সরকারি চাকুরিজীবীদের বিদেশ যাত্রা: এনওসি (NOC) ও জিও (GO) সংক্রান্ত বিভ্রান্তি ও সঠিক নিয়ম
বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অনাপত্তিপত্র (NOC) এবং সরকারি আদেশ (GO) সংগ্রহ করা একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া। তবে সম্প্রতি বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র (USA) ও অস্ট্রেলিয়ার ভিসার ক্ষেত্রে ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে গমনের সময় এই নথিপত্রগুলো ঠিক কোন পর্যায়ে প্রয়োজন, তা নিয়ে অনেক চাকুরীজীবীর মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে। মূলত এজেন্সিগুলোর তথ্যের ভিন্নতা এবং দাপ্তরিক অভিজ্ঞতার অভাবে এই জটিলতা তৈরি হয়।
১. ইউএসএ (USA) ভিসার ক্ষেত্রে বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার জন্য আবেদন বা ইন্টারভিউয়ের সময় সাধারণত দূতাবাস থেকে এনওসি (NOC) বা জিও (GO) দেখতে চাওয়া হয় না। ডিএস-১৬০ (DS-160) ফর্মেও এই ধরনের নথি আপলোডের কোনো সুযোগ নেই। ইন্টারভিউয়ের সময় মূলত পাসপোর্ট, আই-২০ (I-20), ম্যারেজ সার্টিফিকেট এবং আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণই যথেষ্ট। তবে আপনি যে সরকারি চাকুরীজীবী, তা আপনার ফর্মে নির্ভুলভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
২. অস্ট্রেলিয়া ভিসার ক্ষেত্রে এনওসি (NOC)
অস্ট্রেলিয়ার ভিসা প্রক্রিয়া অনলাইন পোর্টাল ভিত্তিক হওয়ায় সেখানে নথিপত্র আপলোডের বাধ্যবাধকতা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ‘জেনুইন টেম্পোরারি এন্ট্রান্ট’ (GTE) প্রমাণের জন্য চাকুরি থেকে অনাপত্তি বা ছুটির প্রমান চাওয়া হতে পারে। এজেন্সির পরামর্শ অনুযায়ী, পোর্টালের রিকোয়ারমেন্ট চেক করে এনওসি প্রদান করা নিরাপদ। এটি প্রমাণ করে যে আপনি আপনার কর্মস্থল থেকে অনুমতি নিয়েই বিদেশে যাওয়ার আবেদন করছেন।
৩. এনওসি (NOC) ও জিও (GO)-এর মধ্যে পার্থক্য ও সময়কাল
এনওসি (NOC): এটি মূলত বিভাগীয় অনাপত্তি পত্র। এটি দিয়ে বোঝানো হয় যে আপনার বিদেশ ভ্রমণে কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি নেই। এটি ভিসা আবেদনের আগেই সংগ্রহ করা সম্ভব।
জিও (GO): এটি হলো সরকারের চূড়ান্ত অনুমতিপত্র। সাধারণত ভিসা হওয়ার পর নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করে জিও ইস্যু করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভিসা আবেদনের সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যায়। সেক্ষেত্রে জিও-তে তারিখের জায়গায় “ছুটি ভোগের তারিখ হতে…” অথবা সম্ভাব্য একটি তারিখ উল্লেখ থাকে।
৪. স্ত্রীর উচ্চশিক্ষায় সঙ্গ দিতে ছুটির নিয়মাবলী
৯ম গ্রেডের একজন গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে স্ত্রীর উচ্চশিক্ষায় সঙ্গী হতে (Companion/Dependent) লম্বা সময়ের ছুটি পাওয়া বেশ জটিল। সরকারি বিধি মোতাবেক:
অসাধারণ ছুটি (Extraordinary Leave): ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বা সঙ্গ দেওয়ার জন্য একটানা দীর্ঘ ছুটি (যেমন ১-২ বছর) পাওয়া কঠিন। সাধারণত সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর হতে পারে।
ভ্রমণ ছুটি: স্ত্রী বিদেশে চলে যাওয়ার পর আপনি ৩০ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে দেখা করতে যেতে পারেন।
শিক্ষা ছুটি: আপনি নিজে যদি কোনো উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপ পান, তবেই কেবল ২ বছর বা তার বেশি সময় জিও সহ ছুটি পাওয়ার সুযোগ থাকে।
৫. ভুক্তভোগী ও অভিজ্ঞদের পরামর্শ
অভিজ্ঞদের মতে, ভিসার ইন্টারভিউ ফেস করার জন্য এনওসি বাধ্যতামূলক না হলেও সরকারি পোর্টালে বা ব্যক্তিগত রেকর্ডের স্বচ্ছতার জন্য এটি থাকা ভালো। তবে মনে রাখতে হবে, এনওসি বা জিও না থাকার কারণে সাধারণত ইউএস বা অস্ট্রেলিয়ার ভিসা রিজেক্ট হয় না; বরং রিজেকশন নির্ভর করে আর্থিক ঘাটতি বা দেশে ফিরে আসার জোরালো প্রমাণের অভাবের ওপর।
উপসংহার: আপনার দপ্তরে যদি আগে এনওসি দেয়ার অভিজ্ঞতা না থাকে, তবে হেড অফিস বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার সাথে যোগাযোগ করে নির্ধারিত ফরম্যাটে আবেদন করা উচিত। মনে রাখবেন, ভিসা পাওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদী ছুটির জন্য লিয়েন বা অসাধারণ ছুটির বিধানগুলো ভালোভাবে যাচাই করে নেয়া প্রয়োজন।
পরামর্শমূলক সারসংক্ষেপ (Quick Tips):
মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ: জিও (GO)-এর জন্য স্কলারশিপের কপি সহ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করুন। ভিসা ছাড়া জিও পাওয়া সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি ভিসার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
সঠিক তথ্য প্রদান: ভিসা ফর্মে বা ইন্টারভিউতে আপনার পেশা ও পদের তথ্য শতভাগ নির্ভুল রাখুন।
ছুটির পরিকল্পনা: ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে ২ বছরের ছুটি পাওয়ার আইনগত সুযোগ সীমিত, তাই স্বল্পমেয়াদী ছুটি বা লিয়েনের বিষয়টি আগেভাগেই প্রশাসনিকভাবে পরিষ্কার করে নিন।



