আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬ : পণ্য-সেবা, ঠিকাদারি ও সম্পত্তি লেনদেনে নতুন হার; কর কর্তন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

দেশে আয়কর আদায় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করার লক্ষ্যে সরকার উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬ জারি করেছে। নতুন বিধিমালায় ঠিকাদারি বিল, পণ্য সরবরাহ, বিভিন্ন ধরনের সেবা, কমিশন, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা, আমদানি, সম্পত্তি হস্তান্তরসহ বহু খাতে উৎসে কর কর্তন ও সংগ্রহের হার বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের ৫ জুলাই প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় বিধিমালাটি প্রকাশ করা হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারার ক্ষমতাবলে প্রণীত নতুন বিধিমালা অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ৬৮ পৃষ্ঠার এই বিধিমালায় উৎসে কর কর্তন ও সংগ্রহের ক্ষেত্র, হার, কর পরিশোধের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন বিশেষ পরিস্থিতির বিধান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

ঠিকাদার ও পণ্য সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে উৎসে করের নতুন হার

নতুন বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের হার নির্ধারণ। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৮৯-এর অধীন বিভিন্ন পণ্য ও সরবরাহের প্রকৃতি অনুযায়ী আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

এমএস বিলেট উৎপাদনে নিয়োজিত শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয়ভাবে ক্রয়কৃত এমএস স্ক্র্যাপ সরবরাহে উৎসে করের হার ০.৫ শতাংশ। পেট্রোলিয়াম তেল ও লুব্রিকেন্ট বিপণনে নিয়োজিত তেল বিপণন কোম্পানি কর্তৃক তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে ০.৬ শতাংশ এবং ডিলার বা এজেন্টের মাধ্যমে তেল সরবরাহে ১ শতাংশ কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।

ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, মাছ, মাংস, ডাল, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, ভোজ্যতেল, চিনি, বীজ, পাট, তুলা, সরিষা, কাঁচা চা-পাতা, ডিম, শাকসবজি, তরল দুধ, পোলট্রি ফিড, মাশরুম, মধু, গুড়, কাঁচা চামড়া, জৈব সার ও জৈব কীটনাশকসহ তালিকাভুক্ত কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ০.৫ শতাংশ

স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার ও রত্ন-হীরক সরবরাহে ০.৫ শতাংশ, সুতা সরবরাহে ১ শতাংশ, সব ধরনের ফল সরবরাহে ২ শতাংশ এবং শতভাগ রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের সাব-কন্ট্রাক্টে ১ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে।

এমএস বিলেট ব্যতীত সিমেন্ট, লোহা বা লৌহজাত পণ্য ও ফেরো অ্যালয় পণ্য সরবরাহে উৎসে কর ২ শতাংশ। তেল শোধনাগার কার্যক্রমে নিয়োজিত কোম্পানি কর্তৃক তেল সরবরাহে ১ শতাংশ, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ক্ষেত্রে ০.৬ শতাংশ হারে কর কর্তনের বিধান রয়েছে।

সাধারণ সরবরাহ ও নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কর

বিধিমালায় কিছু পণ্য ও কাজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রসেস বা কনভারশন, পূর্তকাজ, নির্মাণ, প্রকৌশল ও সমজাতীয় কাজে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ

সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুল শিল্পে তামাকজাত কাঁচামাল সরবরাহে উৎসে করের হার ১০ শতাংশ

অন্যদিকে তালিকাভুক্ত বিশেষ সরবরাহের বাইরে সাধারণ পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।

সেবা খাতে ব্যাপকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে উৎসে করের হার

নতুন বিধিমালায় বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সময় উৎসে কর কর্তনের বিস্তারিত হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপদেষ্টা বা পরামর্শক ফি এবং পেশাদার সেবার ক্ষেত্রে সেবাদাতা স্বাভাবিক ব্যক্তি হলে ১৫ শতাংশ এবং স্বাভাবিক ব্যক্তি ব্যতীত অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৭.৫ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য হবে।

কারিগরি সেবা, টেকনিক্যাল নো-হাউ বা কারিগরি সহায়তা ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যক্তির জন্য ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্লিনিং, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, জনবল সরবরাহ, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সির ক্ষেত্রে কমিশনের ওপর ১০ শতাংশ অথবা মোট বিলের ওপর ১ শতাংশ হারে কর কর্তনের বিধান রয়েছে।

ক্যাটারিং, জনসংযোগ, ইভেন্ট পরিচালনা, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা, কুরিয়ার সার্ভিস, প্যাকিং ও শিফটিংসহ একই ধরনের সেবার মোট বিলের ওপর ২ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য হবে।

ইন্টারনেট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা ও ডিজিটাল খাতও করের আওতায়

ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় উৎসে কর কর্তনের বিষয়টি নতুন বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইন্টারনেট সেবা বিলের ওপর ৫ শতাংশ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্সি বা চ্যানেল পার্টনারকে দেওয়া কমিশনের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসায় কমিশন বা কমিশন ব্যতীত গ্রস বিলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ১ শতাংশ উৎসে কর প্রযোজ্য।

বিদ্যুৎ সংস্থার নির্দিষ্ট হুইলিং চার্জ বাদে মোট বিলের ওপর ৩ শতাংশ উৎসে কর এবং তালিকাভুক্ত অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ১০ শতাংশ হারে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।

আমদানি ও অনিবাসীর আয়েও উৎসে কর

বিধিমালায় আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর পরিশোধের পদ্ধতি নির্ধারণের পাশাপাশি অনিবাসীদের বাংলাদেশ থেকে অর্জিত আয়ের ওপর উৎসে করের বিস্তারিত হার রাখা হয়েছে।

অনিবাসী ব্যক্তিকে উপদেষ্টা বা পরামর্শক ফি, পেশাদার সেবা ও কারিগরি সেবার অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর প্রযোজ্য হতে পারে।

আর্কিটেকচার, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, ফ্যাশন ডিজাইন বা প্রসেস ডিজাইনের বিলের ওপর ১৫ শতাংশ, স্যাটেলাইট বা এয়ারটাইম ব্যবহার বাবদ ভাড়া বা অন্যান্য অর্থ পরিশোধে ২০ শতাংশ, আইন সেবা ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেবায় ২০ শতাংশ, কমিশনের ওপর ১৫ শতাংশ, রয়্যালটি ও লাইসেন্স ফিতে ২০ শতাংশ, বিজ্ঞাপন সম্প্রচারে ১৫ শতাংশ এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণ ও ডিজিটাল মার্কেটিং বিলের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে করের বিধান রাখা হয়েছে।

সম্পত্তি কেনাবেচায় রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বাধ্যতামূলক

নতুন বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্লোর স্পেস হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর পরিপালন কঠোর করা।

সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় ভূমি, স্থাপনা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট অথবা ফ্লোর স্পেস বিক্রি, হস্তান্তর, বায়নানামা বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধনের সময় দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বা Proof of Submission of Return (PSR) উপস্থাপন করতে হবে

এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর দলিল নিবন্ধনের আগেই পৃথক পৃথক এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে

তবে জাতিসংঘ বা এর অঙ্গসংস্থা, বিদেশি দূতাবাস বা মিশনের সম্পত্তি হস্তান্তর, নির্দিষ্ট না-দাবি দলিল, বণ্টননামা, ওয়াক্‌ফ বা দেবোত্তর দান এবং বিনিময়মূল্যহীন কিছু দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে উৎসে কর সংগ্রহের ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

কর কর্তনে ভুল হলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

বিধিমালায় উৎসে কর কর্তনযোগ্য অর্থের ওপর যথাযথ হারে কর কাটা এবং সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়া হয়েছে।

কোনো ক্ষেত্রে কর কম কর্তন, কর্তন না করা অথবা প্রযোজ্য অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিলে আয়কর আইন অনুযায়ী দায় সৃষ্টি হতে পারে। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার, সরবরাহকারী ও সেবা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের ধরন অনুযায়ী সঠিক হারে উৎসে কর কর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যবসা ও কর ব্যবস্থাপনায় কী প্রভাব পড়বে

বিশ্লেষণে দেখা যায়, উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬ শুধু করের হার নির্ধারণের একটি বিধিমালা নয়; বরং দেশের ব্যবসায়িক লেনদেনকে আরও বেশি কর প্রশাসনের নজরদারির আওতায় আনার একটি বিস্তৃত কাঠামো।

বিশেষ করে পণ্য সরবরাহ ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক হার নির্ধারণ করায় হিসাবরক্ষণ বিভাগ ও কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে লেনদেনের প্রকৃতি আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে।

অন্যদিকে সম্পত্তি হস্তান্তরে দাতা ও গ্রহীতার রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা এবং কর এ-চালানে জমার বিধান কর ফাঁকি কমানো ও করদাতার সংখ্যা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিজিটাল সেবা, ইন্টারনেট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল মার্কেটিং, বিজ্ঞাপন, কমিশন, রয়্যালটি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধের মতো খাতগুলোতে সুস্পষ্ট করহার নির্ধারণ করায় দেশের দ্রুত সম্প্রসারণশীল ডিজিটাল অর্থনীতিও আরও বেশি উৎসে কর ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।

সব মিলিয়ে উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬ কার্যকর হওয়ার ফলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, সরবরাহকারী, সেবাদাতা, সম্পত্তি ক্রেতা-বিক্রেতা এবং অনিবাসীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নতুন করহার ও বিধান সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। ভুল হারে কর কর্তন বা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ না করলে করদায় ও আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *