জাতীয় পতাকা উত্তোলনে অবহেলা ২০২৬ : প্রধান শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত, দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ৬৬ নম্বর সবুজ গোয়ালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যালয় চলাকালীন টানা কয়েক দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ওয়ারেসা বানুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে রংপুর বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালক (প্রাথমিক শিক্ষা) মো. আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিদ্যালয়ে প্রতিদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কাজ দপ্তরি, অফিস সহায়ক বা অন্য কোনো কর্মচারী সম্পাদন করলেও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে কেন প্রধান শিক্ষককেই সাময়িক বরখাস্ত করা হলো?
সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও প্রশাসনিক দায়িত্বের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের ওপর বর্তায়। ফলে কোনো অধস্তন কর্মচারী সরাসরি পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করলেও সেই কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা তদারকির দায় থেকে প্রতিষ্ঠানপ্রধান মুক্ত হন না।
অফিস আদেশে যা বলা হয়েছে
প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের জারি করা অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার ৬৬ নম্বর সবুজ গোয়ালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওয়ারেসা বানুর বিরুদ্ধে বিদ্যালয় চলাকালীন প্রায় ১০ দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের আওতাভুক্ত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ১২(১) অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক ওয়ারেসা বানুকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্তকালীন তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি বর্তমান ঠিকানার বাইরে গমন বা অবস্থান করতে পারবেন না।
সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর শিক্ষা বিভাগের তদন্তে জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ে টানা ১৭ দিন পতাকা উত্তোলন না হওয়ার অভিযোগের কথা বলা হলেও সাময়িক বরখাস্তের অফিস আদেশে প্রায় ১০ দিন পতাকা উত্তোলন না করার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পতাকা দপ্তরি উত্তোলন করলেও প্রধান শিক্ষক কেন দায়ী?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাস্তবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কাজ অনেক ক্ষেত্রে দপ্তরি কাম প্রহরী, অফিস সহায়ক কিংবা প্রধান শিক্ষকের নির্দেশে অন্য কোনো কর্মচারী সম্পাদন করে থাকেন।
কিন্তু কোনো কর্মচারীকে একটি কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব দেওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের প্রশাসনিক ও তদারকি দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে।
একজন প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান। বিদ্যালয় যথাসময়ে খোলা, পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তদারকির দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের।
অর্থাৎ, পতাকার রশি টেনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কাজটি দপ্তরি বা অন্য কর্মচারী করতে পারেন; কিন্তু প্রতিদিন যথাযথ নিয়মে পতাকা উত্তোলন নিশ্চিত করার প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে প্রধান শিক্ষকের ওপর বর্তায়।
এ কারণেই কোনো অধস্তন কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান বিষয়টি প্রতিরোধ বা সংশোধনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রধান শিক্ষকও প্রশাসনিক দায় এড়াতে পারেন না।
দপ্তরি বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
এ ক্ষেত্রেই ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে।
যদি বিদ্যালয়ের কোনো নির্দিষ্ট দপ্তরি, অফিস সহায়ক বা কর্মচারীর ওপর প্রতিদিন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব লিখিতভাবে বা প্রতিষ্ঠিত কর্মবণ্টনের মাধ্যমে অর্পিত হয়ে থাকে এবং তিনি দায়িত্ব পালন না করে থাকেন, তাহলে তাঁর ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
কিন্তু প্রকাশিত অফিস আদেশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরি বা অন্য কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
এর অর্থ এই নয় যে অধস্তন কর্মচারী কোনো অবস্থাতেই দায়ী হতে পারেন না। বরং কার ওপর পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব অর্পিত ছিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কেন পতাকা উত্তোলন করেননি, প্রধান শিক্ষক বিষয়টি জানতেন কি না, জানার পর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না এবং বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় তদন্তে নির্ধারিত হতে পারে।
প্রকাশিত সংবাদে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে একাধিকবার জানানো হলেও তিনি গুরুত্ব দেননি। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষক ওয়ারেসা বানু দাবি করেছিলেন, পতাকা স্ট্যান্ড নষ্ট থাকায় পতাকা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি এবং কিছুদিন পতাকা উত্তোলনে বিরতি ছিল। পরবর্তী তদন্তে জাতীয় পতাকা উত্তোলন না হওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
সাময়িক বরখাস্ত মানেই চাকরি থেকে চূড়ান্ত বরখাস্ত নয়
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রধান শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এটি চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করার শাস্তি নয়।
সাময়িক বরখাস্ত মূলত একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা। অভিযোগের প্রকৃতি, বিভাগীয় কার্যক্রম এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থ বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ কোনো সরকারি কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারে।
পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় কার্যক্রম শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী শাস্তি হতে পারে। আবার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারও হতে পারে।
জাতীয় পতাকা উত্তোলন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়
সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, জাতীয় পরিচয় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও নাগরিক মূল্যবোধ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিনের পর দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন না হওয়ার অভিযোগ প্রশাসনিক তদারকির দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
বিদ্যালয়ে কে নিজ হাতে পতাকা উত্তোলন করেন, সেটি দায়িত্ব নির্ধারণের একটি অংশ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব হলো—সরকারি বিধিবিধান ও নির্দেশনা অনুসারে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা।
দায় কি শুধু প্রধান শিক্ষকের?
এই ঘটনায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জবাবদিহির স্বার্থে সংশ্লিষ্ট অন্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব কার ছিল, দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা জানতেন কি না, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বা শিক্ষা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকিতে বিষয়টি আগে কেন ধরা পড়েনি—এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি বিদ্যালয়ে টানা কয়েক দিন জাতীয় পতাকা উত্তোলন না হওয়ার ঘটনা একজন ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, জাতীয় পতাকা দপ্তরি বা অন্য কোনো কর্মচারী সরাসরি উত্তোলন করলেও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে প্রধান শিক্ষক সার্বিক তদারকির দায় বহন করেন। এ কারণেই অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারীর অবহেলা প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই।



