নবম পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময়সীমা শেষ, অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার অপেক্ষায় সরকারি চাকরিজীবীরা
নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন নির্ধারণ, আগের বেতনের সঙ্গে পার্থক্য হিসাব এবং প্রাপ্য বকেয়া অর্থের পরিমাণ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে কার্যক্রমের অগ্রগতি, তথ্য যাচাই এবং বেতন নির্ধারণের অবস্থা একরকম নাও হতে পারে।
প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের পর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বকেয়া অর্থ অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ, বকেয়া অর্থের হিসাব এবং অক্টোবরের বেতন পরিশোধ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয় পে-ফিকেশন কার্যক্রম
নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের জন্য গত ৫ অক্টোবর থেকে আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++) ব্যবস্থায় কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদ্যমান বেতনসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণ করা হচ্ছে।
পে-ফিকেশন কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মচারীর প্রাপ্য মূল বেতন নির্ধারণ করা এবং আগের বেতন ও নতুন বেতনের মধ্যে পার্থক্য হিসাব করা। একই সঙ্গে কোন সময় থেকে নতুন বেতন কার্যকর হবে, কত টাকা বকেয়া পাওনা তৈরি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারী কত টাকা পাবেন—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পে-ফিকেশনের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়া মানেই সব কর্মচারীর বেতন নির্ধারণ, যাচাই ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণী বিবরণীর অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করতে পারে।
অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার প্রত্যাশা
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের বকেয়া অর্থ অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ হিসাবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা অক্টোবরের নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি আগের তিন মাসের প্রাপ্য বেতন-ভাতার সমন্বিত অর্থ পেতে পারেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিন মাসের বকেয়া অর্থের পরিমাণ সবার জন্য সমান হবে না। প্রত্যেক কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, নতুন স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতন, প্রযোজ্য ভাতা, চাকরির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
এ ছাড়া নতুন মূল বেতন এবং বকেয়া ভাতা একই বিষয় নয়। মূল বেতনের পার্থক্য, প্রাপ্য ভাতার পরিবর্তন এবং অন্যান্য সমন্বয় প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করতে হবে। তাই কারও বকেয়া কত টাকা হবে, তা নিশ্চিতভাবে জানতে ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণী বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
iBAS++-এ বেতন নির্ধারণের আগে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
আইবাস প্লাস প্লাসের পাইলটিং কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫ অনুযায়ী জুন ২০২৬ মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতার তথ্য সাবমিট না করা পর্যন্ত জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা যাবে না।
এ নির্দেশনার তাৎপর্য হলো, নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর আগের বেতনসংক্রান্ত তথ্য এবং পরবর্তী মাসগুলোর বেতন-ভাতার তথ্য ব্যবস্থায় সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন। পুরোনো বেতন হিসাবের সঙ্গে নতুন বেতন নির্ধারণের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা না গেলে পে-ফিকেশন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, হিসাবরক্ষণ কার্যালয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিডিওর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মচারীর পে-ফিকেশন সম্পন্ন না হলে প্রথমেই তাঁর বেতনসংক্রান্ত তথ্য, মাসভিত্তিক বেতন-ভাতার সাবমিশন এবং সিস্টেমে প্রদর্শিত অবস্থা যাচাই করা উচিত।
প্রতিরক্ষা ও জুডিশিয়াল সার্ভিসে প্রক্রিয়া এখনো চলমান
প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা ও জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। অর্থাৎ, এসব সার্ভিসের কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন সার্ভিস ও প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো, বেতন ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই একটি দপ্তরের পে-ফিকেশন কার্যক্রমের সময়সূচিকে সব দপ্তরের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
পে-ফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে কি না, যেভাবে বুঝবেন
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য শুধু নির্ধারিত সময়সীমার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের বেতন নির্ধারণী তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
১. জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫ অনুযায়ী জুন ২০২৬ মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলনের তথ্য সঠিক আছে কি না।
২. জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতার তথ্য আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থায় সাবমিট হয়েছে কি না।
৩. নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন নির্ধারণের তথ্য সিস্টেমে পাওয়া যাচ্ছে কি না।
৪. বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে কোনো ভুল, অসম্পূর্ণ তথ্য বা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে কি না।
৫. বেতন নির্ধারণী বিবরণী অনুমোদন বা পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে কি না।
কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট অফিসের হিসাব শাখা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিডিও অথবা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
কর্মচারীদের জন্য সতর্কতা
পে-ফিকেশন ও বকেয়া অর্থ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সব তথ্যকে চূড়ান্ত সরকারি নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট তারিখে সবার বকেয়া অর্থ জমা হবে, নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন পাওয়া যাবে অথবা সব দপ্তরের কার্যক্রম একই দিনে শেষ হয়েছে—এ ধরনের দাবি সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ বা নির্ভরযোগ্য দাপ্তরিক তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
এখানে উল্লেখিত অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া পরিশোধের বিষয়টি প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যাশিত সময়সূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থ পরিশোধের চূড়ান্ত তারিখ, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং কোনো পরিবর্তিত নির্দেশনা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অর্থ বিভাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী পে-ফিকেশন কার্যক্রম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ এবং বকেয়া পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর এখন কর্মচারীদের প্রধান আগ্রহ অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের বকেয়া অর্থ পাওয়া এবং ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণী বিবরণী সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে।
তবে সময়সীমা শেষ হওয়া, পে-ফিকেশন সম্পন্ন হওয়া এবং বকেয়া অর্থ হাতে পাওয়া—এই তিনটি পৃথক ধাপ। তাই কর্মচারীদের নিজ নিজ বেতন নির্ধারণের অবস্থা যাচাই করার পাশাপাশি অর্থ বিভাগের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। এতে ভুল তথ্যের কারণে বিভ্রান্তি কমবে এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে।


