আয়কর রিটার্ন দাখিলের নতুন সময়সূচি: ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দিলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা কর প্রণোদনা
আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে করদাতাদের জন্য নতুন সময়ভিত্তিক প্রণোদনা ও অতিরিক্ত করের কাঠামো চালু হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি (Individual) ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার (HUF) শ্রেণির করদাতারা বছরের শুরুতেই রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ওপর ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রণোদনা, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) ২০২৬ সালের ২ আগস্টের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রণোদনার বিষয়টি জানিয়েছে। এনবিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর লক্ষ্য হচ্ছে করদাতাদের দ্রুত রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করা এবং কর পরিপালন বাড়ানো।
চার ধাপে বদলে যাবে রিটার্ন দাখিলের আর্থিক সুবিধা
নতুন ব্যবস্থায় পুরো করবর্ষকে কার্যত চারটি সময়ে ভাগ করে রিটার্ন দাখিলের আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একজন করদাতা কখন রিটার্ন দাখিল করছেন—তার ওপর নির্ভর করবে তিনি কর ছাড় পাবেন, স্বাভাবিক কর দেবেন, নাকি অতিরিক্ত কর দেবেন।
| রিটার্ন দাখিলের সময় | করদাতার আর্থিক সুবিধা/দায় |
|---|---|
| ১ জুলাই–৩০ সেপ্টেম্বর | পরিশোধযোগ্য করের ৫% প্রণোদনা, সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা |
| ১ অক্টোবর–৩১ ডিসেম্বর | কোনো প্রণোদনা নেই, অতিরিক্ত করও নেই |
| ১ জানুয়ারি–৩১ মার্চ | পরিশোধযোগ্য করের ২% অথবা ৩,০০০ টাকা—যেটি বেশি, অতিরিক্ত কর |
| ১ এপ্রিল–৩০ জুন | পরিশোধযোগ্য করের ৫% অথবা ৫,০০০ টাকা—যেটি বেশি, অতিরিক্ত কর |
এই কাঠামোর কথা এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি ও ২০২৬-২৭ করবর্ষের সংশ্লিষ্ট তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাখিল করলে কী লাভ?
নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক সময় হচ্ছে ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর। এ সময়ে রিটার্ন দাখিল করলে ধারা ১৭৩ অনুযায়ী পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ কর প্রণোদনা পাওয়া যাবে। তবে এই প্রণোদনার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা।
উদাহরণ হিসেবে—
- পরিশোধযোগ্য কর ২০,০০০ টাকা হলে ৫% প্রণোদনা = ১,০০০ টাকা
- পরিশোধযোগ্য কর ১ লাখ টাকা হলে প্রণোদনা = ৫,০০০ টাকা
- পরিশোধযোগ্য কর ৪ লাখ টাকা হলে প্রণোদনা = ২০,০০০ টাকা
- পরিশোধযোগ্য কর ৬ লাখ টাকা হলে ৫% দাঁড়ায় ৩০,০০০ টাকা হলেও সর্বোচ্চ সীমার কারণে প্রণোদনা হবে ২৫,০০০ টাকা
অর্থাৎ কর যত বেশি হবে, ৫ শতাংশ প্রণোদনার সুবিধা তত বাড়বে, কিন্তু ২৫ হাজার টাকার পর আর বাড়বে না।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর: ছাড় নেই, জরিমানাও নেই
১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করলে করদাতা আর ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাবেন না। তবে এ সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে নতুন কাঠামো অনুযায়ী অতিরিক্ত করও দিতে হবে না।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ দিন পেরিয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা শুরু হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টি হচ্ছে প্রণোদনাবিহীন কিন্তু অতিরিক্ত করমুক্ত সময়।
এ কারণে যেসব করদাতা সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে পারেননি, তাদের জন্য ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত কর এড়ানোর সুযোগ থাকছে।
জানুয়ারি থেকে শুরু হবে অতিরিক্ত কর
১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাকে পরিশোধযোগ্য করের ওপর অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ধারা ১৭৩ অনুযায়ী পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ৩,০০০ টাকা—যেটি বেশি, সেটি অতিরিক্ত কর হিসেবে দিতে হবে।
যেমন, কারও পরিশোধযোগ্য কর ১ লাখ টাকা হলে ২ শতাংশে অতিরিক্ত কর দাঁড়ায় ২ হাজার টাকা। কিন্তু নির্ধারিত ন্যূনতম অঙ্ক ৩ হাজার টাকা হওয়ায় তাকে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।
আবার পরিশোধযোগ্য কর ২ লাখ টাকা হলে ২ শতাংশ = ৪ হাজার টাকা। সেক্ষেত্রে ৪ হাজার টাকাই প্রযোজ্য হবে।
অর্থাৎ এ পর্যায়ে হিসাব হবে—
পরিশোধযোগ্য কর × ২% বনাম ৩,০০০ টাকা → যেটি বেশি, সেটিই অতিরিক্ত কর।
এপ্রিল থেকে জুন: অতিরিক্ত কর আরও বাড়বে
যারা আরও দেরি করে ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত করের হার বেড়ে হবে ৫ শতাংশ অথবা ৫,০০০ টাকা—যেটি বেশি।
উদাহরণ:
- পরিশোধযোগ্য কর ৫০,০০০ টাকা → ৫% = ২,৫০০ টাকা; তাই দিতে হবে ৫,০০০ টাকা
- পরিশোধযোগ্য কর ১ লাখ টাকা → ৫% = ৫,০০০ টাকা; দিতে হবে ৫,০০০ টাকা
- পরিশোধযোগ্য কর ২ লাখ টাকা → ৫% = ১০,০০০ টাকা
- পরিশোধযোগ্য কর ৫ লাখ টাকা → ৫% = ২৫,০০০ টাকা
অর্থাৎ এপ্রিল-জুনে বিলম্ব যত বেশি, আর্থিক দায়ও তত বেশি হতে পারে।
প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
ছবিতে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো রিটার্ন দাখিলকারী স্বাভাবিক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের জন্য প্রযোজ্য হারে আয়কর পরিশোধ করে আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
এখানে প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারী ও নিয়মিত রিটার্নদাতার সময়সীমা এক করে দেখা ঠিক হবে না। তাই নতুন করদাতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ বিধান আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বিদেশে অবস্থানরত করদাতাদের জন্যও বিশেষ সময়
উচ্চশিক্ষা, চাকরির প্রেষণ বা লিয়েন কিংবা অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে বৈধ ভিসা ও পারমিট নিয়ে বিদেশে অবস্থানরত কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি বাংলাদেশে ফিরে এলে প্রত্যাবর্তনের ৯০তম দিনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন—ছবিতে দেওয়া নির্দেশনায় এ বিধান উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি করদাতাদের ক্ষেত্রে সাধারণ সময়সূচির পাশাপাশি তাদের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি ছুটির দিনে শেষ তারিখ পড়লে কী হবে?
নির্ধারিত শেষ দিনটি যদি সরকারি ছুটির দিন হয়, তাহলে করদাতা তার পরবর্তী কর্মদিবসে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন—ছবিতে থাকা নির্দেশনায় এমনটাই বলা হয়েছে।
ফলে নির্ধারিত তারিখ সরকারি ছুটির কারণে কার্যদিবস না হলে শুধু সেই কারণে করদাতাকে বিলম্বিত হিসেবে গণ্য করার কথা নয়।
‘জরিমানা’ নাকি ‘অতিরিক্ত কর’—কোনটি সঠিক?
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে করদাতারা বিলম্বের অর্থকে ‘জরিমানা’ বলে থাকলেও নতুন কাঠামোর ঘোষণায় ‘অতিরিক্ত কর’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যায় জানুয়ারি-মার্চ এবং এপ্রিল-জুনে নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত কর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৭১ অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখের পরে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে ধারা ১৭৪ অনুযায়ী কর পরিশোধের বিধান রয়েছে।
তাই সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুধু ‘জরিমানা’ না বলে ‘বিলম্বে অতিরিক্ত কর’ বলা তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুল।
অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ
২০২৬-২০২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের e-Return ব্যবস্থা চালু করেছে এনবিআর। অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে করদাতারা আয়, বিনিয়োগ, ব্যয়, সম্পদ-দায় এবং কর পরিশোধের তথ্য দিয়ে রিটার্ন সম্পন্ন করতে পারেন। এনবিআরের FAQ অনুযায়ী e-Return ব্যবস্থায় রিটার্ন দাখিলের পর acknowledgement slip ও tax certificate পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে।
করদাতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব
নতুন নিয়মের সারকথা হলো—
৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দাখিল = লাভ
→ পরিশোধযোগ্য করের ৫% পর্যন্ত প্রণোদনা, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা।
১ অক্টোবর–৩১ ডিসেম্বর = স্বাভাবিক সময়
→ প্রণোদনা নেই, অতিরিক্ত করও নেই।
১ জানুয়ারি–৩১ মার্চ = বিলম্বের খরচ শুরু
→ ২% অথবা ৩,০০০ টাকা, যেটি বেশি।
১ এপ্রিল–৩০ জুন = আরও বেশি বিলম্ব
→ ৫% অথবা ৫,০০০ টাকা, যেটি বেশি।
শেষ কথা
২০২৬-২০২৭ করবর্ষে আয়কর রিটার্ন দাখিলের নতুন কাঠামো করদাতাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—যত দ্রুত রিটার্ন দাখিল করা হবে, তত বেশি আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে কর প্রণোদনা মিলছে, অক্টোবর-ডিসেম্বরে কোনো অতিরিক্ত অর্থ লাগছে না, আর জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে বিলম্বের আর্থিক দায়। ফলে করদাতাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্ত হলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে ৩০ সেপ্টেম্বরের আগেই রিটার্ন দাখিল করা। এনবিআরের ২০২৬ সালের বিজ্ঞপ্তিতেও ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করে এই সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।



