৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

কারিগরি জটিলতায় আটকেছে নতুন পে-স্কেলের গেজেট: কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকেই, চূড়ান্ত রূপরেখা সেপ্টেম্বরে

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহু প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সফটওয়্যার সংক্রান্ত জটিলতা। ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকলেও, এই কারিগরি সমস্যার কারণে এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধি, নতুন ভাতা যুক্ত হওয়া এবং অবসরকালীন সুবিধা নিয়ে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রশাসনিক ও কারিগরি দিকগুলো সমন্বয় করে গেজেট প্রস্তুত করতে গিয়ে সরকারকে বাড়তি সময় নিতে হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি অথবা শেষ সপ্তাহে এই গেজেট জারি হতে পারে। তবে বিলম্ব হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই; নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকেই গণনা করা হবে। ফলে গেজেট প্রকাশে দেরি হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন-ভাতার সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন।

মূল প্রতিবন্ধকতা: আইবাস ও ইএফটি সফটওয়্যার

অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকার দেশের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য নিশ্চিত করেই এটি কার্যকর করতে চাইছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে মূল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান ডিজিটাল সফটওয়্যার ব্যবস্থা। ২০১৫ সালে যখন অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, তখন বেশিরভাগ কাজ ম্যানুয়ালি বা হাতে করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও জিপিএফসহ প্রায় সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং ‘আইবাস’ (iBAS++) সফটওয়্যারের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।

এই অবস্থায় ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করতে গেলে সফটওয়্যারে বড় ধরনের কারিগরি পরিবর্তন আনতে হবে, যা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

প্রশাসনিক জটিলতা ও অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মচারীদের শঙ্কা

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন:

“আগের মতো হাতে বেতন নির্ধারণ (পে-ফিক্সেশন) করার সুযোগ এখন আর নেই। যদি একাধিক ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হয়, তবে একই কর্মচারীর জন্য বারবার পে-ফিক্সেশন করতে হবে। এতে সফটওয়্যারে বারবার পরিবর্তন আনতে হবে, যা প্রশাসনিক জটিলতা এবং ভুল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।”

তিনি আরও জানান, এই জটিলতার কারণে পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও অবসরজনিত সুবিধা নির্ধারণেও নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।

এই কারিগরি জটিলতার কারণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন অবসরের দ্বারপ্রান্তে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যেহেতু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও ছুটির নগদায়নসহ অধিকাংশ আর্থিক সুবিধা কর্মচারীটির সর্বশেষ প্রাপ্ত মূল বেতনের (Basic Pay) ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তাই বর্তমান ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থায় দুই বা তিন ধাপে অবসর সুবিধা সমন্বয় করার কোনো স্বয়ংক্রিয় সুযোগ নেই। ফলে অবসরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা তাদের ভবিষ্যৎ প্রাপ্যতা ও বৈষম্য নিয়ে রীতিমতো শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।

সংকট উত্তরণে বিকল্প প্রস্তাব

কারিগরি ও প্রশাসনিক এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে একটি সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আহ্বায়ক আব্দুল মালেক মনে করেন, ধাপে ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পরিবর্তে প্রথম দফাতেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে একবারে পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন করা উচিত। এরপর বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতাগুলো পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে যুক্ত করা যেতে পারে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে সফটওয়্যারে বারবার পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হবে না এবং অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের বৈষম্য তৈরির আশঙ্কা থাকবে না।

সরকারের প্রস্তুতি ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের একটি সচিব কমিটি বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব, সফটওয়্যারের সামঞ্জস্যতা ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও ইতিপূর্বে জানিয়েছেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। তবে এর ফলে বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির (Inflation) ওপর যেন কোনো সম্ভাব্য চাপ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাকে সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *