নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের ‘অবকাশকালীন ছুটি’: বিধি ও আইনি ব্যাখ্যা

বাংলাদেশের সরকারি চাকুরিজীবীদের ছুটির বিধান প্রধানত ‘নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে সাধারণ সিভিল কর্মকর্তাদের তুলনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা আদালতের মতো অবকাশকালীন বিভাগের ছুটি কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। অনেক সময় সরাসরি ‘অবকাশকালীন ছুটি’ (Vacation Leave) শব্দবন্ধটি মূল বিধিমালার সাধারণ ধারায় খুঁজে না পাওয়ায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

কোন বিধিতে এই ছুটির উল্লেখ আছে?

মূলত অবকাশকালীন বিভাগের ছুটি এবং অর্জিত ছুটির বিষয়টি নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৯ (Rule 9) এবং মৌলিক বিধি (Fundamental Rules/FR) ৮২-তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

১. অর্জিত ছুটির বিশেষ হার (ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯ – বিধি ৯): এই বিধি অনুযায়ী, যারা অবকাশকালীন বিভাগে কর্মরত (যেমন—শিক্ষক), তারা সাধারণ কর্মকর্তাদের মতো পূর্ণ হারে অর্জিত ছুটি পান না। যেহেতু তারা বছরে একটি নির্দিষ্ট সময় ‘ভ্যাকেশন’ বা দীর্ঘ ছুটি ভোগ করেন, তাই তাদের অর্জিত ছুটির হিসাব সাধারণ কর্মকর্তাদের চেয়ে কম হয়।

২. মৌলিক বিধি ৮২ (Fundamental Rule 82): FR 82-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, অবকাশকালীন বিভাগের কোনো কর্মচারী যদি পূর্ণ অবকাশ ভোগ করেন, তবে তিনি ব্যক্তিগত কারণে সাধারণ অর্জিত ছুটি সঞ্চয় করতে পারবেন না (তবে চিকিৎসা সনদে ছুটি ভিন্ন বিষয়)। কিন্তু যদি কোনো কারণে তাকে জনস্বার্থে অবকাশের সময়ও দায়িত্ব পালন করতে হয়, তবেই তিনি সেই সময়ের বিনিময়ে অর্জিত ছুটি (Earned Leave) জমা করতে পারবেন।


ভ্যাকেশন বনাম অর্জিত ছুটি: প্রধান পার্থক্য

অনেকে মনে করেন ভ্যাকেশন মানেই অর্জিত ছুটি। আসলে বিষয়টি তা নয়। এর কাঠামোগত পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো:

  • অবকাশকালীন বিভাগ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ) এবং বিচার বিভাগ যেখানে বছরে নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দীর্ঘ বিরতি থাকে।

  • ছুটি জমা হওয়া: সাধারণ সরকারি কর্মচারী পূর্ণ গড় বেতনে বছরে ৩০ দিন অর্জিত ছুটি পান। কিন্তু একজন শিক্ষক (যিনি পূর্ণ অবকাশ ভোগ করেন) তিনি সাধারণত বছরে মাত্র ১০ দিন গড় বেতনে অর্জিত ছুটি জমা করতে পারেন (বিধি ৯-এর উপধারা অনুযায়ী)।

  • ভ্যাকেশন ভোগ: যদি কোনো শিক্ষক পুরো ভ্যাকেশন পিরিয়ড ভোগ করেন, তবে এর জন্য তাকে আলাদা করে ছুটির আবেদন করতে হয় না, এটি তার চাকরির শর্ত অনুযায়ী ‘ডিউটি’ হিসেবেই গণ্য হয়। তবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ‘অবকাশকালীন ছুটি’র অনুমতি নিতে হয়।


বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিয়ম কী?

বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে আপনাকে ‘বহিঃবাংলাদেশ ছুটি’ (Ex-Bangladesh Leave) নিতে হয়। ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে দুটি উপায় রয়েছে:

  1. ভ্যাকেশনের সাথে সমন্বয়: যদি কোনো শিক্ষক রমজান বা গ্রীষ্মকালীন অবকাশের সময় বিদেশে যেতে চান, তবে তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে ‘অবকাশকালীন সময়ে বিদেশে অবস্থানের অনুমতি’ নিতে হয়। এক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত ছুটির হিসাব (Leave Account) থেকে ছুটি কাটা যায় না।

  2. অর্জিত ছুটির মাধ্যমে: ভ্যাকেশন পিরিয়ড ছাড়াও বছরের অন্য সময় বিদেশে যেতে চাইলে তার জমানো ‘অর্জিত ছুটি’ থেকে গড় বেতনে ছুটির আবেদন করতে হয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

আপনার উল্লিখিত নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৮ মূলত গড় বেতনে ও অর্ধগড় বেতনে ছুটির সাধারণ নিয়ম বর্ণনা করে। ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের সীমাবদ্ধতা বুঝতে আপনাকে এর ঠিক পরের ধারা অর্থাৎ বিধি ৯ এবং এর সাথে সম্পূরক হিসেবে বিএসআর (BSR) পার্ট-১ এর বিধি ১৪৯-১৫২ পর্যালোচনা করতে হবে।

উপসংহার: সহজ কথায়, অবকাশকালীন ছুটি কোনো আলাদা ‘বোনাস’ নয়, বরং দীর্ঘ ভ্যাকেশন সুবিধা পাওয়ার কারণে শিক্ষকদের অর্জিত ছুটির হার সাধারণের তুলনায় কম রাখা হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভ্যাকেশনের সময়কে ব্যবহার করাই সবচেয়ে লাভজনক, কারণ এতে ব্যক্তিগত জমানো ছুটি খরচ হয় না।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *