জাল সনদে সুপ্রিম কোর্টে চাকরি: ১৯ বছরের বেতন-ভাতা ৪২ লাখ টাকা ফেরতের নির্দেশ
জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অফিস সহকারী পদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মোহাম্মদ গোলাম মাওলাকে চাকরি থেকে অপসারণের পর এবার চাকরিকালে নেওয়া ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯০১ টাকা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগের সাধারণ ও সংস্থাপন শাখা থেকে জারি করা অফিস আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে Automated Challan System-এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে ২০ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং অফিস আদেশটি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
২০০৭ সালে চাকরি, ২০২৬ সালে অপসারণ
অফিস আদেশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর হাতিরপুলের বাসিন্দা মোহাম্মদ গোলাম মাওলা ২০০৭ সালের ৩১ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন।
পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জাল ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ২০২১ সালে বিভাগীয় মামলা নম্বর ০৯/২০২১ দায়ের করা হয়।
বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।
চাকরি শুরু থেকেই বাতিল হিসেবে গণ্য
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শুধু চাকরি থেকে অপসারণ নয়, তার নিয়োগকে চাকরির শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
অর্থাৎ, অফিস আদেশের যুক্তি অনুযায়ী, জাল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের ভিত্তিতে নিয়োগ হওয়ায় বৈধ নিয়োগের ভিত্তিতে তিনি ওই চাকরিতে ছিলেন না। ফলে চাকরিকালে পাওয়া বেতন-ভাতার ওপর তার প্রাপ্যতার বিষয়টিও বাতিল হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে তিনি বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৪২,০৩,৯০১ টাকা উত্তোলন করেছেন।
ফেরত দিতে হবে পুরো ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯০১ টাকা
অফিস আদেশ অনুযায়ী, চাকরি শুরু থেকেই বাতিল হিসেবে গণ্য হওয়ায় চাকরিকালে উত্তোলন করা বেতন-ভাতার পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থের পরিমাণ:
৪২,০৩,৯০১ টাকা
অর্থাৎ ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯০১ টাকা।
এই অর্থ জমা দেওয়ার জন্য ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থটি Automated Challan System-এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
প্রায় ১৯ বছরের চাকরির হিসাব
সময়কালটি হিসাব করলে—
- চাকরিতে যোগদান: ৩১ জানুয়ারি ২০০৭
- বেতন-ভাতা গ্রহণের হিসাব: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত
- সময়কাল: প্রায় ১৯ বছর
- মোট উত্তোলিত বেতন-ভাতা: ৪২,০৩,৯০১ টাকা
- ফেরতের সময়সীমা: ৩০ দিন
- অর্থ জমার পদ্ধতি: Automated Challan System
অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি চাকরিতে থাকার পর বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শুধু চাকরিই হারাতে হয়নি; চাকরিকালে গ্রহণ করা পুরো বেতন-ভাতাও ফেরত দেওয়ার নির্দেশ এসেছে।
বিভাগীয় মামলার পরিণতি
নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিভাগীয় মামলা দায়েরের পর তদন্ত ও প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপর ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।
এরপর হাইকোর্ট বিভাগের সাধারণ ও সংস্থাপন শাখার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর অফিস আদেশে তার নিয়োগ শুরু থেকেই বাতিল হিসেবে গণ্য করে বেতন-ভাতা ফেরতের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সরকারি চাকরিতে জাল সনদের ঝুঁকি নিয়ে বড় বার্তা
এই ঘটনাটি সরকারি চাকরিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই এবং নিয়োগের বৈধতার গুরুত্বকে সামনে এনেছে। বিশেষ করে কোনো কর্মচারীর নিয়োগ যদি পরবর্তীতে জাল বা জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি নথির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও সেই নিয়োগের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এখানে আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটি শুধু চাকরি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। চাকরি শুরু থেকেই বাতিল হিসেবে গণ্য করায় চাকরিকালে উত্তোলিত বেতন-ভাতার অর্থও ফেরত চাওয়া হয়েছে।
এক নজরে পুরো ঘটনা
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| কর্মচারী | মোহাম্মদ গোলাম মাওলা |
| পদ | অফিস সহকারী |
| প্রতিষ্ঠান | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ |
| চাকরিতে যোগদান | ৩১ জানুয়ারি ২০০৭ |
| বিভাগীয় মামলা | ০৯/২০২১ |
| অভিযোগ | জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ব্যবহার |
| চাকরি থেকে অপসারণ | ২১ জানুয়ারি ২০২৬ |
| চাকরির অবস্থান | শুরু থেকেই বাতিল (Void ab initio) |
| বেতন-ভাতা উত্তোলনের সময়কাল | ২০০৭–২০২৫ |
| মোট অর্থ | ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯০১ টাকা |
| ফেরতের সময় | ৩০ দিন |
| জমার পদ্ধতি | Automated Challan System |
| আদেশ জারি | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
শেষ কথা
মোহাম্মদ গোলাম মাওলার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অফিস আদেশে যে সিদ্ধান্ত এসেছে, তার মূল বিষয় তিনটি—জাল শিক্ষাগত সনদের ভিত্তিতে নিয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, চাকরি শুরু থেকেই বাতিল হিসেবে গণ্য হওয়া এবং ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উত্তোলিত ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯০১ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের নির্দেশ।
এটি নিছক চাকরিচ্যুতির ঘটনা নয়; দীর্ঘ সময় সরকারি চাকরিতে থাকার পর নিয়োগের ভিত্তি অবৈধ প্রমাণিত হলে চাকরিকালীন আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও কীভাবে পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে, সেই দিকটি এই অফিস আদেশে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।



