অবসরভোগী পেনশনভোগী মারা গেলে স্ত্রী কীভাবে পারিবারিক পেনশন পাবেন, কোথায় যেতে হবে, লাগবে যেসব কাগজ
সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর নিয়মিত পেনশন ভোগরত অবস্থায় কোনো পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর পরিবারের জন্য পারিবারিক পেনশন পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে যোগ্য স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী সন্তানের পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের কোথায় যেতে হবে, কী কী কাগজ লাগবে, পাঁচ আঙুলের ছাপ কোথায় দিতে হবে—এসব নিয়ে অনেক পরিবার বিভ্রান্তিতে পড়েন।
সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অবসরভাতা ভোগরত অবস্থায় পেনশনভোগীর মৃত্যু হলে পারিবারিক পেনশনের জন্য আলাদা ফরম ও নির্ধারিত কাগজপত্র রয়েছে। ফলে শুধু মৌখিকভাবে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করলেই হবে না; নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হবে।
স্ত্রী কি প্রতি মাসে পেনশন পাবেন?
সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের FAQ অনুযায়ী, মূল পেনশনার, স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী সন্তান আজীবন পেনশনের আওতায় থাকতে পারেন—প্রযোজ্য বিধি ও শর্ত সাপেক্ষে। তাই কোনো সরকারি কর্মচারী অবসর নেওয়ার পর পেনশন ভোগরত অবস্থায় মারা গেলে তাঁর যোগ্য স্ত্রী পারিবারিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ রাখেন।
তবে বিষয়টি এমন নয় যে পেনশনভোগী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে পরের মাসের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হয়ে যাবে। মৃত্যুর তথ্য জানানো, পারিবারিক পেনশনের আবেদন, উত্তরাধিকার যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর নতুন করে পারিবারিক পেনশন চালু হয়।
প্রথমে কোথায় যাবেন?
এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো—পেনশনভোগী সর্বশেষ যে সরকারি অফিসে চাকরি করেছেন, প্রথমে সেই অফিসের প্রশাসন বা হিসাব শাখায় যোগাযোগ করুন।
সেখানে গিয়ে স্পষ্ট করে বলতে হবে:
“পেনশনভোগী অবস্থায় আমার বাবা/স্বামী মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী/যোগ্য উত্তরাধিকারীর নামে পারিবারিক পেনশন চালু করতে চাই।”
সরকারি পারিবারিক পেনশন ফরম ২.২-এর নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনকারী প্রথম অংশ পূরণ করে মৃত কর্মচারীর শেষ অফিস প্রধানের কাছে দাখিল করবেন। এরপর অফিস প্রধান প্রয়োজনীয় অংশ পূরণ করে আবেদনটি সংশ্লিষ্ট পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন। যাচাই শেষে হিসাবরক্ষণ অফিস প্রয়োজনীয় হিসাব সম্পন্ন করে PPO জারি করবে।
অর্থাৎ, শুরুতেই একাধিক অফিসে ছুটে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। প্রথম গন্তব্য হওয়া উচিত মৃত পেনশনভোগীর সর্বশেষ কর্মস্থল।
যেসব কাগজপত্র লাগবে
সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের বর্তমান প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, অবসরভাতা ভোগরত অবস্থায় পেনশনভোগীর মৃত্যু হলে প্রধানত নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রয়োজন।
১. পারিবারিক পেনশন আবেদন ফরম
পারিবারিক পেনশন ফরম ২.২ পূরণ করতে হবে।
২. সত্যায়িত ছবি
স্বামী/স্ত্রী/উত্তরাধিকারীদের ৪ কপি সত্যায়িত ছবি চাওয়া হয়েছে।
৩. উত্তরাধিকার সনদ ও নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেট
সরকারি তালিকায় ৩ কপি উত্তরাধিকার সনদপত্র ও নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেটের কথা বলা হয়েছে।
৪. নমুনা স্বাক্ষর ও পাঁচ আঙুলের ছাপ
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তালিকায় নমুনা স্বাক্ষর ও হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপের ৩ কপি উল্লেখ রয়েছে।
৫. অভিভাবক মনোনয়ন ও ক্ষমতা অর্পণ সনদ
অভিভাবক মনোনয়ন এবং অবসরভাতা ও আনুতোষিক উত্তোলনের জন্য ক্ষমতা অর্পণ সনদ ৩ কপি প্রয়োজন।
৬. মৃত্যুসনদ
চিকিৎসক, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, পৌরসভার মেয়র অথবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুসনদ ১ কপি প্রয়োজন।
৭. অবসরভাতা মঞ্জুরিপত্র
মৃত পেনশনভোগীর অবসরভাতা মঞ্জুরিপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
৮. PPO ও D-Half
মৃত পেনশনভোগীর PPO এবং D-Half অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। সরকারি তালিকাতেই এগুলো আলাদাভাবে চাওয়া হয়েছে।
৯. প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে অতিরিক্ত কাগজ
প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে তাঁর নিবন্ধন, পরিচয়পত্র এবং মেডিকেল বোর্ডের সনদ প্রয়োজন হতে পারে।
পাঁচ আঙুলের ছাপ কোথায় দিতে হবে?
অনেক পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—“মায়ের পাঁচ আঙুলের ছাপ কোথায় নিতে হবে?”
সরকারি নির্দেশনায় এটিকে আলাদা কোনো সাধারণ NID-সংক্রান্ত কাজ হিসেবে নয়, বরং “নমুনা স্বাক্ষর ও হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ” হিসেবে পারিবারিক পেনশন আবেদনের অংশ করা হয়েছে। এটি সংযোজনী-৬-এর নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে নেওয়া হয়।
তাই আগে থেকেই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে পাঁচ আঙুলের ছাপ নেওয়ার জন্য অবশ্যই নির্বাচন অফিসে যেতে হবে।
সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো—শেষ কর্মস্থলের হিসাব/প্রশাসন শাখা থেকে সংযোজনী-৬ ফরম নিয়ে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী মায়ের স্বাক্ষর ও পাঁচ আঙুলের ছাপ সম্পন্ন করা।
শুধু ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই হবে না
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলেছেন, স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছ থেকে মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ ইত্যাদি সংগ্রহ করে শেষ কর্মস্থলে আবেদন করলেই হবে।
এর একটি অংশ সঠিক হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি এতটা সরল নয়।
স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহ করতে হবে, কিন্তু এরপর আবেদনটি যেতে হবে মৃত পেনশনভোগীর শেষ কর্মস্থল → পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ → সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস—এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ফরম ২.২-এর সরকারি নির্দেশনাতেও এ ধরনের ধাপ নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে।
বাবার পুরোনো পেনশন ফাইল খুঁজে বের করুন
পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো মৃত পেনশনভোগীর পুরোনো পেনশন ফাইল খুঁজে বের করা।
বিশেষ করে নিচের কাগজগুলো এক জায়গায় রাখুন—
- PPO
- D-Half
- অবসরভাতা মঞ্জুরিপত্র
- পেনশন সংক্রান্ত পুরোনো কাগজ
- বাবার NID
- মায়ের NID
- ব্যাংক হিসাবের তথ্য
- মৃত্যুসনদ
- উত্তরাধিকার সনদ
- নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেট
- আগের পেনশন সংক্রান্ত কাগজপত্র
কারণ PPO ও D-Half সরাসরি সরকারি প্রয়োজনীয় নথির তালিকায় রয়েছে।
পেনশনভোগীর মৃত্যুর খবর দ্রুত জানানো জরুরি
পেনশনভোগী মারা যাওয়ার পর বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে “পেনশনারের মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য প্রদান” নামে ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে মৃত পেনশনারের ১৭ ডিজিটের NID অথবা ১০ ডিজিটের Smart ID, EFT-তে নিবন্ধিত ফোন নম্বর এবং মৃত্যুর তারিখ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে; মৃত্যুসনদ আপলোডের সুযোগও রয়েছে।
পেনশন কর্তৃপক্ষও সতর্ক করেছে যে পেনশনার মারা গেলে তাঁর নিকটাত্মীয়দের দ্রুত মৃত্যুর তথ্য জানানো উচিত। এতে মৃত্যুর পর অনিয়মিত পেনশন উত্তোলন এবং পরবর্তী সময়ে পারিবারিক পেনশন পেতে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা এড়ানো যায়।
আবেদন করার পুরো প্রক্রিয়া এক নজরে
প্রথম ধাপ:
মৃত পেনশনভোগীর সর্বশেষ কর্মস্থলে যোগাযোগ।
দ্বিতীয় ধাপ:
প্রশাসন/হিসাব শাখা থেকে পারিবারিক পেনশন ফরম ২.২ ও প্রয়োজনীয় ফরম সংগ্রহ।
তৃতীয় ধাপ:
মৃত্যুসনদ, উত্তরাধিকার সনদ, নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় স্থানীয় সনদ সংগ্রহ।
চতুর্থ ধাপ:
PPO, D-Half ও অবসরভাতা মঞ্জুরিপত্র সংগ্রহ।
পঞ্চম ধাপ:
মায়ের ছবি, NID, নমুনা স্বাক্ষর এবং পাঁচ আঙুলের ছাপ প্রস্তুত করা।
ষষ্ঠ ধাপ:
ক্ষমতা অর্পণ ও অভিভাবক মনোনয়ন সংক্রান্ত কাগজ সম্পন্ন করা।
সপ্তম ধাপ:
শেষ কর্মস্থলের মাধ্যমে আবেদন সংশ্লিষ্ট পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো।
অষ্টম ধাপ:
যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে প্রয়োজনীয় হিসাব সম্পন্ন করা।
নবম ধাপ:
পারিবারিক পেনশনের জন্য প্রয়োজনীয় PPO/পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর যোগ্য উত্তরাধিকারীর নামে পেনশন চালু করা।
এই ধাপগুলোর মূল কাঠামো সরকারি পারিবারিক পেনশন ফরম ২.২-এর নির্দেশনাতেও স্পষ্টভাবে দেওয়া রয়েছে।
“অনেক কাগজ লাগবে”—এই ধারণা কতটা সত্য?
বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর অতিরিক্ত সহায়ক কাগজ চাইতে পারে। সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পুরোনো একটি বাস্তব কেসে পেনশন বই, স্ত্রীকে ভাতাভুক্তির আবেদন, উত্তরাধিকার সনদ, নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেট, পাঁচ আঙুলের ছাপ, মৃত্যুসনদ, NID, ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ আরও কিছু কাগজের সংযুক্তির উদাহরণ পাওয়া যায়।
তবে এটিকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক একই তালিকা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বর্তমান সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত “অবসরভাতা ভোগরত অবস্থায় পেনশনভোগীর মৃত্যু হলে” তালিকাটিই প্রাথমিক ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চেকলিস্ট হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
শেষ কথা
বাবা বা স্বামী পেনশনরত অবস্থায় মারা গেলে পরিবারের জন্য পরিস্থিতিটি নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু পেনশন বন্ধ হয়ে গেলেই সব শেষ—এমন নয়। সরকারি বিধিতে পারিবারিক পেনশনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং এ জন্য নির্দিষ্ট আবেদনপদ্ধতিও চালু আছে।
তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রথমে মৃত পেনশনভোগীর সর্বশেষ কর্মস্থলের প্রশাসন/হিসাব শাখায় যোগাযোগ করা, তাঁর পুরোনো পেনশন ফাইল ও PPO-D-Half বের করা এবং সরকারি নির্ধারিত ফরম অনুযায়ী আবেদন করা।
কোনো দালাল বা অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তির কথায় টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত/নির্ধারিত কাগজের তালিকা নেওয়া নিরাপদ। প্রয়োজনে সরকারি পেনশন কর্তৃপক্ষের হটলাইন +880 9609 000 555-এ যোগাযোগ করা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: “মা পেনশন পাবেন”—এটি সাধারণ নিয়ম হিসেবে বলা গেলেও চূড়ান্তভাবে কার নামে, কীভাবে এবং কতদিন পারিবারিক পেনশন চলবে তা নির্ধারণ হবে মৃত পেনশনভোগীর নথি, বৈধ উত্তরাধিকার, প্রযোজ্য বিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ভিত্তিতে।


