জিপিএফ (GPF) থেকে ঋণ উত্তোলন: বাড়তি এক কিস্তি বা লাভ কি সরকারি কোষাগারে যায়? জেনে নিন আসল হিসাব
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বা জিপি ফান্ড (GPF) বিপদের এক বিশ্বস্ত বন্ধু। তবে এই ফান্ড থেকে ফেরতযোগ্য অগ্রিম বা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়— “১ লাখ টাকা লোন নিলে কি ১ লাখ টাকাই ফেরত দিতে হবে, নাকি লাভসহ বেশি দিতে হবে?”
অনেকেই মনে করেন, ঋণের বিপরীতে যে অতিরিক্ত টাকা বা লাভ (সুদ) নেওয়া হয়, তা হয়তো সরকার কেটে নেয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, জিপিএফ থেকে নেওয়া ঋণের অতিরিক্ত বা লাভের টাকা সরকারি কোষাগারে যায় না, বরং তা চক্রাকারে আপনার নিজের অ্যাকাউন্টেই জমা হয়।
নিচে জিপিএফ ঋণ উত্তোলন ও পরিশোধের খুঁটিনাটি এবং এর গাণিতিক হিসাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বাড়তি কিস্তি বা লাভ কার পকেটে যায়?
জিপিএফ থেকে ফেরতযোগ্য ঋণ নিলে আপনাকে সাধারণত মূল কিস্তির বাইরে অতিরিক্ত ১টি কিস্তি বা নির্ধারিত হারে লাভ (মুনাফা) পরিশোধ করতে হয়। তবে আশার কথা হলো, এই বাড়তি টাকা বা লাভের অংশটি সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। এটি সম্পূর্ণভাবে আপনার নিজস্ব জিপিএফ অ্যাকাউন্টেই জমা হবে। পরবর্তীতে অবসরে যাওয়ার সময় বা টাকা তোলার সময় আপনি নিজেই এই টাকা ১৩% (বা তৎকালীন নির্ধারিত হার) মুনাফাসহ ফেরত পাবেন। অর্থাৎ, অতিরিক্ত টাকা দেওয়া প্রকারান্তরে আপনার নিজের অ্যাকাউন্টে সঞ্চয় বাড়ানোর মতোই।
২. ঋণ নিলে কোন জায়গায় ক্ষতি হয়?
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বাড়তি টাকা যদি নিজের অ্যাকাউন্টেই জমা হয়, তবে লোন নেওয়ার লোকসানটা কোথায়? লোকসানটি হলো মুনাফা বা লভ্যাংশ হাতছাড়া হওয়া।
নিয়ম: আপনি জিপিএফ অ্যাকাউন্ট থেকে যেদিন যত টাকা ঋণ হিসেবে তুলবেন, ঠিক তত টাকার ওপর সরকার প্রদত্ত বার্ষিক লভ্যাংশ (১১% থেকে ১৩% পর্যন্ত যা নির্ধারিত থাকে) আর পাবেন না। পরিশোধ করার আগ পর্যন্ত ওই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার কোনো মুনাফা আপনার অ্যাকাউন্টে যোগ হবে না। তাই এই বিষয়টি জেনেই ঋণ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৩. ফেরতযোগ্য বনাম অফেরতযোগ্য অগ্রিম
ফেরতযোগ্য অগ্রিম: বয়স ৫২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে জিপিএফ থেকে টাকা তুললে তা অবশ্যই ফেরতযোগ্য। এটি সর্বনিম্ন ১২টি থেকে সর্বোচ্চ ৫০টি কিস্তিতে (সুদসহ) পরিশোধ করা যায়। তবে সাধারণত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ৩৬টি কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়।
অফেরতযোগ্য অগ্রিম: সরকারি চাকুরিজীবীর বয়স ৫২ বছর পূর্ণ হলে তিনি জিপিএফ থেকে ‘অফেরতযোগ্য অগ্রিম’ নিতে পারেন। এই টাকা আর কখনোই কিস্তির মাধ্যমে সরকারকে ফেরত দিতে হয় না।
১ লক্ষ টাকার ঋণের একটি বাস্তব গাণিতিক হিসাব
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর জিপিএফ অ্যাকাউন্ট থেকে ১,০০,০০০ (১ লাখ) টাকা ঋণ নিলেন এবং তা ৩৬টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে চান।
মূল কিস্তির হিসাব:
নিয়ম অনুযায়ী, ১ লাখ টাকাকে ৩৬ দিয়ে ভাগ করলে প্রতি মাসের মূল কিস্তি দাঁড়ায়:
লভ্যাংশ বা অতিরিক্ত টাকার সূত্র:
জিপিএফ ঋণের লভ্যাংশ নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট সরকারি সূত্র রয়েছে:
এই সূত্রে ১ লাখ টাকার মান বসালে হিসাবটি হবে:
{১,০০,০০০* (৩৬ + ১){৪৮০} = {১,০০,০০০ *৩৭}{৪৮০} = ৭,৭০৮ টাকা
চূড়ান্ত পরিশোধের রূপরেখা:
মূল ঋণের কিস্তি: ৩৬টি (প্রতি মাসে ২,৭৭৮ টাকা করে)।
অতিরিক্ত বা লাভের কিস্তি: সূত্র অনুযায়ী মোট লাভ আসে ৭,৭০৮ টাকা। এই টাকাটি সাধারণত সর্বোচ্চ ৩টি সমান মাসিক কিস্তিতে (মূল কিস্তি শেষ হওয়ার পর) বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে।
মোট কিস্তির সংখ্যা: ৩৬ + ১ = ৩৭টি (বা লাভের টাকা সমন্বয় করতে সর্বোচ্চ ৩৯টি কিস্তি হতে পারে)।
সুদবিহীন (Interest-Free) অ্যাকাউন্টধারীদের জন্য নিয়ম
অনেকে ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত কারণে জিপিএফ অ্যাকাউন্ট ‘সুদবিহীন’ বা মুনাফামুক্ত রাখেন। তাদের মনে প্রশ্ন থাকে, মুনাফা না নিলে কি বাড়তি কিস্তি দিতে হবে?
উত্তর হচ্ছে: না। যারা সুদবিহীন অপশন বেছে নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ১টি কিস্তি বা লাভের টাকা দিতে হয় না। তারা যতটুকু আসল লোন নেবেন, ঠিক ততটুকুই কিস্তির মাধ্যমে ফেরত দেবেন।
শেষ কথা
সংক্ষেপে বলতে গেলে, জিপিএফ থেকে ১ লাখ টাকা লোন নিলে আপনাকে মূল টাকার পাশাপাশি প্রায় ৭,৭০৮ টাকা বেশি দিতে হবে (যদি আপনি সুদযুক্ত অ্যাকাউন্টধারী হন)। তবে এই বাড়তি ৭,৭০৮ টাকা আপনার নিজের অ্যাকাউন্টেই জমা থাকবে, যা ভবিষ্যতের জন্য আপনার সঞ্চয়কেই সমৃদ্ধ করবে।



