সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে কি ফুল পেনশনে চাকরি ছাড়া যায়? ২৫ বছর পূর্ণ না হলে কী হবে

১০ বছর চাকরি পূর্ণ করলেই সরকারি চাকরি থেকে ‘ফুল পেনশন’ নিয়ে চলে যাওয়া যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং ২৫ বছর চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি বাধা রয়েছে। ২০২৬ সালে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরছে—চাকরির ১০ বছর পূর্ণ হলে কি পেনশনযোগ্য হয়ে যাওয়া যায়? আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ১০ বছর বা তার বেশি চাকরি করার পর স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিলে অন্তত চাকরিকালের অনুপাতে পেনশন বা আনুতোষিক পাওয়া যাবে।

কিন্তু বিদ্যমান বিধান এবং সাম্প্রতিক আদালতের রায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘পেনশনযোগ্য চাকরিকাল’ এবং ‘চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার অধিকার’—দুটি বিষয় এক নয়।

১০ বছর পূর্ণ হলেই ফুল পেনশন নয়

২০১৫ সালের পেনশনসংক্রান্ত সংশোধনের পর পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ন্যূনতম সীমা কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছিল। একই কাঠামোয় চাকরিকালের ওপর ভিত্তি করে পেনশনের হার ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা হয় এবং ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকালে সর্বোচ্চ হারে পেনশনের বিধান রাখা হয়।

অর্থাৎ, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

৫ বা ১০ বছর চাকরি করা মানেই ২৫ বছরের পূর্ণ পেনশন নয়।

চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পেনশনের হার নির্ধারিত হতে পারে—কিন্তু তার মানে এই নয় যে একজন কর্মচারী ইচ্ছামতো ১০ বছর চাকরি করে পদত্যাগ করবেন এবং সেই চাকরিকাল দেখিয়ে আজীবন পেনশন গ্রহণ করবেন।

তাহলে ২৫ বছরের বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রশ্নের উত্তর এখন আরও পরিষ্কার হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক রায়ে।

২০২৬ সালের মার্চে আপিল বিভাগ একটি মামলায় সিদ্ধান্ত দেন এবং পরবর্তী সময়ে ২৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। মামলাটি ছিল মাহবুব মোরশেদ নামের এক সাবেক বিচারিক কর্মকর্তাকে ঘিরে।

তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দিয়ে প্রায় ১৯ বছর চাকরি করার পর ২০১১ সালে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। পরে তিনি চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে ৬১ শতাংশ পেনশন ও আনুতোষিক দাবি করেন।

কর্তৃপক্ষের অবস্থান ছিল—সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে আগের চাকরিকাল পেনশনের জন্য গণনাযোগ্য থাকে না এবং ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তিনি সংশ্লিষ্ট পেনশন সুবিধার অধিকারী নন।

হাইকোর্টের রায়ের পর কী হয়েছিল?

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাহবুব মোরশেদ ২০১৬ সালে হাইকোর্টে রিট করেন।

২০২১ সালে হাইকোর্ট তার পক্ষে রায় দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন এবং চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পেনশনসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে যায়।

শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন। ফলে ২৫ বছর চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে পেনশন সুবিধা পাওয়া যাবে না—এই অবস্থানই বহাল থাকে।

২৪ বছর ৩৬৪ দিন চাকরি করলেও কি একই ফল?

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সাধারণভাবে বলা যায়, ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি একজন সরকারি কর্মচারী পদত্যাগ করেন, তাহলে শুধু দীর্ঘ চাকরিকাল থাকার কারণে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশন পাওয়ার অধিকারী হয়ে যাবেন না।

অর্থাৎ ১০ বছর, ১৫ বছর, ১৯ বছর কিংবা ২৪ বছর ৩৬৪ দিন চাকরি করার পরও যদি কেউ ‘পদত্যাগ’ করেন, তাহলে ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ না হওয়ার কারণে পেনশন সুবিধা নিয়ে গুরুতর আইনি সমস্যা তৈরি হবে।

আপিল বিভাগের রায়ে সংশ্লিষ্ট বিধান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ২৫ বছরের চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করলে পূর্ববর্তী চাকরিকাল পেনশনের জন্য গণনাযোগ্য না হওয়ার বিধান রয়েছে।

তাহলে ‘১০ বছরে পেনশন’ কথাটি কোথা থেকে আসে?

এখানেই মূল বিভ্রান্তি।

২০১৫ সালের পরিবর্তনের ফলে পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ন্যূনতম সীমা ৫ বছর করা হয়েছিল। ফলে চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পেনশন হিসাবের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটিকে সরাসরি ‘৫/১০ বছর চাকরি করলেই ইচ্ছামতো চাকরি ছেড়ে পেনশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

অর্থাৎ—

পেনশন হিসাবের যোগ্যতা ≠ ইচ্ছামতো পদত্যাগ করে পেনশন পাওয়ার অধিকার।

এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখার কারণেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ১০ বছর পূর্তিতে পেনশন নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

স্বেচ্ছা অবসর ও পদত্যাগ কি একই বিষয়?

না। এটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পদত্যাগ (Resignation) এবং স্বেচ্ছা অবসর (Voluntary Retirement) একই আইনি প্রক্রিয়া নয়।

কোনো কর্মচারী যদি প্রচলিত অবসর আইনের অধীনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন, সেটির আইনি ফল এক রকম হতে পারে। অন্যদিকে চাকরি থেকে সরাসরি পদত্যাগ করলে পূর্ববর্তী চাকরিকাল পেনশনের জন্য বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

সাম্প্রতিক আপিল বিভাগের মামলাটিও মূলত ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের পর পেনশন দাবিকে কেন্দ্র করেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘নতুন আইনে ১০ বছর পর ছাড়া যাবে’—দাবিটি কতটা সত্য?

এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি।

২০২৬ সালে সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত সংশোধনী আইন প্রণীত হয়েছে—সরকারি নথিতে সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর উল্লেখ রয়েছে। তবে শুধু এই আইন হয়েছে বলেই ‘১০ বছর চাকরি করলেই পূর্ণ পেনশন নিয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়া যাবে’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বরং বর্তমানে যে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে সামনে এসেছে তা হলো, ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করে পেনশন দাবি করার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।

তাই নতুন কোনো আইন, অধ্যাদেশ, বিধিমালা বা সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট বিধান পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ১০ বছর চাকরি পূর্ণ হলেই ‘ফুল পেনশনে’ চাকরি ছেড়ে দেওয়া যাবে—এমন দাবি করা নিরাপদ নয়।

তাহলে ২৫ বছর পূর্ণ করলে কী সুবিধা?

২৫ বছর বা তার বেশি পেনশনযোগ্য চাকরিকাল দীর্ঘদিনের সরকারি পেনশন কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ সীমা। সরকারি পেনশন ব্যবস্থার সংশোধিত কাঠামোতেও ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব চাকরিকালের জন্য সর্বোচ্চ পেনশন হারের বিধান রয়েছে।

তাই ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি পেনশন ও অবসর-সুবিধার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতার সীমা।

চাকরিজীবীদের জন্য মূল বার্তা

বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে চারটি বিষয় মনে রাখা দরকার—

১. ১০ বছর চাকরি = ফুল পেনশন নয়।

২. ৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকালের জন্য পেনশন কাঠামো থাকা মানেই ৫/১০ বছর পর ইচ্ছামতো পদত্যাগ করে পেনশন পাওয়া নয়।

৩. ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করলে পূর্ববর্তী চাকরিকাল পেনশনের জন্য গণনাযোগ্য না হওয়ার বিধান রয়েছে।

৪. স্বেচ্ছা অবসর, অবসর গ্রহণ ও পদত্যাগ—তিনটিকে একই বিষয় ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার একদিন আগেও কেন ঝুঁকি?

সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, ২৪ বছর ৩৬৪ দিন চাকরি করলেও প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেছে—তাই পেনশন পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।

কিন্তু আইনি যোগ্যতা যদি ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে একদিন কম থাকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে তাই ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে পরবর্তীতে পেনশন দাবি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আদালতও নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই পেনশন ও অবসর-সুবিধা দেওয়ার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন।

শেষ কথা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘পেনশন পাওয়ার জন্য ন্যূনতম চাকরিকাল’ এবং ‘২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে পেনশন পাওয়ার অধিকার’ এক জিনিস নয়।

বর্তমান আইনি অবস্থান অনুযায়ী, চাকরির ১০ বছর পূর্ণ হলেই কেউ ফুল পেনশন নিয়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিতে পারবেন—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বরং ২০২৬ সালের আপিল বিভাগের রায় ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে পেনশন পাওয়ার দাবিকে বড় ধরনের আইনি বাধার মধ্যে রেখেছে।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘১০ বছর পূর্তিতে ফুল পেনশন’, ‘২৪ বছর ৩৬৪ দিনেও পেনশন’ বা ‘নতুন আইনে ১০ বছরেই অবসর’—এ ধরনের তথ্য দেখলে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের সুনির্দিষ্ট ধারা যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *