রাজস্ব ঘাটতি ও ভর্তুকির চাপ ২০২৬ । অনিশ্চয়তার মুখে সরকারি চাকুরিজীবীদের নবম পে-স্কেল
দেশে চলমান জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম পে-স্কেল’ বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিশাল অংকের বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে।
ভর্তুকির চাপে হারিয়েছে পে-স্কেলের বরাদ্দ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের একটি খসড়া পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির (বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড) ব্যয় মেটাতে গিয়ে এই তহবিলের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে গেছে।
বর্তমানে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে:
জ্বালানি নিরাপত্তা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে বড় অংকের ভর্তুকি প্রদান।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় রাখতে টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ।
দারিদ্র্য বিমোচন: কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী শক্তিশালী করা।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
২০২৪ সালে গঠিত বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের সুপারিশ জমা দিলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিবর্তনের পর সেই ফাইলটিতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অর্থ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, একসঙ্গে পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব।
বিকল্প হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে (Phased Implementation) নতুন স্কেল বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। এর ফলে বাজেটের ওপর এককালীন বিশাল চাপ কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশাসনে বাড়ছে ক্ষোভ ও অস্থিরতা
২০১৫ সালে সর্বশেষ অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণার পর দীর্ঘ ১১ বছর পার হয়ে গেলেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি। বর্তমানে প্রায় ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে এই ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি।
প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে:
“দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ায় এবং বাজারের আগুনের উত্তাপে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান সংকুচিত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আমলাতন্ত্র ও মাঠ প্রশাসনে কর্মস্পৃহা কমে যেতে পারে এবং অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।”
আসন্ন বাজেটের দিকেই সবার নজর
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের জন্য কোনো বিশেষ বরাদ্দ বা মহার্ঘ ভাতার ঘোষণা আসে কি না, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে থাকায় এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ থাকায় বড় কোনো ঘোষণা আসা কঠিন হতে পারে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি:
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার কীভাবে এই বিশাল সংখ্যক জনবলের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে দ্রুত একটি সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছানো জরুরি।


