সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

পেশাজীবী অঙ্গনে ‘দলীয় দাসত্ব’ : মেধা ও নৈতিকতা ফেরানোর ডাক দিলেন ডা. ফজলে এলাহী খাঁন

দেশের প্রতিটি পেশাজীবী সংগঠনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তি’ ও ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেফ্রোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে এলাহী খাঁন। তিনি মনে করেন, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিক ও আমলা—প্রত্যেকটি পেশাজীবী সংগঠন আজ দলীয় কার্যালয়ের বর্ধিত অংশে পরিণত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক পেশাগত মান ও নৈতিকতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সম্প্রতি নিজের ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আবেগঘন ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধের মাধ্যমে তিনি এই ‘বিষবৃক্ষ’ উৎপাটনের ডাক দেন।

পেশাজীবী সংগঠনের রাজনৈতিকীকরণ: এক নীরব বিপর্যয়

ডা. ফজলে এলাহী খাঁন তার লেখায় উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতির কবলে পড়ে বিএমএ (BMA), বার কাউন্সিল, আইইবি (IEB), কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আজ দিকভ্রান্ত। তার মতে:

  • পেশাগত অবক্ষয়: সংগঠনের মূল কাজ পেশাগত উৎকর্ষ সাধন হওয়া সত্ত্বেও, আজ সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে বদলি, পদায়ন, তদবির ও নিয়োগ বাণিজ্য।

  • কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য: দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সহকর্মীরা একে অপরের প্রতিপক্ষ বা শত্রুতে পরিণত হয়েছেন, যার চরম খেসারত দিচ্ছেন সেবাপ্রার্থী সাধারণ মানুষ।

  • মেধার অবমূল্যায়ন: যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, আর দলীয় ছত্রছায়ায় অযোগ্যরা পাচ্ছেন অযাচিত সুবিধা।

নিজস্ব অনুতাপ ও পরিবর্তনের আহ্বান

ডা. ফজলে এলাহী খাঁন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের অতীতের ভুল স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, অতীতে চিকিৎসকদের একটি দলীয় সহযোগী সংগঠনের জেলা পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই ব্যবস্থার কদর্য রূপটি কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি লেখেন, “সেই দলীয় পরিচয়টি কোনো না কোনোভাবে আমার পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছিল। আজ আমি নিজের সেই অতীতের জন্য গভীর অনুতাপ বোধ করি।”

‘রাজনৈতিক সচেতনতা’ ও ‘দলীয় দাসত্বের’ পার্থক্য

উন্নত বিশ্বের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও পেশাজীবী সংগঠনগুলো সরাসরি রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে না। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা নাগরিক অধিকার হলেও, পেশাজীবী জীবনে সেই মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়াকে তিনি ‘পেশাগত আত্মহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, “পেশাজীবীদের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত জনসেবক বা জাতির মেধাবী প্রতিনিধি।”

অনুপ্রেরণা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

এই পরিবর্তনের পথে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি নোয়াখালীর প্রথিতযশা হার্ট স্পেশালিস্ট ডা. করিমুল হুদা সিরাজীর নির্লোভ পেশাদারিত্ব ও দর্শনের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।

ডা. ফজলে এলাহী খাঁন সতর্ক করে বলেন, এখনই যদি এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরে না আসা যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে মেধার কোনো মূল্য থাকবে না এবং সমাজ তোষামোদের রাজনীতির হাতে বন্দি হয়ে পড়বে। তিনি পেশাজীবীদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, দলীয় দাসত্ব নয়, বরং মেধা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন ও আত্মমর্যাদাশীল সমাজ গঠনে সবাইকে নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হতে হবে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ: নিবন্ধটিতে ডা. ফজলে এলাহী খাঁন যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি কেবল অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজের ভুল স্বীকার করে পরিবর্তনের উদাহরণ তৈরি করেছেন। তার এই আহ্বান কি পেশাজীবী অঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সংস্কারের সূচনা করবে, নাকি এটি কেবলই একটি ব্যক্তিগত উপলব্ধি হিসেবেই থেকে যাবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সোর্স

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *