৯ম পে-স্কেলে বাড়ি ভাড়া ভাতায় বড় অসামঞ্জস্যের অভিযোগ, পুনর্বিন্যাসের দাবি
প্রস্তাবিত ৯ম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আলোচনা চললেও এবার বাড়ি ভাড়া ভাতার হার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মূল বেতন গ্রেডভেদে বাড়লেও নির্দিষ্ট একটি পর্যায়ে বাড়ি ভাতার হার কমে যাওয়ায় একই সঙ্গে বেতন বাড়লেও মোট প্রাপ্য ভাতার ক্ষেত্রে উল্টো প্রভাব পড়তে পারে—এমন হিসাব সামনে এসেছে।
অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে জাতীয় বেতন কমিশন-সংক্রান্ত কার্যক্রম ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বিষয়ে বিভিন্ন নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে। তবে ব্যবহারকারীর দেওয়া ৯ম পে-স্কেলের বাড়ি ভাড়া ভাতার নির্দিষ্ট হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনের সংশ্লিষ্ট ধারা যাচাই না করে এটিকে চূড়ান্ত সরকারি হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
১৬তম থেকে ১৫তম গ্রেডেই বড় পরিবর্তন
প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী ২০তম থেকে ১৬তম গ্রেড পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া ভাতার হার ধরা হয়েছে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ। সেখানে ১৫তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত হার নেমে এসেছে ৩৫ শতাংশে।
হিসাবটি দাঁড়ায়—
| গ্রেড | প্রস্তাবিত মূল বেতন | বাড়ি ভাড়ার হার | বাড়ি ভাড়া |
|---|---|---|---|
| ২০তম | ২০,০০০ | ৪৫% | ৯,০০০ |
| ১৯তম | ২০,৫০০ | ৪৫% | ৯,২২৫ |
| ১৮তম | ২১,০০০ | ৪৫% | ৯,৪৫০ |
| ১৭তম | ২১,৪০০ | ৪৫% | ৯,৬৩০ |
| ১৬তম | ২১,৯০০ | ৪৫% | ৯,৮৫৫ |
| ১৫তম | ২২,৮০০ | ৩৫% | ৭,৯৮০ |
| ১৪তম | ২৩,৫০০ | ৩৫% | ৮,২২৫ |
| ১৩তম | ২৪,০০০ | ৩৫% | ৮,৪০০ |
| ১২তম | ২৪,৫০০ | ৩৫% | ৮,৫৭৫ |
| ১১তম | ২৫,০০০ | ৩৫% | ৮,৭৫০ |
এই হিসাব অনুযায়ী সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তনটি ১৬তম ও ১৫তম গ্রেডের মধ্যবর্তী পর্যায়ে।
১৬তম গ্রেডে মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ৪৫ শতাংশ হিসাবে বাড়ি ভাড়া দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। কিন্তু ১৫তম গ্রেডে মূল বেতন বেড়ে ২২ হাজার ৮০০ টাকা হলেও ৩৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দাঁড়াচ্ছে ৭ হাজার ৯৮০ টাকা।
অর্থাৎ মূল বেতন ৯০০ টাকা বাড়লেও বাড়ি ভাতা কমছে ১ হাজার ৮৭৫ টাকা।
ফলে শুধু এই দুই উপাদান—মূল বেতন ও বাড়ি ভাড়া—বিবেচনা করলে ১৬তম থেকে ১৫তম গ্রেডে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়ি ভাতার পরিবর্তনের কারণে মোট মাসিক প্রাপ্যে প্রত্যাশার বিপরীত প্রভাব তৈরি হতে পারে।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বেতন কাঠামোয় সাধারণত উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সঙ্গে কর্মচারীর মূল বেতন ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু কোনো ভাতার হার যদি একটি নির্দিষ্ট গ্রেডে হঠাৎ কমে যায়, তাহলে আগের গ্রেড ও পরের গ্রেডের মধ্যে ভাতা-ভিত্তিক ‘উল্টো ব্যবধান’ তৈরি হতে পারে।
প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডের বাড়ি ভাড়া ৯,৮৫৫ টাকা, যেখানে ১৫তম গ্রেডে তা ৭,৯৮০ টাকা। অর্থাৎ উচ্চতর গ্রেডে গিয়ে বাড়ি ভাতা ১,৮৭৫ টাকা কম হওয়ার একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এর ফলে একজন কর্মচারী পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা নতুন বেতন কাঠামোয় গ্রেড পরিবর্তনের পর মোট আর্থিক সুবিধা কীভাবে পরিবর্তিত হবে—সেটি শুধু মূল বেতন দিয়ে বিচার করা সম্ভব হবে না। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, টিফিনসহ অন্যান্য ভাতার কাঠামোকেও একই সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
৪৫ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ—মূল সমস্যা এখানেই
প্রদত্ত তথ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল বেতনের পরিমাণ নয়, বরং বাড়ি ভাড়া ভাতার শতাংশে এক ধাপে ১০ শতাংশীয় পয়েন্টের পরিবর্তন।
১৬তম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১৫তম গ্রেডে ৩৫ শতাংশ ধরা হলে মূল বেতন সামান্য বৃদ্ধি পেলেও বাড়ি ভাতার অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
যদি একই ধরনের শতাংশ কাঠামো রাখা হতো, তাহলে ১৫তম গ্রেডের ২২ হাজার ৮০০ টাকার ওপর ৪৫ শতাংশ হিসাবে বাড়ি ভাড়া হতো ১০ হাজার ২৬০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ১৬তম গ্রেডের ৯ হাজার ৮৫৫ টাকার তুলনায় বাড়ি ভাতাও বাড়ত।
অন্যদিকে ৩৫ শতাংশ প্রয়োগের কারণে তা নেমে দাঁড়াচ্ছে ৭ হাজার ৯৮০ টাকায়। এখানেই অসামঞ্জস্যের মূল জায়গাটি তৈরি হয়েছে।
উচ্চতর গ্রেডে গিয়ে ভাতা কমার প্রশ্ন
সরকারি কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেড একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অগ্রগতি। অর্থ বিভাগের বিদ্যমান নথিতেও টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডপ্রাপ্ত কর্মচারীদের গ্রেড নির্ধারণসংক্রান্ত বিষয় আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।
তাই নতুন বেতন কাঠামোয় যদি উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার পর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাতা আগের গ্রেডের তুলনায় কমে যায়, তাহলে সেটি কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আলাদা করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—শুধু বাড়ি ভাতার অঙ্ক কমেছে বলেই পুরো বেতন কাঠামোতে একজন কর্মচারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে মূল বেতন, অন্যান্য ভাতা, কর্তন, কর এবং সংশ্লিষ্ট সব সুবিধা একসঙ্গে হিসাব করতে হবে।
কী ধরনের সমাধান চাওয়া হচ্ছে?
এ ধরনের অসামঞ্জস্য দূর করতে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
প্রথমত, গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ি ভাতার অঙ্ক যাতে অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সে জন্য হার পুনর্বিবেচনা করা।
দ্বিতীয়ত, ৪৫ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে হঠাৎ নামিয়ে না এনে ধাপে ধাপে হার নির্ধারণ করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করা।
তৃতীয়ত, উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতন বাড়ার পর বাড়ি ভাতাসহ মোট মাসিক আর্থিক সুবিধা আগের গ্রেডের তুলনায় কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে—তার একটি সমন্বিত হিসাব তৈরি করা।
চতুর্থত, প্রয়োজনে এমন একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, যাতে শুধু ভাতার হার পরিবর্তনের কারণে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার পর কোনো কর্মচারীর নির্দিষ্ট ভাতা আগের গ্রেডের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পুনর্বিবেচনার দাবি
৯ম পে-স্কেলকে ঘিরে মূল আলোচনার একটি বড় অংশ হচ্ছে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তব আর্থিক প্রভাব। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ এবং সংশ্লিষ্ট বেতন-ভাতা বিষয়ে সরকারি নথি ও কার্যক্রম প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাড়ি ভাড়া ভাতার হারও এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে এক গ্রেড থেকে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সময় অস্বাভাবিক ভাতা-হ্রাসের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
প্রদত্ত হিসাব যদি চূড়ান্ত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে ১৬তম গ্রেডের ৯,৮৫৫ টাকা বাড়ি ভাতার বিপরীতে ১৫তম গ্রেডে ৭,৯৮০ টাকা হওয়া বিষয়টি বিশেষভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা হলো, নতুন বেতন কাঠামো শুধু মূল বেতন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সব ধরনের ভাতা ও আর্থিক সুবিধার মধ্যেও যৌক্তিক সামঞ্জস্য নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার পর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাতা আগের গ্রেডের তুলনায় কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলে তা বাস্তবায়নের আগে পুনর্বিবেচনা করা হলে কাঠামোটি আরও সুসংগত হতে পারে।
তাই ৯ম পে-স্কেল ২০২৬-এর বাড়ি ভাড়া ভাতার হার চূড়ান্ত/বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গ্রেডভিত্তিক এই ব্যবধান পুনরায় পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হার পুনর্বিন্যাসের দাবি উঠেছে।



