নতুন ভর্তি নীতিমালার ঘোষণা ২০২৬ । ২০২৭ সাল থেকে স্কুলে লটারি প্রথা বাতিল জয় হবে মেধার?
দেশের সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলে আসা ‘লটারি’ পদ্ধতির অবসান হতে যাচ্ছে। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি প্রক্রিয়া বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির মূল বিষয়সমূহ:
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক-১ শাখা থেকে জারি করা ওই পত্রে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে সারাদেশে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হলেও আগামী ২০২৭ সাল থেকে এই প্রক্রিয়া আর কার্যকর থাকবে না। পরিবর্তে অংশীজনদের (শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি) মতামতের ভিত্তিতে নতুন কোনো কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
লটারি বাতিল: ২০২৭ সাল থেকে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারি পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করা হবে।
পূর্ববর্তী নীতিমালা বাতিল: গত ১৩ নভেম্বর ২০২৫ এবং ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারিকৃত শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা দুটি বর্তমান নির্দেশনার মাধ্যমে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
নতুন পদ্ধতি: ভর্তির নতুন প্রক্রিয়া কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন এই পরিবর্তন?
বিগত কয়েক বছর ধরে লটারি পদ্ধতিতে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ আসছিল। অনেক ক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ধারণা করছে, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন কোনো পদ্ধতি (যেমন: ভর্তি পরীক্ষা বা ভিন্ন কোনো নিয়ম) চালু করলে শিক্ষার মান ও মেধার মূল্যায়ন আরও সুসংহত হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপ-সচিব মুন্না রানী বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এই আদেশটি ইতোমধ্যেই কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কোচিং বানিজ্য কি আবার শুরু হবে?
লটারি প্রথা বাতিল করে মেধা যাচাই বা নতুন কোনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তে কোচিং বাণিজ্য পুনরায় চাঙ্গা হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা যেতে পারে:
কোচিং বাণিজ্য বাড়ার সম্ভাবনা কেন?
ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাবনা: যদি লটারির পরিবর্তে পুনরায় ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হয়, তবে নামি-দামি স্কুলগুলোতে চান্স পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অভিভাবকরা আবারও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।
গাইড বই ও শিট: লটারি প্রথায় মুখস্থ বিদ্যার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরলে বিভিন্ন পাবলিকেশন এবং কোচিং সেন্টারগুলো নতুন করে ‘ভর্তি সহায়িকা’ বা ‘শিট’ বাণিজ্যে মেতে উঠতে পারে।
মানসিক চাপ: ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য শিশুদের ওপর যে বাড়তি পড়াশোনার চাপ তৈরি হয়, সেটিই মূলত কোচিং সেন্টারের ব্যবসার প্রধান রসদ।
সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা
তবে কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু কঠোর পদক্ষেপও থাকতে পারে: ১. সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা: প্রতিটি স্কুল আলাদা পরীক্ষা না নিয়ে যদি ক্লাস্টার বা জেলাভিত্তিক একটি মাত্র সমন্বিত পরীক্ষা নেয়, তবে কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমতে পারে। ২. নীতিমালা সংশোধন: সরকার ইতিমধ্যে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর নীতিমালা করেছে। ভর্তি পরীক্ষা ফিরলেও সেই নীতিমালা প্রয়োগ করে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কোচিং বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হতে পারে। ৩. অংশীজনদের মতামত: বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে “অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে” সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা এমন কোনো পদ্ধতির প্রস্তাব দেন যেখানে কোচিংয়ের প্রয়োজন পড়বে না, তবে এই আশঙ্কা কিছুটা কমবে।
সারসংক্ষেপ: পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে কোচিং সেন্টারের তৎপরতা বাড়ার ঝুঁকি প্রবল। তবে সরকার যদি লটারির বিকল্প হিসেবে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক মেধা যাচাই পদ্ধতি (যেমন: সিজিপিএ বা ধারাবাহিক মূল্যায়ন) বেছে নেয় যেখানে অতিরিক্ত কোচিংয়ের প্রয়োজন নেই, তবেই এই বাণিজ্য রোখা সম্ভব হবে।



