকর্তারা iBAS++-এর ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
লগইনের সময় iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে OTP পাঠানো হবে। বিদেশে অবস্থানরত কর্মচারীদের জন্য নিবন্ধিত ই-মেইলে OTP পাওয়ার ব্যবস্থার কথাও নির্দেশনায় রয়েছে।
আবেদন করার আগে যেসব তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে
পে ফিক্সেশন শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী এর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য;
- iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর;
- নিয়োগসংক্রান্ত অফিস আদেশ;
- বদলি বা পদায়নসংক্রান্ত আদেশ;
- টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের আদেশ, যদি প্রযোজ্য হয়;
- উচ্চতর গ্রেডসংক্রান্ত আদেশ;
- পূর্ববর্তী বেতন পুনর্নির্ধারণের আদেশ;
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র ও শিক্ষাগত সনদের কপি;
- ১ জুলাই ২০১৫ তারিখের বেতন নির্ধারণের Verification Number;
- অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত নথি।
এসব নথির সফট কপি প্রস্তুত রাখার কথাও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য দেওয়ার পরই দেখা যাবে নতুন মূল বেতন
iBAS++-এর পে ফিক্সেশন অপশনে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করার পর আবেদন জমা দেওয়ার আগেই সিস্টেমে নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের পরিমাণ প্রদর্শিত হবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সিস্টেমে প্রদর্শিত বেতন দেখেই তাড়াহুড়ো করে আবেদন জমা না দিয়ে কর্মচারীর পূর্ববর্তী বেতন, ইনক্রিমেন্ট, গ্রেড ও সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা।
কারণ ব্যক্তিগত তথ্য বা চাকরির রেকর্ডে ভুল থাকলে পরবর্তী সময়ে পে ফিক্সেশন সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। এনআইডি, জন্মতারিখ ও iBAS++-এর তথ্যের মধ্যে অমিল থাকলেও প্রক্রিয়াটি আটকে যেতে পারে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর কী হবে
কর্মচারী তথ্য পূরণ করে আবেদন জমা দিলে সেটি সংশ্লিষ্ট DDO-এর কাছে যাবে।
DDO আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য যাচাই করবেন। বিশেষ করে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বইয়ে থাকা পূর্ববর্তী চাকরি, বেতন এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে অনলাইন আবেদনের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস অনলাইনে তথ্য যাচাই করে বেতন নির্ধারণের বিবরণী অনুমোদন ও প্রতিপাদন করবে।
Verification Number হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ
হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদনের পর সিস্টেম থেকে একটি Verification Number তৈরি হবে। এই নম্বরটি নতুন পে ফিক্সেশনের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
পরবর্তী সময়ে Verification Number এবং নতুন নির্ধারিত বেতন সার্ভিস বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেখানে প্রয়োজনীয় ম্যানুয়াল স্বাক্ষর করবেন।
অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলে আবেদন ও তথ্য জমা দেওয়ার প্রধান কাজ অনলাইনে হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল স্বয়ংক্রিয় নয়। কর্মচারীর তথ্যের চূড়ান্ত যাচাই ও অনুমোদনে সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের ভূমিকা থাকবে।
পুরোনো Pay Fixation ওয়েবসাইট নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
আগের payfixation.gov.bd ঠিকানা দিয়ে প্রবেশ করলেও ব্যবহারকারীকে iBAS++-এর পে ফিক্সেশন অপশনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পুরোনো ও নতুন ব্যবস্থার মধ্যে ব্যবহারকারীর প্রবেশপথ নিয়ে বিভ্রান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভুল তথ্য দিলে কোথায় সমস্যা হতে পারে
নতুন পে-স্কেলে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে—
এনআইডি নম্বর → জন্মতারিখ → নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর → চাকরিতে যোগদানের তথ্য → পূর্ববর্তী বেতন → ইনক্রিমেন্ট → গ্রেড → উচ্চতর গ্রেড/পদোন্নতি → পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশন
এসব তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে যাচাইয়ের সময় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
চাকরির রেকর্ড ও এনআইডির জন্মতারিখে অমিল থাকলে পে ফিক্সেশনের আগে তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। যাদের এনআইডি নেই, তাঁদেরও প্রয়োজনীয় এনআইডি নিবন্ধন সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মচারীর করণীয়
নতুন পে-স্কেলে পে ফিক্সেশন করার সময় কর্মচারীদের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মূল বেতন এবং ১ জুলাইয়ের প্রাপ্য নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আগে কোনো পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা পুনঃনির্ধারণ হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ প্রস্তুত রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, iBAS++-এ প্রদর্শিত নতুন বেতন নিজের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চতুর্থত, আবেদন জমা দেওয়ার পর DDO বা হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
জুলাই থেকে কার্যকর—কিন্তু বেতন পাওয়ার সঙ্গে পে ফিক্সেশনের সম্পর্ক রয়েছে
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও বাস্তবে নতুন বেতন প্রদানের জন্য প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন নতুন কাঠামোয় নির্ধারণ বা ফিক্সেশন সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের বেতন পুরোনো কাঠামো অনুযায়ী পরিশোধ করা হতে পারে এবং পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন কাঠামোর প্রাপ্য অর্থ সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসছে।
অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং নতুন হারে বেতন হাতে পাওয়ার তারিখ একই বিষয় নয়। বেতন নির্ধারণ, যাচাই, অনুমোদন এবং পরবর্তী payroll প্রক্রিয়ার ওপর বাস্তব অর্থপ্রদানের সময় নির্ভর করবে।
শেষ কথা
নবম জাতীয় বেতনস্কেলের বাস্তব সুবিধা কর্মচারীদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে iBAS++ পে ফিক্সেশন এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পুরো প্রক্রিয়াকে অনলাইনে নেওয়ার ফলে আবেদন, যাচাই ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। তবে একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য, চাকরির ইতিহাস ও পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য সঠিক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই পে ফিক্সেশন চালুর পর তাড়াহুড়ো না করে প্রথমে নিজের এনআইডি, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর, গ্রেড, ৩০ জুনের মূল বেতন, ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট, পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশন এবং প্রযোজ্য সব অফিস আদেশ মিলিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।
নতুন বেতন সিস্টেমে কর্মচারীর চূড়ান্ত বেতন শুধু বর্তমান গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপের ওপর নির্ভর করবে না; বরং সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী পূর্ববর্তী বেতন ও চাকরির রেকর্ডের তথ্যও পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



