সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

সরকারি অফিসে হাজিরা নিয়ন্ত্রণ: প্রধান সহকারী বা উচ্চমান সহকারীর ক্ষমতা ও আইনি সীমাবদ্ধতা

সরকারি অফিসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের হাজিরা খাতায় অনুপস্থিতি চিহ্নিত করা বা সরাসরি তদারকি নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, হাজিরা খাতায় লাল কালি টানা বা অনুপস্থিত দেখানোর ক্ষমতা সরাসরি প্রধান সহকারী বা উচ্চমান সহকারীর (UDA) নেই। এটি মূলত শাখা প্রধান বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আইনি এখতিয়ার।

হাজিরা নিয়ন্ত্রণের মূল কর্তৃপক্ষ ও আইনি বিধান

সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং সেক্রেটারিয়েট ইনস্ট্রাকশন ২০২৪ অনুযায়ী, হাজিরা নিয়ন্ত্রণের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে:

  • শাখা প্রধানের দায়িত্ব: প্রতিটি শাখার হাজিরা খাতা সেই শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তা) তত্ত্বাবধানে থাকে। অফিস শুরুর নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করবেন এবং যারা উপস্থিত হননি, তাদের নামের পাশে অনুপস্থিতি চিহ্নিত করবেন।

  • প্রতিস্বাক্ষর: শাখা প্রধানের স্বাক্ষরের পর সেই খাতাটি অধিশাখা প্রধানের (উপসচিব বা তদুর্ধ্ব কর্মকর্তা) নিকট নিয়মিত পেশ করতে হয়। বিধি অনুযায়ী, এটিই হাজিরা নিশ্চিতকরণের বৈধ প্রক্রিয়া।

প্রধান সহকারী বা উচ্চমান সহকারীর প্রকৃত ভূমিকা

প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রধান সহকারী বা উচ্চমান সহকারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও হাজিরা খাতার ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা মূলত সহযোগিতামূলক:

১. তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ: তারা কেবল এটি নিশ্চিত করতে পারেন যে, কর্মচারীরা ঠিকমতো হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন কি না। খাতাটি সংরক্ষণ করা বা শাখা প্রধানের টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া তাদের রুটিন দায়িত্বের অংশ। ২. তথ্য প্রদান: কোনো কর্মচারী নিয়মিত দেরি করলে বা অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকলে, প্রধান সহকারী বিষয়টি মৌখিক বা লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারেন। তবে নিজ হাতে ‘অনুপস্থিত’ লেখার ক্ষমতা তার নেই। ৩. শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বা বেতন কর্তনের সুপারিশ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল নিযুক্তিকারী কর্তৃপক্ষ (Appointing Authority) বা তাদের মনোনীত কর্মকর্তার হাতে ন্যস্ত।

প্রশাসনিক কর্মকর্তার (AO) বিশেষ ভূমিকা

পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চমান সহকারী যখন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (AO) পদে উন্নীত হন, তখন তার প্রশাসনিক তদারকির পরিধি বৃদ্ধি পায়। তিনি প্রশাসনিক শাখার অংশ হিসেবে হাজিরা খাতা ব্যবস্থাপনায় অধিকতর ভূমিকা পালন করেন। তবে তিনিও মূলত শাখা প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন।

বিশেষজ্ঞ অভিমত

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অফিসে অনেক সময় প্রধান সহকারী বা উচ্চমান সহকারীরা পদমর্যাদাগত জ্যেষ্ঠতার কারণে হাজিরা নিয়ন্ত্রণ করতে চান, যা প্রায়শই অধস্তন কর্মচারীদের সাথে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। আইনিভাবে, হাজিরা খাতা নিয়ন্ত্রণ একটি আধা-বিচারিক প্রক্রিয়া, যা কেবল গেজেটেড কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

উপসংহার: সরকারি বিধি মোতাবেক, হাজিরা খাতা রক্ষণাবেক্ষণ (Maintenance) এবং আইনিভাবে অনুপস্থিতি চিহ্নিত করা বা শাস্তি প্রদানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রধান সহকারী বা উচ্চমান সহকারী কেবল রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন, কিন্তু চূড়ান্ত আইনি ক্ষমতা কেবল শাখা প্রধান বা অফিস প্রধানের হাতেই সংরক্ষিত।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *