২০১৫ সালের পে-স্কেল ও ২০২৬-এর কঠিন বাস্তবতা: মানবেতর জীবন যাপন করছেন নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা
২০১৫ সাল থেকে ২০২৬—মাঝখানে এক দশকেরও বেশি সময়ের ব্যবধান। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের মাথাপিছু আয় ও জিডিপি বাড়লেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো স্থবির হয়ে আছে ২০১৫ সালের পুরনো স্কেলেই। ফলে আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি আর লাগামহীন বাজারদরের যাঁতাকলে পড়ে দেশের কয়েক লাখ সরকারি কর্মচারীর জীবন আজ ওষ্ঠাগত। বিশেষ করে ১৮ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অবস্থা এখন চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে।
আয়-ব্যয়ের ভয়াবহ ফারাক: সংখ্যার আড়ালে কান্না ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী ১৮, ১৯ এবং ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন যথাক্রমে ৮,৮০০, ৮,৫০০ এবং ৮,২৫০ টাকা। বর্তমান বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সামান্য আয়ে একটি পরিবারের চারবেলার অন্ন সংস্থান করাও যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে বাসা ভাড়া, চিকিৎসা এবং সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো স্রেফ অলীক কল্পনা।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বাস্তবতা অনুযায়ী একজন সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর জীবনযাত্রার ন্যূনতম ব্যয় অন্তত ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে তারা যা পাচ্ছেন, তা দিয়ে মাসের অর্ধেক পার করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে এই শ্রেণির কর্মচারীরা এখন আক্ষরিক অর্থেই নিম্নবিত্ত বা চরম দরিদ্র শ্রেণির তালিকায় চলে এসেছেন।
মধ্যবিত্তের নিরাপত্তা এখন বিলাসিতা এক সময় ১৪ থেকে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীদের সমাজের মধ্যবিত্তের মেরুদণ্ড ভাবা হতো। কিন্তু বর্তমানে বাসা ভাড়া ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের সেই সামাজিক নিরাপত্তা ধসে পড়েছে। অন্যদিকে, ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড—যারা একসময় ‘স্বচ্ছল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তারাও এখন দৈনন্দিন হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বেতন না বাড়লেও জীবনযাত্রার প্রতিটি উপকরণের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে, যা মধ্যম ও উচ্চ-মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও সঞ্চয়হীন করে তুলছে।
পে-স্কেল আপডেট না হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব ১. সৎভাবে জীবন যাপনে বাধা: যখন বৈধ আয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটি পরোক্ষভাবে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করতে পারে। ২. মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি: আয়ের সাথে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা কর্মচারীদের মধ্যে চরম মানসিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যা তাদের কর্মদক্ষতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। ৩. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনিশ্চয়তা: সঠিক পুষ্টি এবং উন্নত শিক্ষার ব্যয় মেটাতে না পারায় কর্মচারীদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে।
কেন নতুন পে-স্কেল (৯ম পে-স্কেল) অনিবার্য? বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি ৫ বছর অন্তর বেতন কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না আসায় কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে ঠেকেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি চাকরি শুধু একটি দায়িত্ব পালন নয়, এটি একটি সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি হওয়া উচিত। বর্তমান বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি নিরসনে এবং জনসেবায় গতিশীলতা আনতে বাস্তবসম্মত ‘৯ম পে-স্কেল’ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।
উপসংহার দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলেন এই সরকারি কর্মচারীরা। অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই যুগে তাদের জীবনযাত্রার মান আজ নিম্নমুখী। রাষ্ট্র যদি তার কর্মচারীদের নূন্যতম সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে সুশাসনের ওপর। তাই ২০২৬ সালের কঠিন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে একটি নতুন ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি।


