জিপিএফের শুধু মূল টাকা ফেরত: স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে রক্ষিত জিপিএফ (GPF) হিসাবের অর্থ ফেরত প্রদান নিয়ে নতুন জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (CGA)। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভায় কর্মরত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জিপিএফ হিসাবে জমাকৃত অর্থের শুধুমাত্র মূল বা আসল টাকা ফেরত দেওয়ার লক্ষ্যে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে।
হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা এক পত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জিপিএফ হিসাবের তথ্য যাচাই করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মূল অর্থ ফেরত প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারা এই নির্দেশনার আওতায়?
নির্দেশনা অনুযায়ী, বিষয়টি মূলত যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—
- ইউনিয়ন পরিষদ;
- উপজেলা পরিষদ;
- জেলা পরিষদ;
- পৌরসভা।
তবে সব কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই অর্থ পাওয়ার আওতায় পড়বেন—এমনটি নয়। যেসব কর্মচারীর জিপিএফ হিসাবের অর্থ পূর্বে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে জমা ছিল, তাদের তথ্য যাচাই করে মূল বা আসল অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন নতুন করে তথ্য চাওয়া হলো?
হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জিপিএফ হিসাব দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব আইন, বিধি ও বিধিমালার অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।
কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এসব হিসাবের অর্থ সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে জমা ও হিসাব সংরক্ষণের কারণে এখন সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জমাকৃত অর্থের হিসাব যাচাই করে ফেরত প্রদানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এ কারণে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে সংরক্ষিত জিপিএফ হিসাব থেকে মূল/আসল অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের তথ্য নির্ধারিত ছকে পাঠাতে বলা হয়েছে।
ডিজিটাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টসদের কী করতে বলা হয়েছে?
নির্দেশনায় উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস এবং জেলা হিসাবরক্ষণ/জেলা অ্যাকাউন্টস অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাদেরকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জিপিএফ হিসাবের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী পাঠাতে হবে।
বিশেষভাবে বলা হয়েছে, ডিজিটাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস (DCA)-এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথ প্রত্যয়নসহ হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠাতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু একটি তালিকা পাঠালেই হবে না; তথ্যের সত্যতা যাচাই ও প্রত্যয়নের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
মূল অর্থের পরিমাণ আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে
নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তথ্য প্রেরণের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর জিপিএফ হিসাবে জমাকৃত মূল/আসল অর্থের পরিমাণ পৃথকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
এক্ষেত্রে কোনো ধরনের—
- মুনাফা;
- সুদ;
- বা অন্যান্য প্রাপ্য
অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।
অর্থাৎ, বর্তমান নির্দেশনার আওতায় হিসাব করা হবে কেবল কর্মচারীর জিপিএফ হিসাবে জমাকৃত প্রকৃত মূল অর্থ।
এটি কর্মচারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ অনেকেই জিপিএফ হিসাবের সঙ্গে সুদ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার বিষয়টি যুক্ত আছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। নতুন নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে মূল অর্থ ফেরতের বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
অর্থ ফেরতের আগে যেসব বিষয় যাচাই করা হবে
নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তথ্য যাচাই করতে হবে। এর মধ্যে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে।
১. কর্মচারীর জিপিএফ হিসাবে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ সঠিক কি না
সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নামে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা জিপিএফ হিসাবে জমা ছিল, তা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে সংরক্ষিত রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
২. আগে কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কেবল যে মূল অর্থ এখনও ফেরত দেওয়া হয়নি, সেটিই ফেরত প্রদানের জন্য বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ, কোনো কর্মচারী পূর্বে আংশিক বা সম্পূর্ণ অর্থ গ্রহণ করে থাকলে একই অর্থ পুনরায় পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
৩. একই বিষয়ে অন্য কোনো দাবি করা যাবে না
নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উল্লিখিত হিসাবের বিপরীতে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কাছে কোনো অতিরিক্ত দাবি বা অর্থ পরিশোধযোগ্য হবে না।
এর অর্থ হলো, বর্তমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
৪. আগে মূল অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে
সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পূর্বে হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে ওই জিপিএফ হিসাবের মূল বা আসল অর্থ গ্রহণ করেছেন কি না—সেটিও যাচাই করতে বলা হয়েছে।
এ যাচাইয়ের উদ্দেশ্য হলো একই ব্যক্তিকে একই জমার অর্থ দ্বিতীয়বার প্রদান ঠেকানো।
কর্মচারীদের এখন কী করা উচিত?
যেসব কর্মচারী মনে করেন যে, তাদের জিপিএফ হিসাবে পূর্বে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে অর্থ জমা ছিল, তাদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও হিসাবরক্ষণ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
বিশেষ করে কর্মচারীদের কাছে যদি পুরোনো—
- জিপিএফ হিসাব নম্বর;
- জমার রসিদ;
- কর্তনের তথ্য;
- বেতন বিলের কপি;
- পূর্ববর্তী হিসাব বিবরণী;
- অথবা জিপিএফ সংক্রান্ত অন্য কোনো নথি
থাকে, তাহলে সেগুলো সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অর্থ ফেরতের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি আবেদন করলেই অর্থ প্রদান করা হবে—এমন কোনো নির্দেশনা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ নেই। মূলত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে নির্ধারিত ছকে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রেরণের প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের আর্থিক হিসাব ব্যবস্থাপনা ও জিপিএফ সংক্রান্ত রেকর্ড বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়েছে। ফলে পুরোনো জমা, হিসাব সংরক্ষণ এবং অর্থ ফেরত নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে রক্ষিত পুরোনো জিপিএফ হিসাবগুলো যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের অবশিষ্ট মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি সুদ বা মুনাফাসহ পূর্ণ জিপিএফ সুবিধা পুনর্নির্ধারণের নির্দেশনা নয়; বরং বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে রক্ষিত সংশ্লিষ্ট জিপিএফ হিসাবের মূল/আসল অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের উদ্যোগ।
কীভাবে এগোবে পরবর্তী প্রক্রিয়া?
নির্দেশনা অনুযায়ী সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি হবে—
১. সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে জিপিএফ হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করা হবে;
২. কর্মচারীভিত্তিক জমার তথ্য যাচাই করা হবে;
৩. কত টাকা মূল অর্থ ফেরতযোগ্য, তা নির্ধারণ করা হবে;
৪. পূর্বে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে;
৫. নির্ধারিত ছক অনুযায়ী তথ্য প্রস্তুত করা হবে;
৬. যথাযথ প্রত্যয়নসহ হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে তথ্য পাঠানো হবে;
৭. যাচাই শেষে মূল অর্থ ফেরতের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেষ কথা
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অগ্রগতি। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার যেসব কর্মচারীর জিপিএফের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের রেকর্ডে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সরাসরি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তবে কর্মচারীদের মনে রাখতে হবে, বর্তমান নির্দেশনায় শুধুমাত্র মূল বা আসল অর্থ ফেরতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সুদ, মুনাফা বা অতিরিক্ত কোনো আর্থিক দাবির বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
এখন সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য যাচাই করে নির্ধারিত ছকে পাঠানোর ওপরই নির্ভর করবে পরবর্তী অর্থ ফেরত প্রক্রিয়ার গতি।
সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের তাই নিজেদের পুরোনো জিপিএফ সংক্রান্ত নথি ও তথ্য যাচাই করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।



