স্বামী-স্ত্রী সরকারি চাকুরিজীবী হলে একই কর্মস্থলে পদায়ন: মানবিক ও প্রশাসনিক দাবি বিবেচনা করাই বড় ব্যাপার?
সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত দম্পতিদের একই জেলা বা কাছাকাছি কর্মস্থলে পদায়ন করার দীর্ঘদিনের যে দাবি, তার স্বপক্ষে প্রশাসনিক জোরালো নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত (স্মারক নং- ০৪.০০.০০০০.৫১৩.১৭.১৮৮.২০১৫-২৬৩) একটি পরিপত্র পুনরায় আলোচনায় এসেছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রীকে একই কর্মস্থলে রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিপত্রের মূল বক্তব্য
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সংস্থাপন অধিশাখা থেকে জারিকৃত ওই পরিপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে সপরিবারে অবস্থান নিশ্চিত করা দাপ্তরিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আবশ্যক। বিশেষ করে জেলা প্রশাসক বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, জীবনসঙ্গী অন্য জেলায় কর্মরত থাকলে তারা সপরিবারে কর্মস্থলে থাকতে পারেন না। এতে করে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং কর্মক্ষেত্রে একাগ্রতা ব্যাহত হয়।
পরিপত্রের ০৪ ও ০৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
“স্বামী-স্ত্রীকে যথাসম্ভব একই কিংবা নিকটবর্তী কর্মস্থলে পদায়ন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি। কোনো কর্মকর্তা/কর্মচারীর স্ত্রী বা স্বামী সরকারি চাকুরিজীবী হলে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বা নিকটবর্তী স্থানে পদায়নের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”
কেন এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না?
সরকারি নীতিমালায় বিষয়টি “মানবিক” ও “প্রতিষ্ঠিত রীতি” হিসেবে গণ্য করা হলেও মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় এর সুফল পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী অনেক চাকুরিজীবীর অভিযোগ, কোনো জোরালো সুপারিশ বা ‘তদবির’ না থাকলে শুধু এই পরিপত্র দেখিয়ে বদলি বা পদায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেকেই মনে করেন, একটি সংসার বা সুন্দর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনিক এই ছাড়টুকু দেওয়া কেবল আইনি দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি বড় মানবিক কাজ। পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকলে মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মানবিক সভ্যতার মাপকাঠি
একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে কর্মস্থলে শতভাগ মননিবেশ করার জন্য স্থিতিশীল পারিবারিক জীবন অপরিহার্য। এই পরিপত্রের মূল স্পিরিট হলো—যাঁদের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে, তারা যেন বিষয়টি কেবল নথিপত্র হিসেবে না দেখে একজন মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের নিরাপত্তা হিসেবে দেখেন। যদি এই নূন্যতম মানবিক গুণটুকু কর্মকর্তাদের মধ্যে ‘অবশিষ্ট’ না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
উপসংহার
সরকারি চাকরিতে বদলি বা পদায়ন একটি রুটিন প্রক্রিয়া হলেও স্বামী-স্ত্রীর একত্রে থাকার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখা উচিত। রাষ্ট্রের উচিত বিদ্যমান নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে তদবির নির্ভরতা কমিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও মানবিক প্রশাসন গড়ে তোলা।
সহায়ক তথ্য: আপনি যে পরিপত্রটি যুক্ত করেছেন সেটি ০৬ মার্চ ২০১৬ তারিখে জারিকৃত। এটি বর্তমানেও কার্যকর এবং যেকোনো সরকারি চাকুরিজীবী দম্পতি এই পরিপত্রের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার আইনগত অধিকার রাখেন।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ই সরকারি চাকুরিজীবী হলে তাদের একই জেলা বা নিকটবর্তী কর্মস্থলে বদলির জন্য একটি আদর্শ আবেদনপত্রের নমুনা নিচে দেওয়া হলো। আপনি আপনার পদবি এবং অফিসের নাম অনুযায়ী এটি পরিবর্তন করে নিতে পারেন।
বদলির আবেদনপত্রের নমুনা
তারিখ: [আজকের তারিখ]
বরাবর, [সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদবি, যেমন: সচিব/মহাপরিচালক/বিভাগীয় প্রধান] [দপ্তরের নাম] [ঠিকানা]
বিষয়: স্বামী-স্ত্রী উভয়ই সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকায় একই কর্মস্থলে/জেলায় বদলির জন্য আবেদন।
মহোদয়, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি [আপনার নাম], আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন [আপনার বর্তমান অফিসের নাম] দপ্তরে [আপনার পদবি] হিসেবে গত [যোগদানের তারিখ] হতে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছি।
আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, আমার স্বামী/স্ত্রী [স্বামী বা স্ত্রীর নাম], বর্তমানে [স্বামী বা স্ত্রীর পদবি] হিসেবে [স্বামী বা স্ত্রীর অফিসের নাম ও জেলার নাম] কর্মরত আছেন। বর্তমানে আমরা দুজন ভিন্ন জেলায় অবস্থান করার কারণে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে [সন্তানদের দেখাশোনা/বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা/বাসা মেইনটেইন] করার ক্ষেত্রে আমি অত্যন্ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, যা অনেক সময় দাপ্তরিক কাজে একাগ্রতা বজায় রাখা কঠিন করে তুলছে।
উল্লেখ্য যে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ০৬ মার্চ ২০১৬ তারিখের ০৪.০০.০০০০.৫১৩.১৭.১৮৮.২০১৫-২৬৩ নম্বর পরিপত্র অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রী উভয়ই সরকারি চাকুরিজীবী হলে তাদের যথাসম্ভব একই কর্মস্থলে বা নিকটবর্তী স্থানে পদায়নের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
এমতাবস্থায়, উক্ত পরিপত্রের আলোকে এবং আমার পারিবারিক সমস্যার কথা বিবেচনা করে আমাকে [কাঙ্ক্ষিত জেলার নাম] জেলার শূন্য পদের বিপরীতে অথবা আপনার বিবেচনাধীন নিকটবর্তী কোনো কর্মস্থলে বদলি করতে আপনার সদয় মর্জি হয়।
অতএব, মহোদয়ের নিকট আকুল প্রার্থনা, মানবিক দিক বিবেচনা করে আমাকে আমার স্বামী/স্ত্রীর বর্তমান কর্মস্থল এলাকায় বদলি করে সপরিবারে বসবাসের সুযোগ দানে আপনার একান্ত মর্জি কামনা করছি।
বিনীত নিবেদক,
[আপনার স্বাক্ষর] [আপনার নাম] [আপনার পদবি ও বর্তমান কর্মস্থল] [আপনার আইডি নম্বর ও মোবাইল নম্বর]
সংযুক্তি: ১. স্বামী/স্ত্রীর নিয়োগপত্র বা বর্তমান কর্মস্থলের প্রত্যয়নপত্র। ২. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট পরিপত্রের কপি।
কিছু প্রয়োজনীয় টিপস:
আবেদনপত্রের সাথে আপনার স্বামী/স্ত্রীর অফিসের একটি প্রত্যয়নপত্র বা আইডি কার্ডের কপি যুক্ত করে দেবেন।
আপনি যে পরিপত্রটির কথা উল্লেখ করেছেন, তার একটি ফটোকপি আবেদনের সাথে জমা দিলে সেটি আরও শক্তিশালী হবে।
আবেদনটি অবশ্যই আপনার বর্তমান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে (Proper Channel) যথাযথভাবে জমা দেবেন।


