পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

শতভাগ পেনশন নেওয়া অবসরপ্রাপ্তরা নতুন পে-স্কেলে কী পাবেন, ১৫ বছর পর কী হবে—জেনে নিন

শতভাগ পেনশন এককালীন গ্রহণ করে অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘিরে আবারও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা অবসরের সময় শতভাগ পেনশন সমর্পণ করে এককালীন আনুতোষিকের টাকা গ্রহণ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে এবং ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পেনশন পুনঃস্থাপনের নিয়ম কী—তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে।

সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী সরকারি কর্মচারী অবসরের তারিখ থেকে ১৫ বছর অতিক্রম করার পর মাসিক পেনশনের সুবিধা ফিরে পান। এটিই ‘পুনঃস্থাপিত পেনশন’ হিসেবে পরিচিত।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি যদি অবসর গ্রহণের পর ১২ বছর পার করে থাকেন, তাহলে তাঁর পেনশন পুনঃস্থাপনের জন্য আরও ৩ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ১৫ বছর পূর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পেনশন পুনঃস্থাপনের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

১২ বছর আগে অবসর নিলে এখন কী সুবিধা?

শতভাগ পেনশন সমর্পণ করার কারণে বর্তমানে তাঁর হাতে নিয়মিত মাসিক পেনশন না থাকলেও নতুন পে-স্কেল বা সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জন্য যেসব সুবিধা প্রযোজ্য করা হয়, সেগুলো আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে।

অর্থাৎ ফাইনাল সেটেলমেন্টের টাকা আগে নিয়ে ফেলেছেন বলেই নতুন পে-স্কেলের সব সুবিধা থেকে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যাবেন—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের FAQ-তেও শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জন্য উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতার বিষয়ে পৃথক বিধানের উল্লেখ রয়েছে।

বর্তমান ২০২৬ সালের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত সরকারি আদেশও অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। Ministry of Finance

১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কী হবে?

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোতে ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে নতুন হারে চিকিৎসা ভাতা, বৈশাখী/নববর্ষ ভাতা এবং উৎসব ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কোন সুবিধা কত টাকা এবং কোন শ্রেণির পেনশনারের ক্ষেত্রে কীভাবে কার্যকর হবে, তা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন/পরিপত্রের ভাষা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

তাই সংবাদ বা ব্যক্তিগত হিসাবের ক্ষেত্রে অনুমানভিত্তিক অঙ্ক না ধরে সরকারি আদেশের নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করাই নিরাপদ।

১৫ বছর পূর্ণ হলে কি আগের পেনশন আবার পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ—শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলে মাসিক পেনশন পুনঃস্থাপনের বিধান রয়েছে। সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষ সরাসরি বলেছে, অবসরগ্রহণের তারিখ থেকে ১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর মাসিক পেনশনের সুবিধা পাওয়াকেই পুনঃস্থাপিত পেনশন বলা হয়।

সুতরাং উদাহরণ হিসেবে—

  • অবসর গ্রহণ: ১ জানুয়ারি ২০১৪
  • ১০০% পেনশন সমর্পণ: অবসরের সময়
  • ১২ বছর পূর্ণ: ১ জানুয়ারি ২০২৬
  • ১৫ বছর পূর্ণ: ১ জানুয়ারি ২০২৯
  • এরপর: বিধি অনুযায়ী পেনশন পুনঃস্থাপনের কার্যক্রম

অবশ্য প্রকৃত তারিখ নির্ধারণে অবসর ও পেনশন সমর্পণের সরকারি নথির তারিখ দেখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি মারা গেলে স্ত্রী কি পেনশন পাবেন?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ায়।

সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের FAQ-এর ২২ নম্বর প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট বলা হয়েছে—শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী ব্যক্তি পুনঃস্থাপিত পেনশন পাওয়ার আগে মারা গেলে ১৫ বছর পূর্তির পর তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারীরা পুনঃস্থাপিত পেনশনের সুবিধা পাবেন না।

অর্থাৎ, শুধু এই কারণে যে অবসরের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল, মৃত্যুর পর স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত ব্যক্তির পুনঃস্থাপিত মাসিক পেনশন পেয়ে যাবেন—এমন নিয়ম নেই।

তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।

সরকারি FAQ-এর ২৩ নম্বর প্রশ্ন অনুযায়ী, শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী ব্যক্তি পুনঃস্থাপিত পেনশন পাওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারীরা ‘সমর্পিত পারিবারিক পেনশন সুবিধা’ পেতে পারেন। এর মধ্যে মাসিক পেনশন ছাড়া প্রযোজ্য অন্যান্য ভাতা—যেমন উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও নববর্ষ ভাতা—অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

কিন্তু যদি ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পেনশন পুনঃস্থাপন হয়ে যায়?

তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন।

১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি পেনশন পুনঃস্থাপনের কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিয়মিত পুনঃস্থাপিত পেনশনভোগী হিসেবে পেনশন গ্রহণ করতে থাকেন, তাঁর মৃত্যুর পর যোগ্য স্ত্রী/স্বামী বা অন্যান্য বৈধ উত্তরাধিকারীর পারিবারিক পেনশনের বিষয়টি তখন প্রচলিত পারিবারিক পেনশন বিধি অনুযায়ী বিবেচিত হবে।

অর্থাৎ, ‘পুনঃস্থাপিত পেনশনভোগী’ হয়ে যাওয়ার পর মৃত্যু এবং পুনঃস্থাপনের আগেই মৃত্যু—এই দুই পরিস্থিতিকে এক করে দেখা যাবে না।

সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টি

পরিস্থিতিকী হবে
অবসরের সময় ১০০% পেনশন সমর্পণএককালীন আনুতোষিক গ্রহণ করা যায়
১৫ বছর পূর্ণ হয়নিনিজের মাসিক পুনঃস্থাপিত পেনশন শুরু হয়নি
১৫ বছর পূর্ণ হয়েছেবিধি অনুযায়ী পেনশন পুনঃস্থাপনের সুযোগ
১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যুউত্তরাধিকারী পুনঃস্থাপিত মাসিক পেনশন দাবি করতে পারবেন না
১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যুযোগ্য পরিবার সমর্পিত পারিবারিক পেনশনের অন্যান্য সুবিধা পেতে পারে
১৫ বছর পূর্ণ হয়ে পেনশন পুনঃস্থাপিত হওয়ার পর মৃত্যুতখন পারিবারিক পেনশনের প্রচলিত বিধি প্রযোজ্য হবে

সরকারি পেনশন দপ্তরের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ‘চলমান পেনশন (পুনঃস্থাপিত)’ এবং ‘পারিবারিক পেনশন (পুনঃস্থাপিত)’—দুই ধরনের পৃথক ফরমও রাখা হয়েছে, যা পুনঃস্থাপিত পেনশন ও পরবর্তী পারিবারিক পেনশনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অস্তিত্ব নিশ্চিত করে। Pension Board

তাই আপনার আব্বুর ক্ষেত্রে মূল কথা

আপনার আব্বু যদি ১২ বছর আগে অবসর নিয়ে অবসরের সময় শতভাগ পেনশন সমর্পণ করে এককালীন টাকা সম্পূর্ণ গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবসরের সঠিক তারিখ।

যদি তিনি আরও তিন বছর জীবিত থাকেন এবং ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পেনশন পুনঃস্থাপনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন, তাহলে তিনি পুনঃস্থাপিত মাসিক পেনশনের আওতায় আসবেন। এরপর তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত প্রযোজ্য নিয়মে পেনশন পাবেন।

কিন্তু ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি মারা গেলে তাঁর স্ত্রী ১৫ বছর পূর্তির পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর ‘পুনঃস্থাপিত মাসিক পেনশন’ পাবেন না—এটি সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের FAQ-তে স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্যান্য প্রযোজ্য পারিবারিক পেনশন/ভাতার সুবিধা পাওয়ার বিধান থাকতে পারে।

সুতরাং “শতভাগ পেনশন নিয়েছেন, তাই মারা গেলে স্ত্রী কিছুই পাবেন না”—এ কথাটিও পুরোপুরি সঠিক নয়; আবার “১৫ বছর পূর্ণ হলেই স্ত্রী পুনঃস্থাপিত মাসিক পেনশন পাবেন”—এটিও সঠিক নয়। কোন সুবিধা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে মৃত্যুর সময় তিনি পুনঃস্থাপিত পেনশনার ছিলেন কি না এবং তাঁর স্ত্রী/উত্তরাধিকারী পারিবারিক পেনশনের যোগ্য কি না—এসবের ওপর।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *