৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নতুন পে স্কেলে ‘উল্টো সিঁড়ি’, উচ্চ গ্রেডে গিয়েও কমতে পারে মোট বেতন

সরকারের নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো–২০২৬ নিয়ে এবার বাড়ি ভাড়া ভাতার হারকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে সরকারি চাকরিতে গ্রেড যত উচ্চ হয়, মৌলিক বেতন ও মোট প্রাপ্তিও তত বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামোর নির্ধারিত বাড়ি ভাড়া ভাতার হার সেই ধারাবাহিকতায় কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তৈরি করেছে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিচের গ্রেডের কর্মচারী তার ওপরের গ্রেডের কর্মচারীর চেয়েও বেশি মোট মাসিক বেতন পেতে পারেন।

কর্মচারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের আলোচনায় বিষয়টি ইতোমধ্যে ‘উল্টো সিঁড়ি’ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ১৫, ১৬ ও ১৭তম গ্রেডের তুলনামূলক হিসাবেই এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে ১৪ ও ১৬তম গ্রেডের হিসাব নিয়ে প্রচারিত তথ্যে একটি সংশোধনের বিষয়ও রয়েছে—প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডের মোট বেতন ১৪তম গ্রেডের চেয়ে ৩০ টাকা নয়, ১৭০ টাকা কম

১৫ ও ১৬তম গ্রেডে বড় অস্বাভাবিকতা

নতুন বেতন কাঠামোর গেজেটভিত্তিক হিসাবে ১৫তম গ্রেডে মৌলিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এই গ্রেডে ৩৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে ৭ হাজার ৯৮০ টাকা। এর সঙ্গে ৩ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা এবং ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা যোগ করলে মোট মাসিক প্রাপ্তি দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৪৩০ টাকা

অন্যদিকে ১৬তম গ্রেডে মৌলিক বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা, অর্থাৎ ১৫তম গ্রেডের তুলনায় ৯০০ টাকা কম। কিন্তু এই গ্রেডে বাড়ি ভাড়ার হার ৪৫ শতাংশ হওয়ায় বাড়ি ভাতা দাঁড়াচ্ছে ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। চিকিৎসা, টিফিন ও মোবাইল ভাতা যোগ করলে মোট প্রাপ্তি দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৪০৫ টাকা

অর্থাৎ মৌলিক বেতন কম হলেও ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় মাসে ৯৭৫ টাকা বেশি পাচ্ছেন।

১৫ ও ১৬তম গ্রেডের হিসাব

বিষয়১৫তম গ্রেড১৬তম গ্রেডমৌলিক বেতন২২,৮০০ টাকা২১,৯০০ টাকাবাড়ি ভাড়া৭,৯৮০ টাকা৯,৮৫৫ টাকাচিকিৎসা ভাতা৩,০০০ টাকা৩,০০০ টাকাটিফিন ভাতা৫০০ টাকা৫০০ টাকামোবাইল ভাতা১৫০ টাকা১৫০ টাকামোট৩৪,৪৩০ টাকা৩৫,৪০৫ টাকাপার্থক্য৯৭৫ টাকা বেশি

এই হিসাবের মূল বিষয় হলো—১৬তম গ্রেডের মৌলিক বেতন ১৫তম গ্রেডের তুলনায় কম হলেও বাড়ি ভাতার হারে অতিরিক্ত ১০ শতাংশের সুবিধা মোট প্রাপ্তিকে উল্টো দিকে নিয়ে গেছে।

১৭তম গ্রেডেও একই প্রবণতা

১৭তম গ্রেডের হিসাবেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এই গ্রেডে মৌলিক বেতন ২১ হাজার ৪০০ টাকা। ৪৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে ৯ হাজার ৬৩০ টাকা। চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার, টিফিন ভাতা ৫০০ এবং মোবাইল ভাতা ১৫০ টাকা যোগ করলে মোট প্রাপ্তি দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা

অর্থাৎ ১৭তম গ্রেডের মৌলিক বেতন ১৫তম গ্রেডের চেয়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা কম হলেও মোট মাসিক প্রাপ্তি ১৫তম গ্রেডের তুলনায় ২৫০ টাকা বেশি

এখানেও পার্থক্যের মূল কারণ মৌলিক বেতন নয়; বরং বাড়ি ভাতার শতাংশের ব্যবধান।

১৪তম ও ১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে?

১৪তম গ্রেডে মৌলিক বেতন ২৩ হাজার ৭০০ টাকা। ৩৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে ৮ হাজার ২২৫ টাকা। চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার, টিফিন ভাতা ৫০০ এবং মোবাইল ভাতা ১৫০ টাকা যোগ করলে মোট মাসিক প্রাপ্তি দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৫৭৫ টাকা

অন্যদিকে ১৬তম গ্রেডের মোট প্রাপ্তি ৩৫ হাজার ৪০৫ টাকা।

সুতরাং প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী ১৬তম গ্রেডের তুলনায় ১৭০ টাকা বেশি পাচ্ছেন। তাই ১৪তম গ্রেডের তুলনায় ১৬তম গ্রেড ৩০ টাকা বেশি—এমন দাবি হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। এ জায়গায় ১৪তম গ্রেড ও ১৬তম গ্রেডের মোট প্রাপ্তির পার্থক্য পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।

কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো?

নতুন বেতন কাঠামোতে বাড়ি ভাড়া ভাতার হার একক কোনো শতাংশে নির্ধারিত হয়নি। এলাকা ও গ্রেডভেদে হার আলাদা করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬–২০তম গ্রেডে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ, ১০–১৫তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ, ৫–৯তম গ্রেডে ৪৫ শতাংশ এবং ১–৪র্থ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে ৪০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য এলাকাতেও গ্রেডভেদে হার আলাদা।

ফলে একটি গ্রেড থেকে আরেকটি গ্রেডে পদোন্নতি হলে মৌলিক বেতন বাড়লেও বাড়ি ভাতার শতাংশ কমে যেতে পারে। তখন মৌলিক বেতনে যে বৃদ্ধি হচ্ছে, বাড়ি ভাতা কমে যাওয়ার কারণে তার পুরোটা মোট বেতনে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

এই কাঠামো থেকেই তৈরি হচ্ছে ‘উল্টো সিঁড়ি’র মতো পরিস্থিতি—যেখানে গ্রেডের ক্রম ওপরে উঠলেও কিছু নির্দিষ্ট ধাপে মোট মাসিক প্রাপ্তি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে না।

পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?

কর্মচারী সংগঠনগুলোর আলোচনায় আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে—আগের বাড়ি ভাড়া কাঠামোতে বিভিন্ন বেতনসীমার জন্য শতাংশের পাশাপাশি ন্যূনতম বাড়ি ভাড়ার অঙ্ক নির্ধারিত ছিল। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় আগের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট বেতনসীমায় ৬৫, ৬০, ৫৫ ও ৫০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পাশাপাশি ন্যূনতম বাড়ি ভাড়ার অঙ্কও নির্ধারিত ছিল।

নতুন কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক শতাংশ নির্ধারণের ফলে এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডে যাওয়ার সময় বাড়ি ভাতায় বড় লাফ বা পতন তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এ কারণে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু শতাংশ নির্ধারণ না করে প্রতিটি গ্রেড বা বেতনসীমার ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক ন্যূনতম বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করা হলে এ ধরনের উল্টো হিসাব কমানো সম্ভব হতে পারে। এটি অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।

গেজেট প্রকাশের পর কর্মচারী সংগঠনের তৎপরতা

নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংগঠনগুলোর নেতারা দাবি করেছেন, তারা অসংগতিগুলো সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী জানিয়েছেন, ১২টি সংগঠনের জোট বৈঠক করে নতুন বেতন কাঠামোর অসংগতিগুলো সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও অর্থ সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে এসব দাবি ও অভিযোগের বিপরীতে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সংশোধনী ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

অর্থ বিভাগের বক্তব্য কী?

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা) মো. নাজমুল হুদা সিদ্দিকীকে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে বলার কিছু নেই। এ বিষয়ে আমি অবহিত নই।”

অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যে এই নির্দিষ্ট হিসাব বা অভিযোগের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

দ্রুত গেজেট প্রকাশের অভিযোগ

কর্মচারী সংগঠনগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের পর অর্থ বিভাগের যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করা হয় এবং কিছু ভুলও ধরা পড়ে। একই সময়ে দ্রুত গেজেট প্রকাশের নির্দেশনা থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাড়াহুড়োর মধ্যে কাজ করেছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে।

তবে এটি বর্তমানে কর্মচারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ হিসেবে রয়েছে। সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে ভুল বা তাড়াহুড়োর কারণে গেজেটের অসংগতি সৃষ্টি হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি।

পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন

সরকারি চাকরির প্রচলিত কাঠামোয় উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি সাধারণত আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে বাড়ি ভাড়ার শতাংশের ব্যবধান থাকায় কিছু ক্ষেত্রে পদোন্নতির পর মোট মাসিক প্রাপ্তি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।

বিশেষ করে একই এলাকায় কর্মরত দুজন কর্মচারীর একজন যদি ১৫তম গ্রেডে এবং অন্যজন ১৬তম গ্রেডে থাকেন, তাহলে মৌলিক বেতনে ১৫তম গ্রেড এগিয়ে থাকলেও বাড়ি ভাতার অতিরিক্ত শতাংশের কারণে ১৬তম গ্রেডের মোট প্রাপ্তি বেশি হতে পারে। প্রকাশিত হিসাবের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য ৯৭৫ টাকা

এ ধরনের হিসাব কর্মচারীদের মধ্যে পদোন্নতি, গ্রেডভিত্তিক বেতন এবং বাড়ি ভাতা কাঠামোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সামনে কী হতে পারে?

নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন ইতোমধ্যে জারি হয়েছে এবং কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতার পূর্ণ বাস্তবায়ন ধাপে ধাপে হওয়ার কথা; প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভাতাগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় কর্মচারীদের মূল দাবি এখন দুটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত হতে পারে—প্রথমত, গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে মোট প্রাপ্তি যেন অযৌক্তিকভাবে কমে না যায়; দ্বিতীয়ত, বাড়ি ভাড়া ভাতার হার নির্ধারণে এমন ব্যবস্থা করা, যাতে পাশাপাশি থাকা গ্রেডগুলোর মধ্যে ‘উল্টো’ আর্থিক ব্যবধান তৈরি না হয়।

সব মিলিয়ে নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর মৌলিক বেতন নির্ধারণে গ্রেডভিত্তিক ঊর্ধ্বক্রম থাকলেও বাড়ি ভাতা যুক্ত হওয়ার পর কিছু নির্দিষ্ট গ্রেডে সেই ক্রম আর অক্ষুণ্ন থাকছে না। ১৫ ও ১৬তম গ্রেডের ৯৭৫ টাকার পার্থক্য এবং ১৫ ও ১৭তম গ্রেডের ২৫০ টাকার পার্থক্য বিষয়টিকে স্পষ্ট করে। আর ১৪ ও ১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রকাশিত অঙ্ক অনুযায়ী ১৬তম গ্রেড ১৭০ টাকা পিছিয়ে, যা প্রচারিত ৩০ টাকা বেশি হওয়ার দাবির সঙ্গে মেলে না।

এখন দেখার বিষয়, গেজেটের এই গ্রেডভিত্তিক বাড়ি ভাড়া কাঠামো নিয়ে সরকার কোনো ব্যাখ্যা, সংশোধনী বা পরবর্তী আদেশ জারি করে কি না। ততদিন পর্যন্ত প্রকাশিত গেজেটের অঙ্ক ও সংশ্লিষ্ট ভাতার হার অনুসারেই কর্মচারীদের প্রকৃত প্রাপ্য নির্ধারিত হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *