সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তান সাথে আনতে পারবেন শিক্ষকরা, তবে শ্রেণিকক্ষে নেওয়া নিরুৎসাহিত: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ তাদের শিশু সন্তানকে বিদ্যালয়ে সাথে নিয়ে আসতে পারবেন। তবে পাঠদানের পরিবেশ বজায় রাখতে শ্রেণিকক্ষে শিশু সন্তানকে সাথে না নেওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) থেকে জারিকৃত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নারী শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে সন্তান নিয়ে আসা সংক্রান্ত নানাবিধ সমালোচনার প্রেক্ষিতে এই প্রজ্ঞাপনটির আইনি ও মানবিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করছে।
মূল প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন শাখার সহকারী পরিচালক মোঃ রাইছুল করিম স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে প্রধান ৩টি নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে:
সন্তান সাথে আনার অধিকার: দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে অধিদপ্তর জানতে পেরেছে যে, শিক্ষকরা তাদের শিশু সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়ে গেলে কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাতে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছেন। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা হয়েছে— কোনো দুগ্ধপোষ্য (মাতৃদুগ্ধপানকারী) শিশু সন্তান দীর্ঘসময় মায়ের থেকে দূরে থাকবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষকরা তাদের অর্পিত দায়িত্ব এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিঘ্নিত না করে শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে আসতে পারবেন।
শ্রেণিকক্ষে বিধিনিষেধ ও বিকল্প ব্যবস্থা: তবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য শিশু সন্তানকে ক্লাসরুমে নিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে শিক্ষকরা প্রয়োজনে একজন ‘বিকল্প সহযোগী’ বা আয়া সাথে নিয়ে আসতে পারবেন। সম্ভব হলে বিদ্যালয় বা বিদ্যালয়ের পাশে অস্থায়ীভাবে “ডে কেয়ার”-এর ব্যবস্থা করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির নির্দেশনা: প্রজ্ঞাপনে মাঠ পর্যায়ের সকল কর্মকর্তাকে (বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার) শিশুদের প্রতি সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রেখে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সমালোচকদের জবাবে প্রজ্ঞাপনের গুরুত্ব
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা প্রায়শই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকদের বিদ্যালয়ে সন্তান নিয়ে আসা নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনা করেন, এই প্রজ্ঞাপন তাদের জন্য একটি আইনি জবাব।
১. মাতৃত্বকালীন অধিকার ও শিশুর সুরক্ষা: রাষ্ট্র যেখানে মাতৃদুগ্ধ পান করানো এবং শিশুর সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে একজন কর্মজীবী মা যেন তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানের যত্ন নিতে পারেন— এই আদেশটি তারই প্রতিফলন।
২. দায়িত্ব ও কর্তব্যের সমন্বয়: প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, সন্তান সাথে আনার কারণে স্কুলের স্বাভাবিক পরিবেশ বা অর্পিত দায়িত্বে কোনো প্রকার ঘাটতি পড়া চলবে না। অর্থাৎ, এটি কোনো বিশেষ ছাড় নয়, বরং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার একটি মানবিক উদ্যোগ।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান (ডে কেয়ার): সমালোচনা না করে কর্মক্ষেত্রে কীভাবে মা ও শিশুর জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা যায়, প্রজ্ঞাপনে সেই পথও দেখানো হয়েছে (বিকল্প সহযোগী বা ডে-কেয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে)।
বিতরণ ও কার্যকারিতা
এই নির্দেশনাটি দেশের সকল বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা/থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে শিক্ষকদের হেনেস্তা বা বাধা দেওয়ার পথ যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমনি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পরিবেশও সমুন্নত রাখার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে।


