নবম পে-স্কেল ও বেসিক বৃদ্ধির গুঞ্জন: হিসাবের ‘ভেজাল’ ও বাজার গরমের আসল রহস্য
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘নবম পে-স্কেল’। গুঞ্জন উঠেছে, সরকার আগামী বাজেটে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল তহবিল বরাদ্দ রাখার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। তবে এই নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া হিসাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও ‘হিসাবের ভেজাল’ লক্ষ্য করা গেছে, যা বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৫০ শতাংশ বেসিক বৃদ্ধি ও গুঞ্জনের মূল ভিত্তি
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন (বেসিক) গড়ে ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সাথে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের (১১ থেকে ২০তম গ্রেড) ক্ষেত্রে অসন্তোষ দূর করতে শতভাগ বেসিক বৃদ্ধির একটি জোরালো গুঞ্জনও ডালপালা মেলছে। পে-কমিশনের প্রাথমিক খসড়া ও বাজার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির একটি তুলনামূলক চিত্র ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে, যা সরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
ভুল হিসাব বা ‘হিসাবের ভেজাল’ কোথায়?
অনেকে সামাজিক মাধ্যমে দাবি করছেন— ১০ম গ্রেডের একজন কর্মচারী যার বর্তমান বেসিক বার্ষিক ৫% ইনক্রিমেন্ট পেয়ে ২৩,৬৮০ টাকায় পৌঁছেছে, নতুন স্কেলে তার প্রারম্ভিক বেসিক ২৪,০০০ টাকা হলে তার বেতন বাড়বে মাত্র ৩২০ টাকা! বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল এবং বিভ্রান্তিকর হিসাব।
প্রকৃত নিয়ম অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে কোনো কর্মচারীর বেতন পে-স্কেলের প্রারম্ভিক বা শুরুর ধাপ থেকে কাউন্ট হয় না। বরং তার বর্তমান বেসিকের সাথে নির্ধারিত শতকরা হার (যেমন ৫০%) যোগ করে নতুন স্কেলের সমমানের বা ঠিক উপরের ধাপে তার বেতন ‘ফিক্সেশন’ বা নির্ধারণ করা হয়। ফলে ২৩,৬৮০ টাকা বেসিকধারী কর্মচারীর নতুন বেতন ৩২০ টাকা নয়, বরং ৫০% বৃদ্ধিতে প্রায় ৩৫,৫২০ টাকার কাছাকাছি কোনো ধাপে নির্ধারিত হবে। এই গাণিতিক ফিক্সেশন পদ্ধতি না বোঝার কারণেই মূলত সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে “হিসাবে ভেজাল আছে” বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
শতভাগ বেসিক বাস্তবায়ন ও বাজার গরমের আশঙ্কা
সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশের মতে, যদি শুধু কাগজে-কলমে বেতন বৃদ্ধি করা হয় এবং সেই অনুপাতে খোলা বাজারের দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে এই পে-স্কেল কোনো সুফল বয়ে আনবে না। অতীতে দেখা গেছে, পে-স্কেলের ঘোষণা আসার সাথে সাথেই বাড়িভাড়া, যাতায়াত খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সাধারণ কর্মচারীদের বক্তব্য, “শতভাগ বেসিকের সুফল নিশ্চিত করতে না পারলে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এই পে-স্কেল কেবল বাজার গরম করা ছাড়া সাধারণ ও নিম্ন-আয়ের কর্মচারীদের কোনো উপকারে আসবে না।”
প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলের খসড়া বেতন কাঠামো (একনজরে)
নিচে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন এবং ৫০% বৃদ্ধিতে সম্ভাব্য নতুন মূল বেতনের একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
- ১ম গ্রেড: ৭৮,০০০ টাকা ➡️ ১,১৭,০০০ টাকা
- ২য় গ্রেড: ৬৬,০০০ – ৭৬,৪৯০ টাকা ➡️ ৯৯,০০০ – ১,১৪,৭custom টাকা
- ৩য় গ্রেড: ৫৬,৫০০ – ৭৪,৪০০ টাকা ➡️ ৮৪,৭৫০ – ১,১১,৬০০ টাকা
- ৪র্থ গ্রেড: ৫০,০০০ – ৭১,encode টাকা ➡️ ৭৫,০০০ – ১,০৬,৮০০ টাকা
- ৫ম গ্রেড: ৪৩,০০০ – ৬৯,৮৫০ টাকা ➡️ ৬৪,৫০০ – ১,০৪,৭৭৫ টাকা
- ৬ষ্ঠ গ্রেড: ৩৫,৫০০ – ৬৭,০১০ টাকা ➡️ ৫৩,২৫০ – ১,০০,৫১৫ টাকা
- ৭ম গ্রেড: ২৯,০০০ – ৬৩,৪১০ টাকা ➡️ ৪৩,৫০০ – ৯৫,১১৫ টাকা
- ৮ম গ্রেড: ২৩,০০০ – ৫৫,৪৭০ টাকা ➡️ ৩৪,৫০০ – ৮৩,২০৫ টাকা
- ৯ম গ্রেড: ২২,০০০ – ৫৩,০৬০ টাকা ➡️ ৩৩,০০০ – ৭৯,৫৯০ টাকা
- ১০ম গ্রেড: ১৬,০০০ – ৩৮,৬৪০ টাকা ➡️ ২৪,০০০ – ৫৭,৯৬০ টাকা
- ১১তম গ্রেড: ১২,৫০০ – ৩০,২৩০ টাকা ➡️ ১৮,৭৫০ – ৪৫,৩৪৫ টাকা
- ১২তম গ্রেড: ১১,৩০০ – ২৭,৩০০ টাকা ➡️ ১৬,৯৫০ – ৪০,৯৫০ টাকা
- ১৩তম গ্রেড: ১১,০০০ – ২৬,৫৯০ টাকা ➡️ ১৬,৫০০ – ৩৯,৮৮৫ টাকা
- ১৪তম গ্রেড: ১০,২০০ – ২৪,৬৮০ টাকা ➡️ ১৫,৩০০ – ৩৭,০২০… টাকা
- ১৫তম গ্রেড: ৯,৭০০ – ২৩,৪৯০ টাকা ➡️ ১৪,৫৫০ – ৩৫,২৩৫ টাকা
- ১৬তম গ্রেড: ৯,৩০০ – ২২,৪৯০ টাকা ➡️ ১৩,৯৫০ – ৩৩,৭৩৫ টাকা
- ১৭তম গ্রেড: ৯,০০০ – ২১,৮০০ টাকা ➡️ ১৩,৫০০ – ৩২,৭০০ টাকা
- ১৮তম গ্রেড: ৮,৮০০ – ২১,৩১০ টাকা ➡️ ১৩,২০৫ – ৩১,৯৬৫ টাকা
- ১৯তম গ্রেড: ৮,৫০০ – ২০,৫৭০ টাকা ➡️ ১২,৭৫০ – ৩০,৮৫৫ টাকা
- ২০তম গ্রেড: ৮,২৫০ – ২০,০১০ টাকা ➡️ ১২,৩৭৫ – ৩০,০১৫ টাকা
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতামত
অর্থনীতিবিদদের মতে, ৩৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য অর্থনীতিতে যুক্ত হলে তা সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি টিসিবি-র মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম জোরদার করা, কঠোর বাজার মনিটরিং এবং বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন করা জরুরি। অন্যথায়, কর্মচারীরা যে ৫০% বা শতভাগ বেতন বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছেন, তা কেবলই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে।


