পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

শ্বশুর মারা গেলে শাশুড়ি ১৯ হাজার টাকা পেনশন পাবেন, নাকি কম? সরকারি নিয়মে যা জানা জরুরি

স্বামী সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন এবং মৃত্যুর আগে মাসে ১৯ হাজার টাকা পেনশন পেতেন—এমন পরিস্থিতিতে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী কত টাকা পারিবারিক পেনশন পাবেন, তা নিয়ে অনেক পরিবারের মধ্যেই প্রশ্ন দেখা যায়। বিশেষ করে পেনশনভোগীর বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে পেনশনের মূল টাকা কমে যাবে কি না, চিকিৎসা ভাতা কত হবে এবং ৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা কীভাবে যুক্ত হবে—এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে আছে।

সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব বিষয়ের কয়েকটি আলাদা করে বুঝতে হবে।

বিধবা স্ত্রী আজীবন পারিবারিক পেনশন পেতে পারেন

সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের FAQ অনুযায়ী, মূল পেনশনারের স্ত্রী আজীবন পেনশনের আওতায় থাকতে পারেন। একইভাবে প্রতিবন্ধী সন্তানও নির্দিষ্ট শর্তে আজীবন পারিবারিক পেনশনের সুবিধা পেতে পারে।

আরেকটি সরকারি FAQ-তেও বলা হয়েছে, পেনশনারের স্ত্রী/স্বামী পুনর্বিবাহ না করার শর্তে আজীবন পারিবারিক পেনশন পাওয়ার যোগ্য। বিধবা পারিবারিক পেনশনারের ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত লাইভ ভেরিফিকেশনের জন্য নন-ম্যারেজ সার্টিফিকেটের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, স্বামীর মৃত্যুর পর যোগ্য বিধবা স্ত্রী পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন—এটি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি নয়, সরকারি পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যেও এর ভিত্তি রয়েছে।

১৯ হাজার টাকা থেকে ১৮ হাজার হয়ে যাবে—এমন দাবি কতটা সঠিক?

এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে।

কেউ কেউ বলছেন, স্বামীর বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে স্ত্রী ১৮ হাজার টাকা পাবেন এবং ৬৫ বছরের কম হলে ১৯ হাজার টাকা পাবেন। কিন্তু সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত FAQ-তে শুধু মৃত পেনশনারের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হওয়ার কারণে বিধবার মূল পারিবারিক পেনশন ১ হাজার টাকা কমে যাওয়ার কোনো সাধারণ নিয়ম উল্লেখ নেই। বরং সরকারি FAQ-তে পূর্ণ হারে আজীবন পারিবারিক পেনশনের কথা বলা হয়েছে।

তাই ‘শ্বশুরের বয়স ৬৫ বছরের বেশি ছিল, ফলে শাশুড়ির পেনশন ১৯ হাজার থেকে ১৮ হাজার হবে’—এ কথাকে সরাসরি সরকারি নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

তবে সঠিক অঙ্ক নির্ধারণের সময় মৃত পেনশনারের পেনশন স্যাংশন, নেট পেনশন, পারিবারিক পেনশন অনুমোদনের আদেশ এবং অন্য কোনো প্রাপ্য/কর্তন আছে কি না—এসব বিষয় দেখা প্রয়োজন।

৬৫ বছর বয়সের প্রভাব মূলত চিকিৎসা ভাতায়

৬৫ বছরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি মূল পেনশনের হার কমানোর চেয়ে চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি পেনশন-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, পেনশনার ৬৫ বছর পূর্ণ করলে মাসিক চিকিৎসা ভাতা ২ হাজার ৫০০ টাকা হয়।

সরকারি নির্দেশনায় আরও স্পষ্ট করা হয়েছে যে পারিবারিক পেনশনভোগীর চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমানে যিনি পেনশন গ্রহণ করছেন, তাঁর বয়স বিবেচনা করতে হবে; মৃত মূল পেনশনারের বয়স ধরে চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণ করা যাবে না।

অর্থাৎ, শ্বশুরের বয়স ৬৫ বছরের বেশি ছিল বলে শাশুড়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন—এমন নয়। শাশুড়ির নিজের বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে ২ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতার বিধান প্রযোজ্য হবে।

তাহলে ১৯ হাজার টাকা হলে হিসাব কী দাঁড়াতে পারে?

ধরা যাক, আপনার শ্বশুরের মৃত্যুর আগে প্রাপ্য নিট মাসিক পেনশন ছিল ১৯,০০০ টাকা এবং পারিবারিক পেনশনের অনুমোদনেও একই প্রাপ্যতা বহাল থাকে।

সেক্ষেত্রে মূল পেনশন ১৯,০০০ টাকা ধরে হিসাব হতে পারে। এর সঙ্গে বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতা যুক্ত হবে।

শাশুড়ির বয়স ৬৫ বছরের কম হলে

মূল পেনশন: ১৯,০০০ টাকা
চিকিৎসা ভাতা: ১,৫০০ টাকা

মোট: ২০,৫০০ টাকা—যদি ১৯ হাজার টাকা পুরোপুরি প্রাপ্য নিট পেনশন হিসেবে বহাল থাকে।

শাশুড়ির বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে

মূল পেনশন: ১৯,০০০ টাকা
চিকিৎসা ভাতা: ২,৫০০ টাকা

মোট: ২১,৫০০ টাকা—অন্যান্য কোনো কর্তন বা আলাদা প্রাপ্যতা না থাকলে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯ হাজার টাকা মূল/নিট পেনশন—কোনটি বোঝানো হয়েছে তা নিশ্চিত করা। কারণ পেনশনের হিসাবের বিভিন্ন উপাদান থাকতে পারে।

৫ শতাংশ সুবিধা নিয়ে যে কথাটি বলা হচ্ছে

অনেকেই বলেছেন, জুলাই থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৯,৯০০ টাকা হবে।

এখানে কিছুটা সংশোধন প্রয়োজন।

সরকারি আদেশ অনুযায়ী, পেনশনভোগীদের জন্য প্রতি বছর ১ জুলাই প্রাপ্য নিট পেনশনের ওপর ৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে, তবে তা ন্যূনতম ৫০০ টাকা।

তাই ১৯,০০০ টাকার ওপর সরল হিসাবে ৫ শতাংশ হলে—

১৯,০০০ × ৫% = ৯৫০ টাকা

অর্থাৎ,

১৯,০০০ + ৯৫০ = ১৯,৯৫০ টাকা।

তবে এটি ‘প্রতি বছর মূল পেনশনের স্থায়ী ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট’ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এটি নির্দিষ্ট সরকারি আদেশের আওতায় দেওয়া বিশেষ সুবিধা

আর বাস্তবে আপনার শাশুড়ির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পারিবারিক পেনশন অনুমোদনের তারিখ, প্রাপ্য নিট পেনশন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি হিসাবের ওপর।

‘পে স্কেল চালু হলে দ্বিগুণ পেনশন’—এটিও নিশ্চিত তথ্য নয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পে-স্কেল চালু হলে পেনশন দ্বিগুণ হবে—এমন মন্তব্য দেখা যায়। কিন্তু নতুন পে-স্কেল সম্পর্কে সরকারি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন ছাড়া এ ধরনের হিসাবকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া উচিত নয়।

পে-স্কেল পরিবর্তন হলে পেনশন কীভাবে পুনর্নির্ধারণ হবে, সেটি নির্ভর করবে সরকার কর্তৃক জারি করা চূড়ান্ত আদেশ ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ওপর।

শাশুড়ির বয়স ৫০ বছরের কম হলে পুনর্বিবাহের বিষয়টি কেন আসে?

বিধবা স্ত্রী আজীবন পারিবারিক পেনশন পেতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত পুনর্বিবাহ না করার শর্ত এবং নন-ম্যারেজ সার্টিফিকেট/লাইভ ভেরিফিকেশনের বিধান রয়েছে। সরকারি FAQ-তে বিধবা পারিবারিক পেনশনারের ক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত নন-ম্যারেজ সার্টিফিকেটের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

তাই ‘৫০ বছরের কম হলে অবশ্যই পেনশন বন্ধ হয়ে যাবে’—এভাবে বিষয়টি দেখা ঠিক নয়। বরং সংশ্লিষ্ট বয়স ও শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন দিতে হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

আপনার শ্বশুর মে মাসে মারা গেছেন এবং তিনি মৃত্যুর আগে ১৯,০০০ টাকা পেনশন পেতেন—এই তথ্যের ভিত্তিতে শুধু শ্বশুরের বয়স ৬৫ বছরের বেশি ছিল বলে শাশুড়ির মূল পেনশন ১৮,০০০ টাকা হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার যথেষ্ট সরকারি ভিত্তি পাওয়া যায় না।

মূল পেনশন কত হবে, সেটি পারিবারিক পেনশন মঞ্জুরির কাগজে নিশ্চিত হবে।

অন্যদিকে ৬৫ বছর বয়সের বিষয়টি চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে পারিবারিক পেনশনভোগী শাশুড়ির বয়স ৬৫ বছরের নিচে হলে চিকিৎসা ভাতা ১,৫০০ টাকা এবং ৬৫ বছর পূর্ণ হলে ২,৫০০ টাকা হওয়ার বিধান রয়েছে।

আর ৫ শতাংশের বিষয়টি মূল পেনশনের স্থায়ী বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নয়; সরকারি আদেশে এটি পেনশনভোগীদের জন্য ৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা হিসেবে নির্ধারিত।

তাই আপনার ক্ষেত্রে করণীয়

শাশুড়ির পেনশন চূড়ান্তভাবে কত হবে জানতে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস/পেনশন অফিস থেকে পারিবারিক পেনশন মঞ্জুরি আদেশ বা পেনশন পেমেন্ট অর্ডার (PPO)-এর অঙ্কটি দেখে নেওয়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

কারণ সেখানে মূল পেনশন, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য প্রাপ্যতা আলাদাভাবে উল্লেখ থাকবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ১৮ হাজার, ১৯ হাজার বা ১৯,৯৫০ টাকার হিসাব দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সারকথা: ১৯ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া মানেই শ্বশুরের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে শাশুড়ি ১৮ হাজার টাকা পাবেন—এ দাবি নিশ্চিত সরকারি নিয়ম নয়। ৬৫ বছর বয়সের প্রধান পার্থক্যটি চিকিৎসা ভাতায়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *