৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

৮ বছরেই উচ্চতর গ্রেড: নতুন পে স্কেল-২০২৬-এ বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব, কারা পাবেন এই সুবিধা?

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের আলোচিত উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬-এ। সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত ১০ বছরের পরিবর্তে চাকরির ৮ বছর পূর্তিতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এরপর নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগও রাখার কথা বলা হয়েছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—৮ বছর পূর্ণ হলেই কি সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড পাবেন? প্রস্তাবিত কাঠামোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি এতটা সরল নয়। পদ, পদোন্নতির সুযোগ, পূর্বে পাওয়া উচ্চতর স্কেল এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়ার মতো কয়েকটি শর্ত এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

বর্তমানে কী নিয়ম আছে?

জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে ১০ বছর পূর্ণ করলে ১১তম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার বিধান রয়েছে। এরপর প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ৬ বছর পদোন্নতি না হলে সপ্তম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ বর্তমান ব্যবস্থার মূল কাঠামো হলো—

১০ বছর → প্রথম উচ্চতর গ্রেড → আরও ৬ বছর → দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড।

এই বিধানই নতুন পে স্কেল-২০২৬-এর প্রস্তাবিত কাঠামোয় পরিবর্তনের মুখে পড়ছে।


নতুন প্রস্তাবে ৮ বছরেই প্রথম উচ্চতর গ্রেড

সচিব কমিটির সুপারিশের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব পদে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই এবং যেগুলো ব্লকড পদ হিসেবে ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সন্তোষজনক চাকরির শর্তে একই পদে কর্মরত কর্মচারী পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত সময়সূচি হলো—

  • প্রথম উচ্চতর গ্রেড: ৮ বছর পূর্তিতে
  • দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড: প্রথমটির পর আরও ৬ বছর
  • তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড: এরপর আরও ৮ বছর

অর্থাৎ কাঠামোটি দাঁড়াচ্ছে—

৮ বছর → ৬ বছর → ৮ বছর।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উচ্চতর গ্রেড পদোন্নতি হিসেবে গণ্য হবে না। এটি মূলত বেতন ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হবে।


কেন ৮ বছরের প্রস্তাব?

এর পেছনে মূল যুক্তি হলো—কিছু সরকারি পদে কর্মরত ব্যক্তিদের বাস্তবে পদোন্নতির সুযোগ থাকে না। একটি পদে দীর্ঘদিন কাজ করলেও সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে পরবর্তী পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় না।

ফলে একজন কর্মচারী একই পদে দীর্ঘ সময় চাকরি করলেও তার বেতন বৃদ্ধির প্রধান পথ হয়ে দাঁড়ায় বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট।

এ ধরনের কর্মীদের জন্য উচ্চতর গ্রেডের সময়সীমা কমানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর কাছেও কর্মচারী প্রতিনিধিরা বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। কমিশন এর আগে আরও কম সময়ের ব্যবধানের সুপারিশ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


তাহলে কি ৮ বছর চাকরি করলেই উচ্চতর গ্রেড?

না—এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার।

বর্তমানে যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ৮ বছরের প্রস্তাবটি মূলত পদোন্নতির সুযোগ নেই এমন ব্লকড পদের কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ব্যবস্থা হিসেবে এসেছে। তাই সাধারণভাবে বলা যে—

“সরকারি চাকরিতে ৮ বছর পূর্ণ হলেই সবাই উচ্চতর গ্রেড পাবেন”

—এটি সঠিক হবে না।

চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বা সংশ্লিষ্ট এসআরওতে কোন কোন পদ ও কর্মচারী এই সুবিধার আওতায় পড়বেন, তা স্পষ্ট হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও উচ্চতর গ্রেডসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এসআরও জারি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।


পুরোনো ও নতুন ব্যবস্থার সম্ভাব্য পার্থক্য

বিষয়জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫প্রস্তাবিত পে স্কেল-২০২৬
প্রথম উচ্চতর গ্রেড১০ বছর পূর্তিতেনির্দিষ্ট ব্লকড পদের ক্ষেত্রে ৮ বছর
প্রথমটির পর দ্বিতীয়আরও ৬ বছরআরও ৬ বছর
তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডসর্বোচ্চ দুইটির কাঠামোপ্রস্তাবে সর্বোচ্চ তিনবারের সুযোগ
পদোন্নতি হিসেবে গণ্যনানা
মূল উদ্দেশ্যআর্থিক সুবিধাআর্থিক সুবিধা
চাকরি সন্তোষজনক হওয়ার শর্তরয়েছেপ্রস্তাবেও রয়েছে

জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর সরকারি নথিতে ১০ বছর ও পরবর্তী ৬ বছরের বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।


৮ বছর পূর্তির হিসাব কীভাবে হবে?

ধরা যাক, কোনো কর্মচারী একটি ব্লকড পদে চাকরিতে যোগ দিলেন এবং পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই।

যদি নতুন নিয়ম চূড়ান্তভাবে একইভাবে কার্যকর হয়, তাহলে—

চাকরির ১ম বছর → ১ম বছর
২য় বছর → ২য় বছর
৩য় বছর → ৩য় বছর
৪র্থ বছর → ৪র্থ বছর
৫ম বছর → ৫ম বছর
৬ষ্ঠ বছর → ৬ষ্ঠ বছর
৭ম বছর → ৭ম বছর
৮ম বছর পূর্ণ → প্রথম উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা

এরপর প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ৬ বছর পূর্ণ হলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ এবং এরপর আরও ৮ বছর পূর্ণ হলে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ তৈরি হবে—যদি চূড়ান্ত বিধানে এই কাঠামো বহাল থাকে।


পূর্বে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের কী হবে?

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫-এর অধীনে আগে থেকেই উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন হিসাব সরাসরি শূন্য থেকে শুরু হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ বা তার আগে একই পদে একটি মাত্র উচ্চতর স্কেল/গ্রেড পাওয়া থাকলে, সেই সুবিধা পাওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের সময়ের জন্য বকেয়া সুবিধা বা নতুন গ্রেড অনুযায়ী অতীত সময়ের বেতন পুনর্নির্ধারণের সুযোগ থাকবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ পুরোনো ও নতুন সময়ের হিসাবকে এক করে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।


নতুন পে স্কেলে উচ্চতর গ্রেড কেন গুরুত্বপূর্ণ?

উচ্চতর গ্রেডের প্রভাব শুধু কাগজে-কলমে গ্রেড পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মূল বেতন বৃদ্ধি পেতে পারে, যার সঙ্গে বেতননির্ভর অন্যান্য আর্থিক সুবিধার হিসাবও প্রভাবিত হতে পারে।

বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন একই পদে কাজ করছেন এবং পদোন্নতির সুযোগ সীমিত বা নেই, তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয়।

তবে নতুন পে স্কেল-২০২৬-এ শুধু উচ্চতর গ্রেড নয়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হারও গ্রেডভেদে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখার প্রস্তাব থাকলেও গ্রেড-৫-এ ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩.৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২.৭৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থাৎ নতুন কাঠামোতে একজন কর্মচারীর আর্থিক সুবিধা বোঝার ক্ষেত্রে মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, উচ্চতর গ্রেড ও ভাতার কাঠামো—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এখনো চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনই শেষ কথা

উচ্চতর গ্রেডের ৮ বছরের প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, কিন্তু সংবাদ প্রতিবেদন বা সচিব কমিটির সুপারিশকে চূড়ান্ত আইন/বিধি হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বা এসআরওতে স্পষ্ট হবে—

১. কারা ৮ বছরের সুবিধা পাবেন
২. চাকরিতে যোগদানের তারিখ কীভাবে গণনা হবে
৩. পূর্বের চাকরির সময় গণনা করা হবে কি না
৪. পদোন্নতির সুযোগ থাকা পদগুলো এর আওতায় পড়বে কি না
৫. আগে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া ব্যক্তিদের হিসাব কীভাবে হবে
৬. ছুটি, বিভাগীয় মামলা বা অন্যান্য কারণে সময় গণনায় কোনো প্রভাব পড়বে কি না
৭. সর্বোচ্চ কয়টি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে
৮. নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর পুরোনো চাকরির সময় কীভাবে সমন্বয় করা হবে।

সুতরাং “৮ বছরে উচ্চতর গ্রেড” কথাটি সত্য হলেও এটি সবার জন্য সাধারণ ৮ বছরের নিয়ম—এমনটা এখনই বলা যাবে না। প্রকাশিত প্রস্তাব অনুযায়ী এটি বিশেষ করে পদোন্নতিহীন/ব্লকড পদে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সারসংক্ষেপ

জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬-এর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে ১০ বছরের পরিবর্তে ৮ বছর করার সুপারিশ করা হয়েছে নির্দিষ্ট পদে। প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পর ৬ বছর এবং এরপর আরও ৮ বছর পর তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত কাঠামো হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *