সচিব কমিটির রিপোর্ট ও সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন: পে স্কেলের গেজেট জারি না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচী চলবে?
সরকারি চাকুরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামো (৯ম পে-কমিশন) বাস্তবায়ন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। একদিকে বেতন কমিশনের সুপারিশ জমা পড়া, অন্যদিকে সচিব কমিটির দীর্ঘসূত্রতা—এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ কর্মচারীরা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি পোস্টারকে কেন্দ্র করে নতুন করে দানা বাঁধছে আন্দোলন। যেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “আর নয় আশ্বাস, প্রজ্ঞাপনে বিশ্বাস!”
সচিব কমিটির রিপোর্টে কেন এই বিলম্ব?
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন গত ২২ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু মাসের পর মাস পার হয়ে গেলেও সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করতে পারেনি।
সূত্রমতে, সচিব কমিটি এই বিশাল ব্যয়ভার (প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা) একবারে সামলানোর পরিবর্তে কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি জানিয়েছেন, “বেতন কাঠামো সরাসরি কার্যকর না করে প্রতিটি দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
কর্মচারীদের ক্ষোভের মূল কারণ
প্রচারিত চিত্রটিতে সরকারি কর্মচারীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা গেছে। তাদের প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
বিমূর্ত আশ্বাস: কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও প্রজ্ঞাপন (Gazette) জারি না হওয়ায় কর্মচারীরা একে ‘প্রতারণা’ হিসেবে দেখছেন।
প্রচার বনাম বাস্তবতা: আন্দোলনের নেতাদের মতে, অনেকে প্রচার করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাদের দাবি, গেজেট হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুতেই তারা বিশ্বাস রাখবেন না।
বেতন বৈষম্য: সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার সুপারিশ থাকলেও তা এখনো কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য চিত্র
সচিব কমিটির সূত্র এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে:
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | প্রস্তাবিত (সম্ভাব্য) |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৬০,০০০ টাকা |
| বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া | এককালীন | ৩টি ধাপে (৫- বছর মেয়াদী) |
| বেতন বৃদ্ধির হার | – | ১০০% থেকে ১৪০% |
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী কর্মসূচি
সচিব কমিটির এই ধীরগতিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। তারা পরিষ্কার জানিয়েছেন, গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বিশেষ করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা এই বৈষম্য নিরসনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সরকার বলছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজস্ব আয়ের ভারসাম্য রক্ষা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কর্মচারীদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে দ্রুত বেতন বৃদ্ধি ছাড়া তাদের টিকে থাকা অসম্ভব।
সারকথা: সচিব কমিটির রিপোর্ট এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার টেবিলে বন্দি। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করছে চলতি মে মাসেই সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ প্রদানের ওপর।


