আইবাস++ । পে ফিক্সেশন । ই-ফাইলিং

পেনশনের টাকা নিয়ে ভয়াবহ অনিয়ম: iBAS++-এ ২৬ পেনশনারের ৩৪৬ বিল, ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অভিযোগে কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

অবসরজীবনে একজন প্রবীণের সবচেয়ে বড় ভরসা তাঁর পেনশন। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর জীবনের শেষ সময়ে সেই পেনশনের বকেয়া অর্থই অনেকের চিকিৎসা, সংসার কিংবা দৈনন্দিন জীবনের প্রধান অবলম্বন। অথচ সেই পেনশনের অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াতেই যদি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি শুধু আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

এমনই গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে সরকারি পেনশন ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম iBAS++ ঘিরে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিলের বিপরীতে মোট ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের অভিযোগে অডিট কর্মকর্তা ইশরাত জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে তাঁকে ওই অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন: প্রচারিত কিছু খবরে ৩৪টি বিল বলা হলেও সিএজি-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন ও একাধিক প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। ফলে সংবাদে ৩৪৬ সংখ্যাটিই ব্যবহার করা সমীচীন।

কী ঘটেছিল?

প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি পেনশন ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম iBAS++ ব্যবহার করে পেনশন ও ভাতাদি-সংক্রান্ত বকেয়া বিলের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে উঠে আসে, ইশরাত জাহান তাঁর নিজস্ব iBAS++ User ID ব্যবহার করে ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া পেনশন বিল প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হন।

এসব বিলের বিপরীতে মোট ৬,৬৮,৭০,৯২৮ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে এই অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের জন্য ইশরাত জাহানকে সম্পূর্ণ দায়ী করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ বিষয়টি একটি বা দুটি বিচ্ছিন্ন বিলের ঘটনা নয়। একই সঙ্গে ২৬ জন পেনশনার, ৩৪৬টি বকেয়া বিল এবং প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা—এই তিনটি বিষয়ই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

সাময়িক বরখাস্ত কর্মকর্তা কে?

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ইশরাত জাহান বর্তমানে চিফ কন্ট্রোলার ডিফেন্স ফাইন্যান্সের আর্মি JCO & OR কার্যালয়ে উপসহকারী ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার (DAFC) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি চিফ কন্ট্রোলার ডিফেন্স ফাইন্যান্সের পেনশন ও ফান্ড-সংক্রান্ত কার্যালয়ে একই ধরনের দায়িত্বে ছিলেন।

অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তের পর সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে এই বরখাস্ত কার্যকর হয়েছে। সাময়িক বরখাস্তকালীন প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তিনি খোরাকি ভাতা (Subsistence Grant) পাওয়ার অধিকারী হবেন।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পেনশনের টাকা কীভাবে বিধিবহির্ভূতভাবে গেল?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের স্তরগুলো কতটা কার্যকর ছিল—সেই প্রশ্ন।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, iBAS++ একটি সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সরকারি অর্থের বিভিন্ন ধরনের লেনদেন, বিল, হিসাব ও পেমেন্ট প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। সিস্টেমটি বিল অনলাইনে গ্রহণ, যাচাই ও অনুমোদনের পাশাপাশি অনুমোদিত বিলের বিপরীতে EFT, চেক বা পেমেন্ট অর্ডার জারির ব্যবস্থাও করে।

তাই কোনো ব্যবহারকারীর নিজস্ব User ID দিয়ে শত শত বকেয়া পেনশন বিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠলে স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—

  • সংশ্লিষ্ট User ID-এর ক্ষমতার সীমা কী ছিল?
  • বিল তৈরির পর যাচাই ও অনুমোদনের পৃথক ধাপগুলো কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে?
  • একই পেনশনারের একাধিক বকেয়া বিলের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই হয়েছিল কি না?
  • EFT পেমেন্টের আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ কতটা কার্যকর ছিল?
  • সিস্টেমে থাকা Audit Trail ও লগ থেকে অর্থের প্রকৃত গন্তব্য কতটা সহজে শনাক্ত করা সম্ভব?
  • একই ধরনের অনিয়ম পুনরায় ঠেকাতে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।

শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়, সামনে এসেছে আরও বড় চিত্র

ঘটনাটি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে কারণ একই সময় শাহীনুর রহমান খান নামের আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও একই ২৬ জন পেনশনারের ৩৪৬টি বকেয়া বিল নিয়ে একই অঙ্কের অর্থ বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্তের খবর এসেছে।

প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথকভাবে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা করে বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। সে হিসাবে দুটি ঘটনায় অভিযোগকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৩৭ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৬ টাকা

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—এটি দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসা অভিযোগ; আদালত বা চূড়ান্ত তদন্তে দোষ প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে।

কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ?

পেনশন কোনো অনুদান নয়। একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রের জন্য দায়িত্ব পালন করার পর অবসরজীবনে যে আর্থিক সুবিধা পান, সেটিই তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।

বিশেষ করে বকেয়া পেনশনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর। বছরের পর বছর চাকরি করার পর কোনো অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি যখন তাঁর পাওনা অর্থের অপেক্ষায় থাকেন, তখন সেই অর্থ আটকে যাওয়া বা ভুলভাবে অন্যত্র চলে যাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর মূল উদ্দেশ্যই ছিল দ্রুততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী iBAS++-এ সরকারি আর্থিক লেনদেনের হিসাব রাখা, অনলাইন বিল প্রক্রিয়াকরণ এবং EFT-এর মাধ্যমে দ্রুত পেমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে।

সুতরাং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, অনুমোদন কাঠামো, দায়িত্ব বিভাজন ও নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।

এখন কী হওয়া দরকার?

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে পুরো অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা। তদন্তে অন্তত পাঁচটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—

প্রথমত, ২৬ জন পেনশনারের প্রকৃত পাওনা কত ছিল এবং কোন কোন বিলের বিপরীতে কত টাকা পরিশোধ হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ৩৪৬টি বিলের প্রতিটির ক্ষেত্রে কে বিল তৈরি, যাচাই, অনুমোদন ও পেমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট iBAS++ User ID-এর কার্যক্রম, লগ ও Audit Trail পরীক্ষা করে কে কখন কোন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন তা শনাক্ত করা।

চতুর্থত, বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধিত অর্থের প্রকৃত গন্তব্য নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া।

পঞ্চমত, একই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, সে জন্য Maker-Checker ব্যবস্থা, User ID-এর ক্ষমতা সীমিতকরণ, অস্বাভাবিক লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা এবং নিয়মিত বিশেষ অডিট আরও শক্তিশালী করা।

প্রবীণের শেষ সম্বল নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনাটির মানবিক দিকটিই সম্ভবত সবচেয়ে বেদনাদায়ক। একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের কাছে কয়েক লাখ টাকা হয়তো কোনো সাধারণ হিসাবের অঙ্ক নয়; সেটি হতে পারে তাঁর চিকিৎসার টাকা, পরিবারের খরচ, সন্তানের ওপর নির্ভরতা কমানোর শেষ অবলম্বন কিংবা সারাজীবনের চাকরির পর পাওয়া নিরাপত্তা।

তাই পেনশনের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ায় শেষ হয় না। প্রকৃত পেনশনার তাঁর প্রাপ্য অর্থ পেয়েছেন কি না, কারও পাওনা আটকে আছে কি না, সরকারি অর্থের কোনো অংশ অপব্যবহার হয়েছে কি না এবং সেই অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব কি না—সবকিছুর জবাব দিতে হবে।

একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আইনগত অধিকার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সাময়িক বরখাস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা; এটি চূড়ান্ত অপরাধ প্রমাণের সমান নয়।

শেষ কথা

৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা—অঙ্কটি বড়। কিন্তু এই ঘটনার গুরুত্ব শুধু টাকার অঙ্কে নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছেন ২৬ জন অবসরপ্রাপ্ত পেনশনার, রয়েছে ৩৪৬টি বকেয়া বিল, আর রয়েছে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম।

এখন সবার প্রত্যাশা—তদন্ত যেন কেবল একজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। কীভাবে এতগুলো বিল বিধিবহির্ভূতভাবে পরিশোধ হলো, কোথায় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যর্থ হলো, অর্থ কোথায় গেল এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পেনশনারদের পাওনা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর বেরিয়ে আসুক।

কারণ রাষ্ট্রের কাছে একজন প্রবীণের পেনশনের টাকা শুধু একটি হিসাবের সংখ্যা নয়—এটি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অর্জিত অধিকার এবং শেষ জীবনের নিরাপত্তা।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *