১৫ মাস অর্জিত ছুটি জমা থাকলে বছরে একাধিকবার ২৮ দিনের ছুটি নেওয়া যাবে? যা বলছে সরকারি বিধি
সরকারি চাকরিতে অনেক কর্মচারীর ছুটি হিসাবে দীর্ঘদিনের অর্জিত ছুটি জমা থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই ছুটির পরিমাণ ১০–১৫ মাস বা তারও বেশি বলে হিসাব দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—১৫ মাস অর্জিত ছুটি জমা থাকলে কি বছরে একাধিকবার ২৮ দিন করে অর্জিত ছুটি নেওয়া যাবে?
বিধিবিধান বিশ্লেষণ করলে এর উত্তর হলো—ছুটি জমা থাকলেই নিজের ইচ্ছামতো ২৮ দিন করে বারবার ছুটি নেওয়া যায় না। তবে প্রাপ্যতা, ছুটির ধরন, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং দাপ্তরিক প্রয়োজন বিবেচনায় একাধিকবার অর্জিত ছুটি নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
ছুটি জমা থাকা আর ছুটি পাওয়ার অনুমোদন—এক বিষয় নয়
সরকারি চাকরিতে ছুটি অর্জন করা হয় দায়িত্ব পালন বা ডিউটির মাধ্যমে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রকাশিত সরকারি বিধি ও নথিতে অর্জিত ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও সরকারি কর্মচারীদের ছুটি-সংক্রান্ত বিধি ও আদেশ প্রকাশ করে থাকে।
অর্থাৎ, কোনো কর্মচারীর ছুটির হিসাবে ১৫ মাস ছুটি দেখা গেলেও তিনি যখন খুশি ২৮ দিন বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের ছুটি ভোগ করতে পারবেন—এমন স্বয়ংক্রিয় অধিকার নেই।
ছুটি ‘জমা’ থাকা মানেই তা চাইলেই ভোগ করার নিশ্চয়তা নয়। দাপ্তরিক প্রয়োজন, জনস্বার্থ, বিকল্প দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও বিবেচ্য।
তাহলে বছরে একাধিকবার ২৮ দিনের ছুটি নেওয়া যাবে?
নীতিগতভাবে একই বছরে একাধিকবার অর্জিত ছুটির আবেদন করা অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিবার ছুটির জন্য আলাদা অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রাপ্য ছুটির হিসাব ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।
তাই—
- ২৮ দিন একবার নেওয়ার পর আবার ২৮ দিনের আবেদন করা যেতে পারে;
- তবে দ্বিতীয়বার ছুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাপ্য বা নিশ্চিত নয়;
- ছুটির হিসাব, ছুটির ধরন ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন;
- অফিসের কাজের স্বার্থে কর্তৃপক্ষ ছুটি কমিয়ে দিতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে;
- নির্দিষ্ট ‘প্রতি বছর ২৮ দিন করে যতবার ইচ্ছা’—এমন সাধারণ নিয়ম বলা ঠিক হবে না।
সরকারি দপ্তরগুলোতে বাস্তবেও অর্জিত ছুটি মঞ্জুরের পৃথক অফিস আদেশ প্রকাশিত হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/দপ্তর কর্মচারীদের অর্জিত ছুটি মঞ্জুরের আদেশ প্রকাশ করেছে।
১৫ মাস ছুটি জমা থাকার বিষয়টি কীভাবে বুঝতে হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘১৫ মাস অর্জিত ছুটি’ বলতে কোন ধরনের ছুটি এবং কোন হিসাব বোঝানো হচ্ছে তা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরির ছুটি ব্যবস্থায় পূর্ণ বেতন/গড় বেতন ও অর্ধ-বেতনভিত্তিক ছুটির আলাদা হিসাব ও সীমা রয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সরকারি নিয়মসংক্রান্ত প্রকাশনায় Prescribed Leave Rules, 1959-এর অধীনে অর্জিত ছুটি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে নির্দিষ্ট শর্তে দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে অর্জিত ছুটি জমা হয় এবং সাধারণভাবে জমার সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে।
তাই কারও হিসাবের খাতায় ১৫ মাস দেখা গেলে সেটি সরাসরি ‘১৫ মাস পূর্ণ বেতনের অর্জিত ছুটি’ ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ছুটির হিসাবের ধরন, পূর্ণ/অর্ধ বেতনভিত্তিক ছুটি এবং অবসরকালীন ছুটির হিসাব আলাদাভাবে দেখতে হবে।
PRL-এর সময় ছুটি কম থাকলে কী হবে?
এটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকারি চাকরিতে PRL বা Post-Retirement Leave বর্তমানে আইনে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। Public Servants (Retirement) Act, 1974-এর ধারা ৭ অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারী অবসরের সময় যতটুকু PRL প্রাপ্য, তা পেতে পারেন এবং এর মেয়াদ এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। একই আইনে ‘Leave Preparatory to Retirement’ শব্দটিকে ‘Post-retirement leave’ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
সুতরাং PRL-এর সময় প্রয়োজনীয় ছুটি-ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত ছুটি না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১২ মাস PRL পাওয়া যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। কর্মচারীর প্রকৃত ছুটির প্রাপ্যতা ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী PRL নির্ধারিত হবে।
ঐতিহাসিক সরকারি গেজেটেও দেখা যায়, অবসরের আগে কোনো কোনো কর্মচারীকে ছয় মাস গড় বেতনে এবং পরবর্তী সময়ে অর্ধ-গড় বেতনে ছুটি দিয়ে অবসরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
অর্জিত ছুটি কর্মচারীর হিসাবের একটি প্রাপ্যতা হলেও তা ‘যখন ইচ্ছা তখন ছুটি নেওয়ার অবাধ অধিকার’ নয়। ছুটি মঞ্জুরের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।
তাই ১৫ মাস ছুটি জমা থাকলে বছরে একাধিকবার ২৮ দিনের ছুটির আবেদন করা যেতে পারে, কিন্তু প্রতিবারই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং প্রযোজ্য ছুটির বিধি মানতে হবে। একইভাবে, PRL-এর সময় ছুটি কম থাকলে পুরো এক বছর PRL পাওয়ার বিষয়টিও ছুটির প্রকৃত প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করবে।
সারকথা: ‘ছুটি জমা আছে, তাই ২৮ দিন করে বারবার ছুটি নিতেই হবে/দিতে হবে’—এমন নিয়ম নেই; বরং ‘ছুটি প্রাপ্য + বিধি অনুযায়ী আবেদন + ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন’—এই তিনটি বিষয়ই মূল।



