৯ম পে স্কেল ২০২৬: সর্বনিম্ন পেনশন কত হবে, কার কত বাড়বে
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতেই পরিবর্তন আনছে না, এর আওতায় অবসরভোগী সরকারি কর্মচারীদের নিট পেনশনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য বৃদ্ধির হার রাখা হয়েছে বেশি।
সরকারের অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ বর্তমানে ৯ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া একজন পেনশনভোগী নতুন হিসাবে ১৮ হাজার টাকা পাবেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—নতুন পে স্কেলে সবার জন্য ‘সর্বনিম্ন পেনশন ১৮ হাজার টাকা’ নির্ধারণ করা হয়নি। বরং বিদ্যমান নিট পেনশনের ওপর নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে কারও বর্তমান নিট পেনশন ৮ হাজার টাকা হলে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৬ হাজার টাকা হবে; ৮ হাজার ৫০০ টাকা হলে হবে ১৭ হাজার টাকা। আর ৯ হাজার টাকা হলে হবে ১৮ হাজার টাকা।
পেনশন বাড়বে ৫টি স্ল্যাবে
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পেনশন বৃদ্ধির হার বর্তমান নিট পেনশনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে।
| বর্তমান মাসিক নিট পেনশন | বৃদ্ধির হার | ৯ম পে স্কেল অনুযায়ী উদাহরণ | ৯,০০০ টাকা বা কম | ১০০% | ৯,০০০ → ১৮,০০০ | ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% | ১০,০০০ → ১৭,৫০০ | ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% | ২৫,০০০ → ৪১,২৫০ | ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% | ৩৫,০০০ → ৫৬,০০০ | ৪০,০০১ টাকা বা বেশি | ৫৫% | ৪৫,০০০ → ৬৯,৭৫০ |
|---|
এই স্ল্যাবগুলো সরকারি অনুমোদনের পর প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের ব্যাখ্যা হলো, পুরোনো ও কম পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতেই নিম্ন পেনশনধারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধির হার রাখা হয়েছে।
তাহলে সর্বনিম্ন পেনশন আসলে কত?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ‘বর্তমান নিট পেনশন’ এবং ‘নতুন পেনশন’—দুটিকে আলাদা করে দেখতে হবে।
সরকারের সিদ্ধান্তে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনের জন্য ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ—
বর্তমান নিট পেনশন ৯,০০০ টাকা → নতুন নিট পেনশন ১৮,০০০ টাকা।
কিন্তু কারও বর্তমান নিট পেনশন যদি ৭ হাজার টাকা হয়, তাহলে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির পর তা হবে ১৪ হাজার টাকা। একইভাবে ৮ হাজার টাকা হলে ১৬ হাজার টাকা হবে।
অতএব, সংবাদ শিরোনামে ‘৯ম পে স্কেলে সর্বনিম্ন পেনশন ১৮ হাজার টাকা’ বলা হলে সেটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। অধিক নির্ভুলভাবে বলা যায়—
‘৯ হাজার টাকা বা কম নিট পেনশন দ্বিগুণ হবে; ৯ হাজার টাকা পেনশনের ক্ষেত্রে নতুন পরিমাণ ১৮ হাজার টাকা।’
কম পেনশনধারীদের জন্য কেন বেশি বৃদ্ধি?
নতুন পেনশন কাঠামোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—পেনশন যত কম, বৃদ্ধির হার তত বেশি।
৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশনের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি রাখা হয়েছে। এরপর পেনশনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধির হার কমে ৭৫, ৬৫, ৬০ এবং সর্বশেষ ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং বর্তমানে তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন।
অর্থাৎ এটি এমন একটি কাঠামো যেখানে একই হারে সবার পেনশন না বাড়িয়ে নিম্ন পেনশনধারীদের বেশি হারে বৃদ্ধি দেওয়া হয়েছে।
‘নিট পেনশন’ শব্দটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখানে ‘নিট পেনশন’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি সিদ্ধান্তে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে নিট পেনশনের ওপর।
ফলে কারও মূল পেনশন কত, মোট পেনশন কত এবং বিভিন্ন কর্তনের পর হাতে কত টাকা আসে—এই তিনটি অঙ্ক এক নাও হতে পারে।
তাই কোনো পেনশনভোগী নতুন স্কেলে ঠিক কত টাকা পাবেন তা জানতে শুধু তার পুরোনো মূল পেনশন জানলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট হিসাবে বর্তমান নিট পেনশন কত, সেটিও জানা প্রয়োজন।
কয়েকটি উদাহরণে বিষয়টি সহজভাবে
ধরা যাক, একজন অবসরভোগী বর্তমানে মাসে ৯ হাজার টাকা নিট পেনশন পান।
১০০ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে—
৯,০০০ + ৯,০০০ = ১৮,০০০ টাকা।
আবার কেউ যদি ১৫ হাজার টাকা নিট পেনশন পান, তিনি পড়বেন ৯,০০১ থেকে ২০ হাজার টাকার স্ল্যাবে। তাঁর ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি হবে।
অর্থাৎ—
১৫,০০০ × ৭৫% = ১১,২৫০ টাকা বৃদ্ধি
নতুন নিট পেনশন—
১৫,০০০ + ১১,২৫০ = ২৬,২৫০ টাকা।
আর ২৫ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি হবে।
২৫,০০০ × ৬৫% = ১৬,২৫০ টাকা
নতুন নিট পেনশন—
৪১,২৫০ টাকা।
এখান থেকেই বোঝা যায়, নতুন ব্যবস্থায় সবার পেনশন একই হারে বাড়ছে না।
৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনেও বাড়বে
নতুন কাঠামোয় বেশি পেনশন পাওয়া অবসরভোগীরাও বৃদ্ধি থেকে বাদ পড়ছেন না।
৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা নিট পেনশন হলে—
৫০,০০০ × ৫৫% = ২৭,৫০০ টাকা বৃদ্ধি।
নতুন নিট পেনশন দাঁড়াবে—
৭৭,৫০০ টাকা।
তবে প্রকৃত অর্থে প্রত্যেক পেনশনভোগীর নতুন প্রাপ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি বাস্তবায়ন নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
৯ম পে স্কেল কবে থেকে কার্যকর?
সরকার জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুমোদন করেছে ৩১ আগস্ট ২০২৬, এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে পুরো বেতন কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনার কথা জানানো হয়েছে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ধাপভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধি কার্যকর হবে বলে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মরতদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে পেনশন বৃদ্ধির সম্পর্ক
নতুন পে স্কেলে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।
এই নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অবসরভোগীদের পেনশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে কর্মরতদের মূল বেতন নির্ধারণ এবং পেনশনভোগীদের নিট পেনশন বৃদ্ধির সূত্র এক নয়।
পেনশনভোগীদের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিট পেনশনের স্ল্যাব।
‘এক গ্রেড এক পেনশন’ নিয়েও বড় সিদ্ধান্ত
নতুন পে স্কেল নিয়ে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত হলো ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা One Rank One Pension (OROP) ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ।
প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে একই গ্রেড বা সমপর্যায়ের চাকরির ক্ষেত্রে অবসরের সময় ও পুরোনো বেতন কাঠামোর কারণে তৈরি হওয়া পেনশন বৈষম্য কমানোর একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও বিধান সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
প্রায় ৯ লাখের বেশি অবসরভোগীর জন্য প্রভাব
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর সুবিধা শুধু বর্তমান সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী নতুন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
অর্থাৎ পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বর্তমান নিট পেনশন তুলনামূলক কম, তাদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কারণে মাসিক প্রাপ্তিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা এড়ানো জরুরি
নতুন পে স্কেল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় বলা হচ্ছে—‘সর্বনিম্ন পেনশন ১৮ হাজার টাকা করা হয়েছে।’
সরকারি সিদ্ধান্তের ভাষা অনুযায়ী বিষয়টি একটু ভিন্ন।
সরকার বলেছে—
৯,০০০ টাকা বা তদনিম্ন নিট পেনশন → ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
সুতরাং ৯ হাজার টাকা পাওয়া ব্যক্তি ১৮ হাজার টাকা পাবেন। কিন্তু ৯ হাজারের কম পাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির পেনশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৮ হাজার টাকা হবে—এমন কথা সরকারি সিদ্ধান্তে বলা হয়নি।
উদাহরণ:
- ৬,০০০ টাকা → ১২,০০০ টাকা
- ৭,০০০ টাকা → ১৪,০০০ টাকা
- ৮,০০০ টাকা → ১৬,০০০ টাকা
- ৯,০০০ টাকা → ১৮,০০০ টাকা
তাই ১৮ হাজার টাকা হলো ৯ হাজার টাকা বর্তমান নিট পেনশনের দ্বিগুণ, কোনো আলাদা সর্বনিম্ন পেনশন হার নয়।
সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?
নতুন পে স্কেল অনুমোদিত হলেও প্রত্যেক পেনশনভোগীর ক্ষেত্রে বাস্তব অর্থে কত টাকা জমা হবে, তা নির্ধারণে প্রয়োজন হবে বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিস্তারিত আদেশ ও হিসাব পদ্ধতি।
বিশেষ করে—
- নিট পেনশন নির্ধারণের সূত্র;
- স্ল্যাব প্রয়োগের পদ্ধতি;
- ধাপে ধাপে বৃদ্ধির সময়সূচি;
- বকেয়া পেনশনের হিসাব;
- অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা;
- কর্তনের হিসাব;
- ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বাস্তবায়নের পদ্ধতি
এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সারসংক্ষেপ
৯ম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এ পেনশনভোগীদের জন্য মূল বার্তাটি হলো কম পেনশনধারীদের বেশি হারে বৃদ্ধি।
৯ হাজার টাকা বা কম নিট পেনশন—১০০% বৃদ্ধি
৯,০০১–২০,০০০ টাকা—৭৫% বৃদ্ধি
২০,০০১–৩০,০০০ টাকা—৬৫% বৃদ্ধি
৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা—৬০% বৃদ্ধি
৪০,০০১ টাকা বা বেশি—৫৫% বৃদ্ধি।
অতএব, বর্তমানে ৯ হাজার টাকা নিট পেনশন পাওয়া একজন অবসরভোগীর নতুন নিট পেনশন ১৮ হাজার টাকা হবে—১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সূত্র অনুযায়ী।
তবে এটিকে ‘সবার জন্য সর্বনিম্ন পেনশন ১৮ হাজার টাকা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। কারণ সরকারি সিদ্ধান্তটি স্ল্যাবভিত্তিক শতাংশ বৃদ্ধির, নির্দিষ্ট একক সর্বনিম্ন পেনশন নির্ধারণের নয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, নতুন পে স্কেল–২০২৬ কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অবসরভোগীদের আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি নতুন কাঠামো তৈরি করছে। বিশেষ করে কম নিট পেনশন পাওয়া পুরোনো পেনশনভোগীদের জন্য ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি এই কাঠামোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।



