চাকরিরত অবস্থায় সরকারি কর্মচারীর মৃত্যু : লাম্পগ্র্যান্ট, পেনশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির নিয়মাবলী
সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হলে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সরকার বেশ কিছু আর্থিক সুবিধা ও কল্যাণ অনুদান প্রদান করে থাকে। তবে সাধারণ অবসরের সাথে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে কিছু নিয়মের ভিন্নতা রয়েছে। বিশেষ করে, চাকরিরত অবস্থায় মারা গেলে পিআরএল (PRL) সুবিধা প্রযোজ্য হয় না, তবে পরিবার ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ‘লাম্পগ্র্যান্ট’ হিসেবে পেয়ে থাকেন।
মৃত সরকারি কর্মচারীর পরিবারের জন্য সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন অনুদান যেমন— লাম্পগ্র্যান্ট, জিপিএফ, আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি), মাসিক পেনশন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুদান, যৌথবিমা, কল্যাণ তহবিল এবং দাফন অনুদান পাওয়ার সঠিক ধারাবাহিকতা ও আবেদন প্রক্রিয়া নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
১. পিআরএল ও লাম্পগ্র্যান্ট: একসাথে কি আবেদন করা যাবে?
সাধারণ নিয়মে অবসরে যাওয়ার সময় পিআরএল এবং লাম্পগ্র্যান্টের আবেদন একসাথে করা হলেও, চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পিআরএল-এর কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু কর্মচারী পিআরএল ভোগ করার আগেই মারা গেছেন, তাই সরাসরি তার বৈধ উত্তরাধিকারী/উত্তরাধিকারীগণ লাম্পগ্র্যান্ট (ছুটি নগদায়ন)-এর জন্য আবেদন করবেন। বিধি অনুযায়ী, মৃত কর্মচারীর অর্জিত ছুটি পাওনা থাকা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা এককালীন লাম্পগ্র্যান্ট হিসেবে পাবেন।
২. আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির ধারাবাহিক আবেদন প্রক্রিয়া
মৃত কর্মচারীর পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তার টাকা দ্রুত তুলতে নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা মেনে আবেদন করতে হয়:
ধাপ ১: দাফন অনুদান ও তাৎক্ষণিক সহায়তা: মৃত্যুর পর পরই দাফন বা শেষকৃত্যের খরচের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে দাফন অনুদানের আবেদন করতে হয়।
ধাপ ২: লাম্পগ্র্যান্ট ও জিপিএফ (GPF): এরপরই দ্রুততম সময়ে ছুটি নগদায়ন (লাম্পগ্র্যান্ট) এবং সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলের (GPF) জমাকৃত টাকা ও মুনাফা উত্তোলনের আবেদন করতে হবে।
ধাপ ৩: আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) ও মাসিক পেনশন: বিভাগীয় ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আনুতোষিক (এককালীন পেনশন) এবং নিয়মিত মাসিক পেনশন চালুর জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ধাপ ৪: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুদান (৮,০০,০০০ টাকা): চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ তহবিল থেকে এককালীন সর্বোচ্চ ৮ লক্ষ টাকা অনুদানের জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে।
ধাপ ৫: যৌথবিমা ও মাসিক কল্যাণ ভাতা: বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড (BKKB) থেকে যৌথবিমার এককালীন অর্থ এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত মাসিক কল্যাণ ভাতার জন্য আবেদন করতে হবে।
৩. আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (চেকলিস্ট)
সবগুলো আবেদনের ক্ষেত্রেই সাধারণত নিচে উল্লেখিত মূল কাগজপত্রগুলোর প্রয়োজন হয় (আবেদন ভেদে কপির সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে):
১. দাফন/মৃত্যু সনদ (Death Certificate): সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত মূল সনদ এবং হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেট (যদি থাকে)।
২. উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশান সনদ: প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত (যাতে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের বিবরণ ও বয়স উল্লেখ থাকে)।
৩. পারিবারিক পেনশন ফরম ও ছবি: নির্ধারিত ফরম-৩ (পেনশন ফরম) এবং উত্তরাধিকারীদের সত্যায়িত পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
৪. নন-ম্যারেজ বা অবিবাহিতা সনদ: বিধবা স্ত্রীর ক্ষেত্রে পুনঃবিবাহ না করার এবং সন্তানদের ক্ষেত্রে অবিবাহিত থাকার সনদ।
৫. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): মৃত ব্যক্তি এবং সকল উত্তরাধিকারীর এনআইডি বা জন্ম সনদের কপি।
৬. সার্ভিস বুক (Service Book): মৃত কর্মকর্তার হালনাগাদ করা সার্ভিস বুক বা চাকরি বহি।
৭. লাস্ট পে সার্টিফিকেট (LPC): শেষ বেতনের প্রত্যয়ন পত্র।
৮. জিপিএফ হিসাব বিবরণী: হিসাবরক্ষণ অফিস কর্তৃক যাচাইকৃত জিপিএফ-এর সর্বশেষ ব্যালেন্স শিট।
৯. ব্যাংক হিসাবের তথ্য: নমিনি বা উত্তরাধিকারীদের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবের চেকের পাতা ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
৪. আবেদনের খসড়া ফরম্যাট (নমুনা)
নিচে লাম্পগ্র্যান্ট এবং অন্যান্য সুবিধার জন্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনের একটি স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাট দেওয়া হলো:
বরাবর,
[নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ / বিভাগীয় প্রধানের পদবী]
[দপ্তরের নাম ও ঠিকানা]
বিষয়: মৃত [মৃত কর্মচারীর নাম]-এর অনুকূলে লাম্পগ্র্যান্ট ও পারিবারিক পেনশনের আনুতোষিকসহ অন্যান্য বকেয়া পাওনাদি পরিশোধের আবেদন।
মহোদয়,
বিনীত নিবেদন এই যে, আপনার দপ্তরাধীন [মৃত কর্মচারীর পদবী] হিসেবে কর্মরত জনাব/বেগম [মৃত কর্মচারীর নাম] গত [মৃত্যুর তারিখ] তারিখে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন (মৃত্যু সনদ সংযুক্ত)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, [সংখ্যা] পুত্র এবং [সংখ্যা] কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী মৃত কর্মচারীর আইনগত [সম্পর্ক, যেমন: স্ত্রী/স্বামী/পুত্র] এবং ওয়ারিশান সনদ অনুযায়ী তার সকল আর্থিক সুবিধা গ্রহণের জন্য মনোনীত প্রতিনিধি/উত্তরাধিকারী।
যেহেতু তিনি চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন, সেহেতু তার পাওনা ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন (লাম্পগ্র্যান্ট), সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিল (জিপিএফ), দাফন অনুদান, আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) ও মাসিক পেনশনসহ সরকার প্রদত্ত অন্যান্য কল্যাণ অনুদান প্রাপ্তি আবশ্যক।
অতএব, মহোদয়ের নিকট আকুল প্রার্থনা, মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার মরহুম [স্বামী/পিতা]-এর অর্জিত ছুটির বিপরীতে লাম্পগ্র্যান্ট এবং পেনশনের অন্যান্য আর্থিক সুবিধাদি দ্রুত প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আপনার সুমর্জি হয়।
বিনীত,
(আবেদনকারীর স্বাক্ষর)
[আবেদনকারীর নাম]
মৃত [কর্মচারীর নাম]-এর [সম্পর্ক]
ঠিকানা: …………………………….
মোবাইল নং: ……………………….
সংযুক্তিসমূহ:
(উপরে উল্লেখিত ৩ নং ক্রমিকে বর্ণিত কাগজপত্রের তালিকা এখানে যুক্ত করতে হবে)
প্রতিবেদকের মন্তব্য: চাকরিরত অবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারগুলো এমনিতেই দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাই এই ধরণের পেনশন ও অনুদানের ফাইলগুলো যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও আন্তরিক ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।



