১২ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পর কি চাকরিতে ফেরা যাবে? আইন কী বলছে—জানুন বিস্তারিত
প্রায় তিন বছর চাকরি করার পর তিন দিনের নৈমিত্তিক ছুটি (CL) নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন একজন কর্মচারী। এরপর কেটে গেছে প্রায় ১২ মাস। এখন প্রশ্ন উঠেছে—এত দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকার পর তিনি কি আবার চাকরিতে যোগদান করতে পারবেন? অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আবেদন করলে কি চাকরি রক্ষা সম্ভব? নাকি কর্তৃপক্ষ চাইলে পুরো সময়টিকে বিনা বেতনের ছুটি হিসেবে মঞ্জুর করতে পারে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রশ্ন ঘিরে নানা মতামত দেখা গেলেও সংশ্লিষ্ট চাকরির ধরন, নিয়োগের শর্ত এবং প্রযোজ্য সার্ভিস রুলস না জেনে এককথায় উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দীর্ঘ অননুমোদিত অনুপস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
৬০ দিনের বেশি বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতি হলে কী হয়?
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, বিনা অনুমতিতে ৬০ দিন বা তার বেশি সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ‘পলায়ন (Desertion)’ হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান রয়েছে। অনুমোদিত ছুটি শেষ হওয়ার পরও পুনরায় অনুমতি না নিয়ে ৬০ দিন বা তার বেশি অনুপস্থিত থাকলেও একই বিষয় প্রযোজ্য হতে পারে।
অর্থাৎ, মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ নয়—টানা প্রায় ১২ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে বিষয়টি সাধারণ ছুটির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ৬০ দিন পার হলেই কোনো কর্মচারীর চাকরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেদিনই শেষ হয়ে যাবে। চাকরির ধরন ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতে পারে।
১২ মাস পর সরাসরি গিয়ে জয়েন করা যাবে?
কেবল অফিসে গিয়ে হাজির হলেই বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রথমেই দেখতে হবে—
- সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কোনো বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না;
- কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না;
- চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোনো আদেশ হয়েছে কি না;
- কর্মচারী এখনও চাকরিতে বহাল আছেন কি না;
- কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে তিনি কর্মরত—সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি নাকি বেসরকারি।
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে গুরুতর অভিযোগে আইন ও বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের দণ্ড হতে পারে।
কর্তৃপক্ষ চাইলে কি অনুপস্থিতির সময় বিনা বেতনের ছুটি করতে পারে?
কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের হাতে অননুমোদিত অনুপস্থিতির সময়কে পরবর্তীতে ‘অসাধারণ ছুটি’ বা Extraordinary Leave হিসেবে নিয়মিত করার সুযোগ থাকতে পারে।
বিদ্যমান সার্ভিস রুলসের বিভিন্ন সংস্করণ ও প্রযোজ্য বিধানে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট শর্তে পূর্ববর্তী অননুমোদিত অনুপস্থিতিকে অসাধারণ ছুটিতে রূপান্তর করতে পারেন। অসাধারণ ছুটি সাধারণত বেতনবিহীন ছুটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি কর্মচারীর স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়।
কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করবেন—
- অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ;
- কর্মচারীর আবেদন ও ব্যাখ্যা;
- চিকিৎসা বা অন্য প্রমাণপত্র;
- প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চাকরি বিধিমালা;
- চাকরির স্থায়িত্ব বা অস্থায়ী অবস্থান;
- দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় কোনো শৃঙ্খলাজনিত কার্যক্রম শুরু হয়েছিল কি না।
অর্থাৎ, কর্তৃপক্ষ চাইলে সুযোগ দিতে পারেন, আবার পরিস্থিতি গুরুতর মনে হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নিতে পারেন।
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কি এখন আবেদন করা যাবে?
এখানে সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা হলো প্রকৃত ও প্রমাণযোগ্য অসুস্থতা।
যদি সত্যিই দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সময়ের—
- চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র;
- হাসপাতালের ভর্তি ও ছাড়পত্র;
- পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট;
- চিকিৎসা সংক্রান্ত অন্যান্য নথি
সংযুক্ত করে কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত আবেদন করা যেতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে অসুস্থ না হয়েও পরে চাকরি রক্ষার জন্য মিথ্যা মেডিকেল কাগজপত্র তৈরি বা অসত্য তথ্য দেওয়ার চেষ্টা নতুন করে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, যা ঘটেছে, তার প্রকৃত কারণ উল্লেখ করেই যথাযথ আবেদন করা সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
‘৯০ দিনের বেশি অসুস্থ হলে মেডিকেল বোর্ডের সনদ’—সব চাকরিতে কি একই নিয়ম?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, টানা ৯০ দিনের বেশি অসুস্থ থাকলে অবশ্যই মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট লাগবে। কিন্তু সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন সিদ্ধান্ত এককথায় দেওয়া যায় না।
প্রতিষ্ঠানভেদে—
- সার্ভিস রুলস,
- মেডিকেল লিভের বিধান,
- মেডিকেল বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা,
- ছুটির সর্বোচ্চ সীমা
ভিন্ন হতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিধিমালায় দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা সনদ বা মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশের বিধান রয়েছে।
চাকরি স্থায়ী না অস্থায়ী—কেন গুরুত্বপূর্ণ?
চাকরি স্থায়ী, অস্থায়ী, শিক্ষানবিশ বা প্রবেশনকালীন—কোন অবস্থায় রয়েছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ চাকরির নিরাপত্তা, শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং চাকরি বহাল রাখার সুযোগ নিয়োগের শর্ত ও সংশ্লিষ্ট সার্ভিস রুলসের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে অস্থায়ী বা প্রবেশনকালীন কর্মচারীর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ধরন ভিন্ন হতে পারে। আবার স্থায়ী কর্মচারীর ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগে বিভাগীয় প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা
বাংলাদেশ শ্রম আইনভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সরকারি চাকরির বিধিমালা দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। শ্রম আইনে অনুমতি ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের বেশি অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে কর্মীকে ব্যাখ্যা ও চাকরিতে পুনরায় যোগদানের সুযোগ দিয়ে নোটিশ প্রদানের বিধান রয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে অনুপস্থিত কর্মীকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন বলে গণ্য করার বিধানও রয়েছে।
সুতরাং, সরকারি চাকরির ৬০ দিনের ‘পলায়ন’ সংক্রান্ত বিধান বেসরকারি চাকরিতে সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না।
এখন কী করা সবচেয়ে জরুরি?
যিনি প্রায় ১২ মাস ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন, তার জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত নিচের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—
১. আগে চাকরির বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করুন
অফিসে যোগাযোগ করে জেনে নিন—আপনার বিরুদ্ধে কোনো আদেশ, বিভাগীয় মামলা বা কারণ দর্শানোর নোটিশ হয়েছে কি না।
২. লিখিত আবেদন করুন
সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘ অনুপস্থিতির প্রকৃত কারণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরুন।
৩. প্রকৃত প্রমাণপত্র দিন
অসুস্থতা থাকলে চিকিৎসাসংক্রান্ত সত্য ও যাচাইযোগ্য নথি সংযুক্ত করুন।
৪. অনুপস্থিতির সময় নিয়মিত করার আবেদন করুন
প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী অর্জিত ছুটি, চিকিৎসাজনিত ছুটি বা কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় অসাধারণ/বিনা বেতনের ছুটি হিসেবে সময়টি সমন্বয়ের সুযোগ আছে কি না, তা আবেদনপত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে।
৫. বিভাগীয় মামলা থাকলে দ্রুত জবাব দিন
কোনো নোটিশ বা অভিযোগ থাকলে তা উপেক্ষা না করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়া জরুরি।
শেষ কথা
দুই বছর ১০ মাস চাকরি করার পর তিন দিনের CL নিয়ে প্রায় ১২ মাস অনুপস্থিত থাকলে ‘কিছু হয়নি, অসুস্থতা দেখিয়ে আবার জয়েন করলেই হবে’—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৬০ দিন বা তার বেশি অননুমোদিত অনুপস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগের পর্যায়ে পড়তে পারে।
তবে চাকরি যে অবশ্যই শেষ হয়ে গেছে—সেটিও কেবল অনুপস্থিতির সময়কাল শুনে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, ইতোমধ্যে নেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা, চাকরির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস রুলসই এখানে চূড়ান্তভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরামর্শ হলো—আর দেরি না করে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করুন, চাকরির বর্তমান অবস্থা জেনে প্রকৃত তথ্য ও প্রমাণপত্রসহ লিখিত আবেদন দিন। মিথ্যা অসুস্থতার কারণ তৈরি করার পরিবর্তে আইনসম্মত ও সত্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।


