এক ফরম্যাটেই নির্ণয় করা যাবে সব ধরনের ‘ভাড়া হইতে আয়’: আয়কর হিসাব হবে আরও সহজ
বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক ভবন কিংবা অন্য কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে আয় করেন—এমন করদাতাদের আয়কর হিসাবের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিকভাবে ‘ভাড়া হইতে আয়’ নির্ণয় করা। মোট প্রাপ্ত ভাড়া থেকে আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয় বাদ দিয়ে করযোগ্য ভাড়া আয় নির্ধারণ করতে হয়।
করদাতাদের এই হিসাব সহজ করতে একটি সমন্বিত ফরম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। একই ফরম্যাটে আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিসহ বিভিন্ন ধরনের ভাড়া আয়ের হিসাব প্রস্তুত করা সম্ভব। এতে মোট ভাড়া আয়, অনুমোদিত ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত করযোগ্য ভাড়া আয় আলাদাভাবে দেখানো যায়।
প্রদত্ত নমুনা হিসাব অনুযায়ী, একজন করদাতা মাসিক ৬০ হাজার টাকা হারে ২৪ মাসের জন্য মোট ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাড়া পেয়েছেন। এক্ষেত্রে উৎসে কর, আনুষঙ্গিক সেবা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ এবং মাসিক কর্তনযোগ্য ব্যয় না থাকায় প্রকৃত ভাড়ামূল্য দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
একই সঙ্গে ন্যাসঙ্গত ভাড়ামূল্য বা পৌর মূল্য শূন্য হওয়ায় বার্ষিক মূল্য হিসেবেও মোট ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ভূমি ভাড়া, বকেয়া ভাড়া বা অন্যান্য সমন্বয়যোগ্য ভাড়া আয় না থাকায় মোট ভাড়া আয়ও ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকাই রয়েছে।
অনুমোদিত ব্যয় বাদ দেওয়ার সুযোগ
ভাড়া থেকে পাওয়া পুরো অর্থের ওপর সরাসরি আয়কর নির্ধারণ করা হয় না। প্রযোজ্য আয়কর আইন ও বিধান অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত ব্যয় মোট ভাড়া আয় থেকে বাদ দেওয়া যায়।
প্রদত্ত হিসাবের নমুনায় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হিসেবে বার্ষিক মূল্যের ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা বাদ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনুমোদিত ব্যয়ের মধ্যে ভূমি উন্নয়ন কর, বীমা প্রিমিয়াম, গৃহ নির্মাণ বা সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য নেওয়া ঋণের সুদ, বার্ষিক কর, ভূমির খাজনা এবং সম্পত্তি ভাড়া দেওয়ার আগে নির্দিষ্ট সময়ের সুদ বা মুনাফার মতো খাত অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এসব ব্যয় বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত, সীমা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
নমুনা হিসাবে গৃহ নির্মাণ ঋণের সুদ বাবদ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ২০ হাজার টাকা, বার্ষিক কর বাবদ ২৪ হাজার টাকার মধ্যে ১৬ হাজার টাকা এবং ভূমির খাজনা বাবদ ৯০০ টাকার মধ্যে ৬০০ টাকা অনুমোদিত ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
ফলে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ মোট অনুমোদিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ টাকা।
করযোগ্য ভাড়া আয় ৯ লাখ ৭১ হাজার ৪০০ টাকা
মোট ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাড়া আয় থেকে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৬০০ টাকা অনুমোদিত ব্যয় বাদ দেওয়ার পর ‘ভাড়া হইতে আয়’ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৭১ হাজার ৪০০ টাকা।
অর্থাৎ করদাতার মোট প্রাপ্ত ভাড়া এবং করযোগ্য ভাড়া আয় এক নয়। আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় প্রথমে মোট ভাড়া আয় নির্ণয় করতে হবে এবং এরপর আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয় বাদ দিয়ে করযোগ্য আয় হিসাব করতে হবে।
একই ফরম্যাটে করা যাবে বিভিন্ন ধরনের হিসাব
এই হিসাব পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো, একটি সমন্বিত ফরম্যাট ব্যবহার করেই বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তির ভাড়া আয় নির্ণয় করা সম্ভব।
করদাতার একাধিক বাড়ি বা সম্পত্তি থাকলে প্রতিটি সম্পত্তির জন্য আলাদাভাবে ভাড়া আয় ও অনুমোদিত ব্যয় হিসাব করে পরে মোট আয় একত্র করা যেতে পারে। একইভাবে সম্পত্তি বছরের পুরো সময় ভাড়া না থাকলে ভাড়ার সময়কাল অনুযায়ী প্রাপ্ত ভাড়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় সমন্বয় করে হিসাব প্রস্তুত করা সম্ভব।
এ ছাড়া উৎসে কর কর্তন করা হলে তা যথাযথ ঘরে দেখানো, ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে আনুষঙ্গিক সেবার অর্থ পাওয়া গেলে তা বিবেচনায় নেওয়া এবং করদাতা নিজে কোনো সেবা ব্যয় বহন করলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেটিও সমন্বয় করা যাবে।
সঠিক তথ্য ও প্রমাণপত্র সংরক্ষণ জরুরি
ভাড়া আয় নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শুধু হিসাব প্রস্তুত করলেই হবে না। করদাতাকে ভাড়ার চুক্তিপত্র, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী, পৌরকর বা সিটি করপোরেশন করের রসিদ, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, গৃহঋণের সুদ পরিশোধের সনদ এবং অন্যান্য ব্যয়ের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করতে হবে।
বিশেষ করে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত আয় ও ব্যয়ের তথ্যের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকলে কর নির্ধারণের সময় প্রশ্ন উঠতে পারে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নির্দিষ্ট ও সমন্বিত ফরম্যাটে ভাড়া আয়ের হিসাব প্রস্তুত করলে ভুলের আশঙ্কা কমে এবং করদাতার প্রকৃত করযোগ্য আয় সহজে নির্ণয় করা যায়।
সব মিলিয়ে, মোট প্রাপ্ত ভাড়া → প্রকৃত ভাড়ামূল্য → বার্ষিক মূল্য → মোট ভাড়া আয় → অনুমোদিত ব্যয় বাদ → করযোগ্য ‘ভাড়া হইতে আয়’—এই ধারাবাহিক পদ্ধতি অনুসরণ করে একই ফরম্যাটে বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তির ভাড়া আয়ের হিসাব প্রস্তুত করা সম্ভব।
তবে করদাতার সম্পত্তির ধরন, ব্যবহার, ভাড়ার মেয়াদ, ঋণের সুদ ও অন্যান্য ব্যয়ের প্রকৃতি অনুযায়ী কর হিসাব ভিন্ন হতে পারে। তাই আয়কর রিটার্ন দাখিলের আগে সংশ্লিষ্ট করবর্ষে কার্যকর আইন, বিধিমালা ও প্রযোজ্য নির্দেশনা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।



