ঈদের আগেই চালু হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ২০২৬ । আট উপজেলায় পাইলটিং বা পরীক্ষামূলক ভাবে শুরু হবে?
সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রতিটি প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু হচ্ছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই দেশের আট বিভাগের আটটি উপজেলায় এই কার্ড বিতরণ ও নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের পাইলটিং শুরু হবে। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে নীতি-নির্ধারণী সভা
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ফ্যামিলি কার্ডের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও কৃষিসহ ১২টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পকে স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী সুবিধাভোগীদের টাকা আত্মসাৎ করতে না পারে।
কার্ডের সুবিধা ও ভাতার পরিমাণ
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- আর্থিক সহায়তা: প্রতিটি ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবার মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা পেতে পারে।
- খাদ্য সহায়তা: কিছু ক্ষেত্রে নগদ টাকার পরিবর্তে বা পাশাপাশি ২৫ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ডাল, তেল ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও সরবরাহ করা হতে পারে।
- অগ্রাধিকার: কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে হতদরিদ্র পরিবার, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং নারী সদস্যদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
১৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি ও ডিজিটাল ডেটাবেজ
ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটিকে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির (মঙ্গলবার) মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্যতম প্রধান কাজ হলো:
- সুবিধাভোগী নির্বাচনের জন্য একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি প্রণয়ন করা।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেজের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করে একটি আধুনিক MIS (Management Information System) তৈরি করা।
- নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কার্ডগুলো পরিবারের নারী সদস্যদের নামে ইস্যু করার বিষয়টি পর্যালোচনা করা।
সরকারের বক্তব্য ও সর্বজনীন লক্ষ্য
সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, এই কার্ড হবে সম্পূর্ণ সর্বজনীন। এখানে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় কোনো বাধা হবে না। অন্যদিকে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “প্রধানমন্ত্রী চান ঈদের আনন্দ যেন সবার ঘরে পৌঁছায়। তাই পাইলট প্রকল্প হিসেবে দ্রুত এই কাজ শুরু হচ্ছে।”
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে বলে সরকার আশা করছে।
ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা ও আবেদন প্রক্রিয়া কি?
সরকার এই কার্ডটিকে ‘সর্বজনীন’ করার ঘোষণা দিলেও প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।
১. আবেদনের প্রাথমিক যোগ্যতা
যাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে:
- নিম্ন আয়ের পরিবার: যাদের মাসিক আয় একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে (প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী ২০-২৫ হাজার টাকার নিচে)।
- হতদরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী: যারা বর্তমানে কোনো স্থায়ী আয়ের উৎসের সাথে যুক্ত নন।
- নারী প্রধান পরিবার: বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা বা যে পরিবারে নারীই একমাত্র উপার্জনক্ষম, তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
- বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি: পরিবারে প্রতিবন্ধী সদস্য থাকলে সেই পরিবার বিশেষ বিবেচনা পাবে।
- কৃষক ও দিনমজুর: ভূমিহীন কৃষক বা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিকরা এই তালিকার শীর্ষে থাকবেন।
২. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (প্রাথমিক তালিকা)
আবেদন প্রক্রিয়াটি যেহেতু ডিজিটাল হবে এবং এনআইডি (NID) সার্ভারের সাথে যুক্ত থাকবে, তাই নিচের তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখা জরুরি:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): পরিবারের প্রধান (বিশেষ করে নারী সদস্য) এবং অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের এনআইডি কার্ডের কপি।
- জন্ম নিবন্ধন সনদ: পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের জন্য।
- মোবাইল নম্বর: সুবিধাভোগীর নামে নিবন্ধিত একটি সচল মোবাইল নম্বর (নগদ, বিকাশ বা রকেটের মাধ্যমে টাকা পাওয়ার জন্য)।
- পরিবার পরিচিতি (Household Data): পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা এবং আয়ের উৎসের তথ্য।
- ছবি: পাসপোর্ট সাইজের ছবি (ডিজিটাল আবেদনের ক্ষেত্রে স্ক্যান কপি)।
৩. আবেদন পদ্ধতি ও নির্বাচন প্রক্রিয়া
সরকার একটি স্বচ্ছ ডেটাবেজ তৈরির জন্য ডিজিটাল এমআইএস (MIS) ব্যবহার করবে। প্রক্রিয়াটি সাধারণত নিম্নরূপ হতে পারে:
- অনলাইন পোর্টাল: সরকারের একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি আবেদন করা যাবে।
- ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC): যারা অনলাইনে দক্ষ নন, তারা ইউনিয়ন পরিষদ বা ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে উদ্যোক্তাদের সহায়তায় আবেদন করতে পারবেন।
- সরেজমিনে যাচাই: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি ট্যাগ অফিসারদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি আবেদনকারীর তথ্য মাঠ পর্যায়ে যাচাই করবেন।
- এনআইডি লিংকিং: ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেজের সাথে এনআইডি লিংক করা হবে, যাতে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা না পান।
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
মন্ত্রিসভা কমিটি আগামী মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপরই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদনের লিংক বা নির্দিষ্ট ফরম প্রকাশ করবে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় থাকা ৮টি উপজেলার বাসিন্দারা সবার আগে আবেদনের সুযোগ পাবেন।



