নবম পে-স্কেল ২০২৬ । সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা বনাম বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। একদিকে পে-কমিশনের বড় অংকের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ, অন্যদিকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে প্রশাসনে এখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে।
বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব ও সরকারি পরিকল্পনা
সূত্রমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পে-কমিশন সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। তবে বর্তমান সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় এই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মূল বেতন শেষ পর্যন্ত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিন ধাপের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: সবকিছু ঠিক থাকলে নবম পে-স্কেল তিনটি ধাপে বাস্তবায়িত হতে পারে:
প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): সংশোধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি অংশ কার্যকর হতে পারে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): নতুন স্কেলে ভাতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
কর্মচারীদের অসন্তোষ ও দাবির যৌক্তিকতা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, কমিশনের সুপারিশের বাইরে বেতন নির্ধারণ করা হলে তা কর্মচারীদের কোনো উপকারে আসবে না। তার মতে:
বর্তমানে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা। ৬০-৭০ শতাংশ বাড়লে তা ১২-১৪ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
অথচ পে-কমিশন সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করেছে।
কর্মচারীদের দাবি ছিল সর্বনিম্ন ৩৫,০০০ টাকা, কারণ গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে।
আব্দুল মালেক আরও বলেন, “অতীতে প্রতিটি পে-স্কেলেই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ বা তার বেশি বেড়েছে। এবারও যদি সর্বনিম্ন বেতন অন্তত ১৬-১৭ হাজার টাকা না হয়, তবে তা বৈষম্য দূর করতে ব্যর্থ হবে।”
বাজেটে বিশাল ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের কমিশন গত জানুয়ারিতে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়:
বর্তমানে ১৪ লাখ কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর পেছনে বার্ষিক ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে আরও অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এই বিশাল আর্থিক চাপ সামলাতেই সরকার মূলত ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও আলাদা বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে, যা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি বিশ্লেষণ করছে।
উপসংহার
সরকারি কর্মচারীরা আশা করছেন, সরকার পে-কমিশনের মূল সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতন বহাল রাখবে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খোঁজা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী বছরের সরকারি কর্মচারীদের ভাগ্যে কতটা সুসংবাদ থাকছে।


