নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্তের পথে সরকার: আজ বুধবারের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা
সরকারি চাকরিজীবী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য নতুন বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে যাচ্ছে। জাতীয় বেতন কমিশন–২০২৫-এর সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির ষষ্ঠ সভা আগামীকাল বুধবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো সংক্রান্ত সুপারিশের খসড়া চূড়ান্ত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।
উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হবে বৈঠক
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় এই সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, আইন সচিব, প্রতিরক্ষা সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবা সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যরা অংশ নেবেন।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এসব কর্মকর্তার উপস্থিতি থেকেই বোঝা যাচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পাঁচ দফা আলোচনার পর ষষ্ঠ বৈঠক
কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে পাঁচটি বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য, মূল্যস্ফীতির প্রভাব, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী আর্থিক সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবারের বৈঠকে এসব আলোচনার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত সুপারিশ চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হবে, যাতে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তা প্রতিফলিত হয়।
নিম্ন গ্রেডে বেশি সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত
সর্বশেষ ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনা হয়। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বৃদ্ধি না করে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রাথমিক আলোচনায় যে কাঠামো উঠে এসেছে, তাতে—
- ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি ও পরবর্তী মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত হার নির্ধারিত হবে।
শুধু বেতন নয়, ভাতা ও পেনশনেও আসতে পারে পরিবর্তন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন আর্থিক সুবিধারও পুনর্বিন্যাসের বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বাড়িভাড়া ভাতা
- চিকিৎসা ভাতা
- যাতায়াত ভাতা
- অন্যান্য ভাতার কাঠামো
- পেনশন সুবিধা
- অবসর-পরবর্তী আর্থিক সুবিধা
বিশেষ করে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সুপারিশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে।
এরপর কী হবে?
ষষ্ঠ বৈঠকে সুপারিশ চূড়ান্ত হলে তা নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব হিসেবে প্রস্তুত করা হবে।
এরপর সম্ভাব্য প্রক্রিয়া হবে—
- সচিব কমিটি চূড়ান্ত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেবে।
- আগামী সপ্তাহে বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।
- মন্ত্রিসভা প্রয়োজন হলে সুপারিশে সংযোজন, বিয়োজন বা সংশোধন করতে পারবে।
- অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
- প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে।
প্রত্যাশায় সরকারি চাকরিজীবীরা
দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বর্তমান বেতন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা এমন একটি বেতন কাঠামো প্রত্যাশা করছেন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এখন সরকারি চাকরিজীবীদের নজর বুধবারের বৈঠকের দিকে। কারণ এই বৈঠকের সিদ্ধান্তই দেশের লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভবিষ্যৎ বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধার রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।



