বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

উচ্চতর গ্রেড বাদ পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকায় উচ্চতর গ্রেডই ছিল দীর্ঘ চাকরিজীবনে আর্থিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ; সুযোগটি বাতিল না করার দাবি

নবম জাতীয় বেতন স্কেল প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এ সুযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশঙ্কা, চূড়ান্ত বেতন কাঠামোতে উচ্চতর গ্রেডের ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হলে সীমিত পদোন্নতির সুযোগ থাকা নন-ক্যাডারদের দীর্ঘ চাকরিজীবনে আর্থিক অগ্রগতির পথ আরও সংকুচিত হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব আশিকুল ইসলাম এক বিবৃতিতে উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পে-কমিশনের সুপারিশে একই পদে পদোন্নতি ছাড়াই চাকরির পাঁচ বছর পূর্তি এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে ষষ্ঠ বছরে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার সুপারিশ থাকার কথা জানা যাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত পে-স্কেলে এই সুবিধা থাকবে কি না, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় উদ্বেগের বিষয়।

কেন নন-ক্যাডারদের ওপর প্রভাব বেশি পড়তে পারে

নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ এমন পদে কর্মরত, যেখানে সাংগঠনিক কাঠামো ও পদসংখ্যার কারণে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে একই পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে হয় অনেককে। এ অবস্থায় উচ্চতর গ্রেড শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি দীর্ঘ চাকরিজীবনে আর্থিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

বর্তমান ব্যবস্থাতেও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নজির রয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন দপ্তরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২৯ জন ৭ম গ্রেডভুক্ত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে শর্তসাপেক্ষে ৬ষ্ঠ গ্রেডে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে।

এ ছাড়া সরকারি গেজেটেও দেখা যায়, পদোন্নতি ছাড়া একই পদে দীর্ঘ সময় চাকরি করার পর নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার নজির রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি গেজেটে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ৯ম গ্রেডের সহকারী পরিচালকদের ১০ বছর পূর্তিতে ৮ম গ্রেড দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

অর্থাৎ, উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি নন-ক্যাডারদের চাকরির কাঠামোর সঙ্গে বাস্তবভাবেই সম্পর্কিত। ফলে ভবিষ্যৎ বেতন কাঠামো থেকে এ সুবিধা বাদ গেলে এর প্রভাব কেবল মাসিক বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

‘পাঁচ বছর পূর্তির পর ষষ্ঠ বছরে’ উচ্চতর গ্রেডের দাবি

আশিকুল ইসলামের বক্তব্যে যে প্রস্তাবের কথা উঠে এসেছে, তার মূল বিষয় হলো—একই পদে কর্মরত থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে ষষ্ঠ বছরে উচ্চতর গ্রেড প্রদান।

এই ব্যবস্থার যুক্তি হলো, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী একই পদে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করলেও যদি পদোন্নতির সুযোগ না থাকে, তাহলে তাঁর অভিজ্ঞতা ও চাকরির মেয়াদের আর্থিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। পদোন্নতি না হলেও নির্দিষ্ট সময় পর বেতন কাঠামোয় অগ্রগতির সুযোগ থাকলে দীর্ঘ চাকরিজীবনে কর্মীদের আর্থিক বৈষম্য কিছুটা কমানো সম্ভব।

তবে এই প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা যাচ্ছে না। পে-কমিশনের সুপারিশ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের পর্যালোচনা এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারিত হবে।

উচ্চতর গ্রেড বাদ গেলে কী হতে পারে

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উচ্চতর গ্রেড বাতিল হলে একই পদে দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন অগ্রগতির সুযোগ অনেকটাই নির্ভর করবে নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির ওপর।

কিন্তু যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত, সেখানে দীর্ঘ সময় একই পদে থাকলে আর্থিক অগ্রগতিও তুলনামূলকভাবে ধীর হতে পারে। বিশেষ করে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর ফলে একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন চাকরি করা দুই কর্মীর মধ্যে একজন যদি সাংগঠনিক কারণে পদোন্নতি পান এবং অন্যজন পদোন্নতির সুযোগ না পান, তাহলে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধার ব্যবধান বাড়তে পারে। এ কারণে উচ্চতর গ্রেডকে নন-ক্যাডারদের জন্য একটি ‘ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন’ বা আর্থিক অগ্রগতির বিকল্প পথ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সব সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আশিকুল ইসলাম।

তিনি অর্থমন্ত্রী ও অর্থ সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—চূড়ান্ত বেতন কাঠামো অনুমোদনের আগে নন-ক্যাডারদের বাস্তব চাকরি কাঠামো, পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে অবসরজীবনেও

উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি শুধু বর্তমান বেতন পাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বেতন কাঠামোর বিভিন্ন সুবিধা কর্মজীবনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের আর্থিক সুবিধা, অবসর-পরবর্তী পাওনা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সুবিধার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে—তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে ২০২৬ সালেও সরকারি চাকরিতে উচ্চতর বেতন স্কেলের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালে বিভিন্ন নন-ক্যাডার পদে উচ্চতর বেতন স্কেলের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে নন-ক্যাডার কাঠামোয় উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি যে এখনো প্রশাসনিক ও বেতন কাঠামোর একটি বাস্তব অংশ, তা বিভিন্ন সরকারি নথি থেকেও স্পষ্ট।

এখন নজর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় বেতন স্কেলে উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ থাকবে কি না—এটি এখন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। পে-কমিশনের সুপারিশে যদি সত্যিই পাঁচ বছর পূর্তির পর ষষ্ঠ বছরে নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়ে থাকে, তাহলে চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণের সময় সেটি বহাল রাখা হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংশ্লিষ্ট সংগঠনের দাবি, পদোন্নতির সীমিত সুযোগের বাস্তবতা বিবেচনায় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেডের ব্যবস্থা বাদ না দিয়ে বরং সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা উচিত।

কারণ একটি বেতন কাঠামোর সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান মাসের বেতন নির্ধারণ করে না; সেটি একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দীর্ঘ কর্মজীবনের আর্থিক অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ সুবিধা এবং অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তার ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর এখনকার প্রধান দাবি—উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ বহাল রাখা এবং চূড়ান্ত বেতন কাঠামোতে এ বিষয়ে স্পষ্ট, ন্যায়সংগত ও বাস্তবসম্মত বিধান নিশ্চিত করা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *