৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি : মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর গেজেট, কার্যকর ধরা হবে ১ জুলাই থেকেই

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে শেষ সময়ের কারিগরি ও নীতিগত প্রস্তুতি চলছে। সচিব কমিটির পর্যালোচনা শেষে বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর ধরা হবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে।

শেষ পর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতি

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে সচিব কমিটি আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পে-স্কেলের আর্থিক, প্রশাসনিক ও আইনগত বিষয়গুলো চূড়ান্তভাবে পর্যালোচনা করবে। এরপর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে যাবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে গেজেট প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় বিধি ও এসআরও (Statutory Regulatory Order) জারির কাজও এগিয়ে নিচ্ছে।

ধাপে ধাপে নাকি একসঙ্গে—সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা

নতুন পে-স্কেল একবারে কার্যকর হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে—এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শুরুতে তিন ধাপে এবং পরে দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব এলেও জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি বিষয়টি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

এ কারণে মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা একই সঙ্গে কার্যকর হবে নাকি আলাদা সময়ে বাস্তবায়ন হবে—সেটিও এখন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

নিম্ন গ্রেডে বেশি সুবিধার সুপারিশ

সর্বশেষ পর্যালোচনা বৈঠকে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন না বাড়িয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মতামত উঠে এসেছে।

সুপারিশ অনুযায়ী—

  • গ্রেড ১ থেকে ৯ পর্যন্ত মূল বেতন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বাড়তে পারে।
  • গ্রেড ১০ থেকে ২০ পর্যন্ত ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
  • কিছু আলোচনায় সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব

বর্তমান অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী—

  • সর্বনিম্ন (২০তম গ্রেড) মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা
  • সর্বোচ্চ (১ম গ্রেড) মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা

প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে—

  • সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন ১,৬০,০০০ টাকা

এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমে ১:৮-এ নেমে আসবে।

শুধু বেতন নয়, বদলাবে ভাতার কাঠামোও

নতুন পে-স্কেলে শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

আলোচনায় থাকা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • বৈশাখী ভাতা: ২০% থেকে ৫০%
  • টিফিন ভাতা: ২০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা
  • শিক্ষা ভাতা: প্রতি সন্তান ৫০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা (সর্বোচ্চ দুই সন্তান)
  • বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতার নতুন কাঠামো

তবে এসব এখনো সুপারিশ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই প্রকৃত হার নির্ধারিত হবে।

মূল বেতন আগে, ভাতা পরে—এমন প্রস্তাবও আলোচনায়

পর্যালোচনা কমিটির আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে—

  • ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা
  • ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা

যদিও এটিও এখনও চূড়ান্ত নয় এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা

বর্তমানে দেশে প্রায়—

  • ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী
  • ৯ লাখ পেনশনভোগী

রয়েছেন।

বর্তমান বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগের পে-স্কেলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীদের মধ্যে বৈষম্য ও অসন্তোষের অভিযোগ ওঠে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

এবার সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই প্রতিটি সুপারিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে, যাতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর কোনো শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ না ওঠে।

পৃথক প্রজ্ঞাপন পাবে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনও প্রস্তুত হয়েছে।

কমিশনের পটভূমি

সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

পরে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আর্থিক, প্রশাসনিক ও আইনগত দিক বিশ্লেষণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিই বর্তমানে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তুতের কাজ করছে।

বিশ্লেষণ

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিশেষ করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে কি না, মূল বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর হবে কি না এবং কোন গ্রেডে কত শতাংশ বৃদ্ধি চূড়ান্ত হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।

ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে। সেখানে অনুমোদন মিললেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *